ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

৫ জেলার নির্বাচনী জনসভায় ভার্চুয়ালি প্রধানমন্ত্রী

নির্বাচনে সংঘর্ষ মারামারি চাই না

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩:৩৪, ২১ ডিসেম্বর ২০২৩

নির্বাচনে সংঘর্ষ মারামারি চাই না

৫ জেলার নির্বাচনী জনসভায় ভার্চুয়ালি প্রধানমন্ত্রী

ভোট নিয়ে যেন কোনো সংঘাত না হয়, সেদিকে নজর রাখতে সারাদেশের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, জনগণ যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে। ভোটে নৌকা, স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলও আছে। জনগণ যাকে ভোট দেবে, সেই নির্বাচিত হবে। কেউ কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। নির্বাচনে কোনো সংঘর্ষ-মারামারি দেখতে চাই না। দলের কেউ সংঘাত করলে তার রেহাই নেই, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেব।

গণতন্ত্রকে আরও সুদৃঢ় করতে হবে। শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। মানুষ হিসেবে গণ্য করলে রেলে আগুন দিয়ে কীভাবে মানুষকে পুড়িয়ে মারল? একটা মা তার ছোট বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য বুকে ধরে রেখেছিল, সেই অবস্থায় মরে কাঠ হয়ে গেল! বাসের ভেতরে হেলপার ঘুমিয়ে ছিল, আগুন দিল, হেলপার পুড়ে শেষ! ঠিক ১৩ ও ১৪ সালের মতো এবারও একই ঘটনা তারা (বিএনপি) ঘটিয়ে চলেছে।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ ভবন থেকে পাঁচ জেলার নির্বাচনী জনসভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা পর্যায়ক্রমে রংপুর বিভাগের পঞ্চগড় ও লালমনিরহাট জেলা, রাজশাহী বিভাগের নাটোর ও পাবনা জেলা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের খাগড়াছড়ি জেলার নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন।
এসব কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা, সংশ্লিষ্ট জেলা আওয়ামী লীগ, উপজেলা/থানা/পৌর আওয়ামী লীগ, ইউনিয়ন/ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতারা এবং সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর নির্বাচনী এলাকাসমূহের মনোনীত প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, ভোট চুরির সুযোগ নেই বলেই বিএনপি নির্বাচনে আসেনি। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ এখন বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। দেশের এমন কোনো জেলা নেই যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি, যেটা আওয়ামী লীগ সরকার করেছে। তিনি বলেন, ভোটের অধিকার আওয়ামী লীগ জনগণকে ফিরিয়ে দিয়েছে। আর সেটা অব্যাহত থাকবে। এবারের নির্বাচনে আপনাদের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ করে কেউ যেন মানুষের ক্ষতি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। ভোট নিয়ে যাতে কোনো সংঘাত না হয়, জনগণ যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে। দলের নেতাকর্মী যেই হোক, এর কোনো ব্যত্যয় হলে ছাড় দেওয়া হবে না। কেউ কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করবেন না। এখানে কিন্তু কোনা রকম মারামারি-সংঘাত আমি দেখতে চাই না।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, একটা প্রত্যয় নিয়েই আমি দেশে ফিরে এসেছিলাম, স্বাধীনতার সুফল বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছানো। মানুষের মৌলিক অধিকার পূরণ করে তাদের জীবন উন্নত করা। যেটা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করা হয়েছিল, জনগণের অধিকার তাদের হাতে ফিরিয়ে দিতেই এই প্রত্যয় নিয়ে সংগ্রাম শুরু করেছিলাম। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে আমাদের। তারপরও থেমে থাকিনি। মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ করে গেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা সময় এ দেশের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আওয়ামী লীগের অগণিত নেতাকর্মীকে অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তারপর আমরা ২১ বছর পর সরকারে আসি। আর জনগণের সেবক হিসেবে যাত্রা শুরু করি। এরপর থেকেই দেশের উন্নয়নে কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু ২০০১ সালে আবার সরকারে আসতে পারলাম না। কারণ হলো আমাদের গ্যাস বিক্রির একটা প্রস্তাব ছিল, বড় একটি দেশ থেকে। তখন আমি বলেছিলাম- এটি দেশের জনগণের সম্পদ, এটি আমি বিক্রি করতে পারব না। তবে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া রাজি হয়ে যায়।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ সালে আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে অত্যাচার করা হয়েছিল, শুধু তাই নয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যারাই নৌকায় ভোট দিয়েছিল, তাদের ওপর মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিরা যেভাবে আমার দেশের মা-বোনদের ওপর নির্যাতন করেছিল, ঠিক সেইভাবে অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়। আমি নিজেও তাদের হাতে আক্রমণের শিকার হয়েছি বারবার। তারপরও থেমে থাকিনি। এ জন্য আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ জানাই। তারা কষ্ট সহ্য করেছে। গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ এখন বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। এ ১৫ বছরে দেশের এমন কোনো জেলা নেই যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি।

তিনি বলেন, আমরাই কিন্তু সংগ্রামের মাধ্যমে একটা বিষয় প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম- ‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’। আমরাই ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছি। আমরা ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছি। আজ মানুষ ভোট দিতে পারে, সেই সুযোগ সৃষ্টি করেছি। দেশের জনগণের আর্থসামাজিক মর্যাদা সৃষ্টি করেছি। তাই ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট দেবে জনগণ। নির্বাচন উন্মুক্ত করেছে সরকার। নৌকাসহ আছে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীও। কেউ কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করবেন না। যাকে খুশি তাকে জনগণ ভোট দেবে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, অবৈধভাবে উত্থান হওয়া বিএনপি শুরু থেকেই সংবিধানবিরোধী। ভোট চুরির সুযোগ নেই বলেই বিএনপি নির্বাচনে আসেনি। ভোট চুরির অপরাধে ১৯৯৬ সালে দেশের মানুষ খালেদা জিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল, সেটা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। ভোট চুরির অপরাধে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। ভোট চুরির অপরাধে তাকে বিদায় নিতে হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ভোট চুরির চেষ্টা করেছিল ২০০৬ সালেও। ভুয়া ভোটার সৃষ্টি করে যারা ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিল, তাদের মুখে গণতন্ত্রের কথাও শুনতে হয়, ভোটের কথাও শুনতে হয়।
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপি মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। মানুষ হিসেবে গণ্য করলে রেলে আগুন দিয়ে কীভাবে মানুষকে পুড়িয়ে মারল? একটা মা তার ছোট বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য বুকে ধরে রেখেছিল, সেই অবস্থায় মরে কাঠ হয়ে গেল! বাসের ভেতরে হেলপার ঘুমিয়ে ছিল, আগুন দিল, হেলপার পুড়ে শেষ! ঠিক ১৩ ও ১৪ সালের মতো এবারও একই ঘটনা তারা (বিএনপি) ঘটিয়ে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির জন্ম হয়েছে কার দ্বারা? অবৈধভাবে সংবিধান লঙ্ঘনকারী, সেনা আইন লঙ্ঘনকারী, ক্ষমতা দখলকারী এক জেনারেলের পকেট থেকে। জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। হ্যাঁ-না ভোটের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। ক্ষমতায় বসে থেকে একদিকে সেনাপ্রধান, আরেক দিকে রাষ্ট্রপ্রধান, আবার নির্বাচনও করেছেন। এটা সেনা আইনবিরোধী। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীর পকেট থেকে বের হওয়া একটি দল বিএনপি। তাদের কাজের সবকিছুই অবৈধ।
আওয়ামী লীগ এ দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির কাজ হচ্ছে জ্বালাও-পোড়াও, অগ্নিসন্ত্রাস। এটাই তারা পারে। এটাই তারা ভালো বোঝে, এটাই তারা জানে। নির্বাচনে তারা আসবে না; আসবে কীভাবে বলেন? ২০০৮-এর নির্বাচন নিয়ে তো কারও কোনো অভিযোগ নেই। কেউ তো কোনো কথা বলতে পারে না। ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফল কী ছিল? সেই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট, তারা পেয়েছিল মাত্র ৩০টা সিট। আর আওয়ামী লীগ এককভাবে পেয়েছিল ২৩৩টা সিট। এই কথাটা সবাইকে মনে রাখতে হবে। তারা বড় বড় কথা বলে, ভোটের কথা বলে, ওরা ভোটের কী বোঝে?
তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকানোর নামে ৫৮২টি স্কুল, ৭০টি সরকারি অফিস, ছয়টি ভূমি অফিস এবং ৩২৫২টি গাড়ি, ২৯টি রেল, নয়টি লঞ্চ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। এমনকি জজের এজলাসেও তারা আগুন দেয়। বোমা মেরে ঝালকাঠিতে জজকে হত্যা করে। গাজীপুরে আইনজীবীদের আক্রমণ করল এবং বোমা মেরে আহত করল। এটাই-তো বিএনপির চরিত্র। এখন আবার শুরু করেছে অগ্নিসন্ত্রাস। বাসে আগুন দিচ্ছে, রেলে আগুন দিচ্ছে। নতুন কোচ আমরা কিনেছি মানুষ যাতে শান্তিতে চলাফেরা করতে পারে। মানুষের শান্তি দেখলে ওদের মনে অশান্তি লাগে। সেগুলোও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে আমরা দুর্নীতিমুক্ত করতে চাই। কারণ, দুর্নীতি একটি দেশকে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। কিছু লোক হঠাৎ আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়, আর যারা সৎভাবে জীবনযাপন করেন, তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়। সে কারণে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স আমরা ঘোষণা দেব। দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়, সমতাভিত্তিক সমাজ, অর্থনৈতিকভাবে ন্যায় এবং সমতাভিত্তিক করে মানুষের জীবনমান উন্নত করাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চাই। সেভাবে আমরা দেশকে গড়ে তুলতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশ শুধু একটি শব্দ নয়, এর অন্তর্নিহিত অর্থ হচ্ছে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নকে স্থায়ী করে আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন সুফল ভোগ করতে পারে সে ব্যবস্থা করা। সেজন্য আমরা প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ঠিক করে দিয়েছি। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে স্মার্ট বাংলাদেশ।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক করে দিয়েছি। দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বিনা জামানতে ঋণ নিতে পারবে তারা। কৃষকদের মধ্যে যারা বর্গাচাষি তারা যাতে জামানত না রেখে কৃষিঋণ পেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করেছি। আমরা কৃষকদের উপকরণ কার্ড দিয়েছি। দুই কোটির ওপরে কৃষক এই উপকরণ কার্ড পান, ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। ভর্তুকির টাকা ব্যাংকে সরাসরি তাদের কাছে চলে যায়।
তিনি বলেন, বিএনপির আমলে এই কৃষকরা সার চেয়েছিল বলে তাদের গুলি করা হত্যা করা হয়। আজ আমাদের কৃষকদের সারের পেছনে ছুটতে হয় না। সার কৃষকের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছায়। আওয়ামী লীগ সরকারে এসে এ ব্যবস্থা করেছে।

×