ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

পেশা ছাড়ছে অনেক পরিবার

মাদারীপুরে মৃৎশিল্পের দুর্দিন

নিজস্ব সংবাদদাতা, মাদারীপুর

প্রকাশিত: ০০:৫৭, ২ এপ্রিল ২০২৩

মাদারীপুরে মৃৎশিল্পের দুর্দিন

মাটি দিয়ে মৃৎশিল্পীরা বিভিন্ন আকৃতির হাঁড়ি-পাতিল তৈরিতে ব্যস্ত

লোকসংস্কৃতি ও লোকজশিল্পের একটি অন্যতম প্রধান শাখা হলো মৃৎশিল্প। কৃষিনির্ভর বাঙালি সমাজ থেকে বাংলায় মৃৎশিল্পের উৎপত্তি হয়েছে। মৃৎশিল্পের সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটেছে সমাজভুক্ত মানুষের প্রয়োজনে। প্রাত্যহিক জীবনের চাহিদা পূরণের জন্যই মৃৎশিল্প বিকাশ লাভ করেছে। মৃৎশিল্প মাদারীপুর জেলার প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত জেলার সহস্রাধিক মানুষ। এরা কুম্ভকার বা কুমোর বা কুমার নামে পরিচিত। কুমার বা পাল সম্প্রদায়ের লোক এদের অন্তর্গত। মধ্যবিত্ত শ্রেণির পাল বংশের লোক এ পেশায় নিয়োজিত।

কাঁদামাটি দিয়ে কুমোররা বিভিন্ন আকৃতি-প্রকৃতির এবং সাইজের হাড়ি-পাতিল-বাসন-কোসনসহ গৃহস্থলির কাজের উপযোগী নানা পণ্য তৈরি করে থাকেন। হাত এবং চাকার সাহায্যে কাঁদা মাটি দিয়ে বিভিন্ন দ্রব্যাদি তৈরির পর কাঁচা থাকতে তাতে কাঠি দিয়ে পাতা, ফুল, পাখি ও রেখাদির নক্সা করা হয়। কখনো আবার দ্রব্যাদির পোড়াবার পর এতে নানা রঙের সমাবেশে বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় নক্সা করা হয়। খেলার পুতুল ও ঘর সাজানোর সৌখিন দ্রব্যও কুমোরেরা তৈরি করেন।

পাল বা কুমোরেরা হিন্দুদের বিভিন্ন দেব-দেবির মূর্তি নির্মাণ করেন। বাঁশ, খড়কুটা, মাটি, কাপড় ও রং দ্বারা নির্মিত তাদের এ মূর্তিগুলো এক অসাধারণ শিল্পকর্ম। কুমার শ্রেণির সাধারণ মেয়েরা মৃৎশিল্পের নানা দ্রব্য তৈরিতে তাদের পরিবারের সদস্যদেরকে সাহায্য করেন। এতে রয়েছে তাদের সুনিপুণ দক্ষতা। এসব পণ্যের প্রধান উপকরণ মাটি। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় মেলামাইন, স্টিল, সিলভার, কাঁচের তৈরি বাহারী ও মনকাড়া সব পণ্য বাজারে আসায় এসব লোকজশিল্পের কদর দিন দিন কমে এসেছে।

তাই ওইসব আধুনিক হাড়ি-পাতিল-বাসন-কোসনসহ গৃহস্থলি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক পরিবার ধীরে ধীরে এ পেশা ছেড়ে যাচ্ছেন জীবন-জীবিকার টানে। এক সময় এই জনপদ মৃৎশিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। বর্তমানে কারখানা থেকে উৎপাদিত দৈনন্দিন গৃহস্থালি সরঞ্জাম বা তৈজসপত্রের সর্বাপেক্ষা ব্যবহার হওয়ায় মাটির তৈরি তৈজসপত্রের আবেদন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।

তবে এখনো গ্রামের নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজের জন্য মাটির বিভিন্ন জিনিসপত্র ব্যবহার করে থাকেন। যেমনঃ হাড়ি, কলসি, মটকা, বিভিন্ন ধরনের ব্যাংক, ফুলদানি, সান্কি, বদনা, দইয়ের ভাঁড়, ঘটি, মালসা, পাতিল, ছাইদানি ইত্যাদি। এ থেকেই মাদারীপুরের লোকায়ত মৃৎশিল্পের একটি বিমূর্ত পরিচয় ফুটে ওঠে। ঐতিহ্য পরম্পরায় পাল সম্প্রদায়ের মানুষ এ শিল্পের কারিগর।
দুর্ভোগ সত্ত্বেও ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্পের ধারক-বাহক কুমোর সম্প্রদায়ের কিছু নারী-পুরুষ এখনো তাদের পৈত্রিক পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন।                  
বর্তমানে মাদারীপুরে কুমোর সম্প্রদায়ের ১৫৫ পরিবারের ৭৭৫ নারী-পুরুষ মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত থেকে কোনমতে টিকে আছেন। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৪৩ পরিবার, রাজৈর উপজেলায় ৫৮ পরিবার, শিবচরে ২৮ পরিবার এবং কালকিনিতে ২৬ পরিবার। সদর উপজেলার পূর্ব রাস্তি, কুলপদ্দী, ঘটমাঝি, মস্তফাপুর, রাজৈর উপজেলার খালিয়া, গোয়ালবাথান, সেনদিয়া, কদমবাড়ি, মজুমদারকান্দি, শিবচর উপজেলার চান্দেরচর, দ্বিতীয়াখ-, দত্তপাড়া, পাচ্চর, কালকিনি উপজেলার বাঁশগাড়ির খাসেরহাট, কালকিনির পালপাড়া। 
জেলার উল্লেখযোগ্য মৃৎশিল্পীরা হলেনÑসদর উপজেলার রতন পাল, সন্তোষ পাল, সরণ পাল, বিষু পাল, নন্দ পাল, রাজৈর উপজেলার নারায়ণ পাল, দিলীপ কুমার পাল, আনন্দ পাল, বাচ্চু পাল, কালকিনি উপজেলার মাধব পাল, মরণ পাল, সারদা সুন্দরী পাল, অনীল পাল (১), অনীল পাল (২), সুশীল পাল, নকুল চন্দ্র পাল, সহদেব পাল এবং শিবচর উপজেলার রমেশ পাল, ভূবন পাল ও রমনী পাল। ঘটুপাল, কালিদাস পাল, পাগলা পাল, জগদীশ পাল, অতুল পাল। এরা সকলেই মাটির বিভিন্ন তৈজসপত্র তৈরির পাশাপাশি সব ধরনের দেবদেবির প্রতিমা তৈরিতে দক্ষ।

×