ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ২৬ জুন ২০২৪, ১৩ আষাঢ় ১৪৩১

অডিও ফাঁস, তোলপাড় ॥ খুঁজে বের করার নির্দেশ ইসির

আবু আসিফ নিখোঁজ নাকি আত্মগোপনে

বিশেষ প্রতিনিধি ও স্টাফ রিপোর্টার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

প্রকাশিত: ২৩:১৮, ৩০ জানুয়ারি ২০২৩

আবু আসিফ নিখোঁজ নাকি আত্মগোপনে

আবু আসিফ

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসনের উপনির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবু আসিফ নিখোঁজ নাকি আত্মগোপনে এ নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও আশুগঞ্জে তোলপাড় চলছে। তার স্ত্রী তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বললেও আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, তিনি আত্মগোপনে থেকে নাটক করছেন। এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি তার। তবে একটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হওয়ার পর সোমবার আবু আসিফের বিষয়টি টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়। এদিকে ‘নিখোঁজ’ আবু আসিফকে উদ্ধারে মাঠ প্রশাসনকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কঠোর নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিশনার রাশেদা সুলতানা। 
আবু আসিফ আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন। আগামীকাল বুধবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) উপনির্বাচনে তিনি বিএনপি চেয়ারপার্সনের সাবেক উপদেষ্টা ও এই আসন থেকে পাঁচবারের সাবেক সংসদ সদস্য বহিষ্কৃত নেতা উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়ার অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। আবু আসিফ মোটরগাড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন। ক’দিন থেকেই আবু আসিফ অভিযোগ করে আসছিলেন, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য তার ওপর প্রচ- চাপ ছিল।

তার নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মী-সমর্থকদের নানাভাবে হয়রানি করাসহ ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছিল। তবে এর মধ্যেও তিনি নির্বাচন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। গত ২৬ জানুয়ারি আসিফ অভিযোগ করেছিলেন, গত ২৫ জানুয়ারি রাত থেকে তার শ্যালক ও নির্বাচন পরিচালকারী কমিটির প্রধান সমন্বয় শাফায়েত হোসেন (৩৮) নিখোঁজ রয়েছেন। ওইদিন রাতে পুলিশ গ্রেপ্তার করেন তার প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মুসা মিয়া (৭৫) কে। যদিও পুলিশ বলেছিল মারামারির মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এরপর গত রবিবার আশুগঞ্জে খবর ছড়িয়ে পড়ে আবু আসিফ নিখোঁজ। তার স্ত্রী মেহেরুন্নিছা জানান, গত দুই দিন ধরে তার স্বামী ঘরে ফিরেনি। আমাদের লোকজনও ভয়ে থাকছে। এজেন্ট নিয়োগ দিতে সমস্যা হচ্ছে। কাজের লোক এলেও ছবি তুলে রাখে, ভিডিও করে রাখে। এভাবে তো সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। তারা একজনকে জয়ী করবে এটি আগে বললেই তো পারে। কেন আমাদের এত টাকা খরচ করালো? আমার ছোট ভাইকেও বুধবার থেকে পাচ্ছি না।

মেহেরুন্নিছা বলেন, আমার স্বামী আত্মগোপনে যাননি। এ বিষয়ে থানায় বা কোথাও লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের পালিয়ে থাকতে হচ্ছে। আমিও ভয়ের মধ্যে আছি। দ্রুত একটা কিছু করব।
তবে আবু আসিফ নিখোঁজ হওয়ার খবর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসিফের স্ত্রী এবং বাসার কেয়ারটেকারের মাঝে ফোনালাপ বলে একটি অডিও ফাঁস হয়। যেখানে আসিফের স্ত্রী হিসাবে বাড়ির কেয়ারটেকারকে আসিফের জন্য জামা কাপড় গোছানোর জন্য নির্দেশ দিতে শোনা যায়।

সেখানে একটি নারী কণ্ঠ, ‘ইফসুফ (কেয়ারটেকার) স্যার কই, স্যারের (আসিফ) কতগুলো জামা কাপড়, গেঞ্জি, প্যান্ট, শীতের কাপড়, জুতা মোজা ব্যাগে ভরে দিয়ে দে তাড়াতাড়ি। আরে তাড়াতাড়ি দে। কেউ যেন না জানে স্যার কই গেছে। ক্যামেরা বন্ধ করে দে। ক্যামেরার লাইন বন্ধ কর বাসার। স্যার গেলে আরও ১০ মিনিট পর ক্যামেরার লাইন খুলবে।
এমন কথোপকথন ফাঁস হবার পর বিএনপি নেতা আসিফ নিখোঁজ নাকি আত্মগোপনে গিয়েছেন এ নিয়ে আলোচনা আরও ডালপালা মেলতে শুরু করে। এরপর থেকে সোমবার সারাদিন ফোন করলেও আসিফের স্ত্রী ফোন রিসিভ করেননি। আসিফের ফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।
আসিফের ভাতিজা ও আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু নাসের বলেন, আমি সাত্তার সাহেবের (কলার ছড়ি) নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত। চাচা আসিফের বিষয়ে কিছুই জানি না। আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক (১) এম এম তোফায়েল আলী রুবেল বলেন, আসিফ নিজেই আত্মগোপন করে নাটকের জন্ম দিয়েছেন। নির্বাচনে আলোচনায় থাকার জন্যই তিনি এ কাজ করেছেন। 
পুলিশ সুপার মো. শাখাওয়াত হোসেন জানান, তার নিখোঁজের বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়নি। তিনি নিজে থেকেই লুকিয়ে রয়েছেন নাকি নিখোঁজ হয়েছেন তা অনুসন্ধানে পুলিশসহ একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে কাজ করছে। 
এদিকে এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা আবু আসিফের। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও বন্ধ রয়েছে। গত শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন বলে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন তার স্ত্রী মেহেরুন্নিছা। 
আবু আসিফকে উদ্ধারে ইসির নির্দেশ ॥ ‘নিখোঁজ’ স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু আসিফ আহমদকে উদ্ধারে মাঠ প্রশাসনকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কঠোর নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিশনার রাশেদা সুলতানা। সোমবার রাজধানীর নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
রাশেদা সুলতানা বলেন, আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলেছি আপনারা চেষ্টা করেন, উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। আপনারা চাইলে উদ্ধার করতে পারবেন না, এটা বিশ্বাস করি না। তাকে উদ্ধার করেন। আন্তরিকতার সঙ্গে চেষ্টা করেন, ইলেকশনের আগে যেভাবে হোক, তাকে বাইরে নিয়ে আসেন। 
ঘটনাটি কমিশন তদন্ত করতে বলেছে জানিয়ে কমিশনার রাশেদা সুলতানা বলেন, আমরা তদন্ত করতে দিয়েছি। আগে তদন্ত প্রতিবেদন আসুক, তারপর দেখা যাবে কী হয়।

ডিসি, এসপি ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা- এই তিনজনকে আমরা বলেছি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেন। ঘটনাটা আসলে কী? উনি নিখোঁজ কবে থেকে হলেন, কেন হলেন, কী সমাচার- এই বিষয়গুলো। এছাড়া অন্য কিছু নয়। আমরা খবরে দেখতে পেয়েছি তাকে নাকি আটকে রাখা হয়েছে। এর সত্যতা কতটুকু তা জানার জন্য তদন্ত করতে দিয়েছি।

×