ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১

যুদ্ধদিনের স্মৃতি

ব্রিজের ঢালে মাইন পুঁতে পাক সেনাদের জিপ উড়িয়ে দেই

সুবল বিশ্বাস, মাদারীপুর

প্রকাশিত: ০০:২৭, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩

ব্রিজের ঢালে মাইন পুঁতে পাক সেনাদের জিপ উড়িয়ে দেই

শাহজাহান হাওলাদার

১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণায় দেশমাতৃকার টানে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সর্বস্তরের মানুষ। দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছিলেন লাল-সবুজের পতাকা।

নয় মাস যাদের বীরত্বে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়েছিল, তাদেরই একজন মাদারীপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান হাওলাদার। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর অপারেশন কমান্ডার।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মাদারীপুর জেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান হাওলাদার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২৫ মার্চ কালরাতে হানাদার বাহিনী অপারেশন সার্চ লাইটের নামে যে নারকীয় তা-ব চালিয়েছিল, তাতে আমি স্তম্ভিত হয়ে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। দেশ রক্ষার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। আমি তখন মাদারীপুর নাজিমুদ্দিন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সেই সময়ে ছাত্র আন্দোলনে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম।

মুক্তিযুদ্ধে যেতে হয়ে আমরা বেশ ক’জন ছাত্র-যুবক একত্রিত হয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করি। তৎকালীন মহকুমা শহরের পাড়া-মহল্লায় ঘরে ঘরে গিয়ে ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করি। এভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে মাদারীপুর থেকে প্রথম ব্যাচ শরীয়তপুর, চাঁদপুর, ফেনী হয়ে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। সে সময় আমি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল নিয়ে প্রশিক্ষণের উদ্দেশে তাঁতীবাড়ি, বালিয়া, সুচারভাঙ্গা, খাগছাড়া গ্রামে অবস্থান নেই। তারপর ২৭ জনের একটি দল নিয়ে মধুমতি নদীর উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে যশোর হয়ে আমরা ভারতে যাই। আমার সাথীদের নিয়ে ভারতের চাঁদপাড়া ক্যাম্পে ভর্তি করি।

মাদারীপুর মহকুমার সভাপতি আছমত আলী খানের একটি  চিঠি নিয়ে আমি শ্রীনিকেতন হোটেলে গিয়ে সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ফণীভূষণ মজুমদারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি আমাকে বললেন, ‘ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আমরা মুজিব বাহিনীতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। তুমি সবাইকে নিয়ে সেখানে চলে যাও।’ ৫০ জনের একটি দল নিয়ে আমরা দমদম বিমানবন্দরে যাই। সেখানে একটি কার্গো বিমানে করে শিলিগুড়ি বিমানবন্দরে পৌঁছাই। শিলিগুড়িতে একদিন অপেক্ষা করি।

পরের দিন শিলিগুড়ি থেকে কার্গো বিমানে উত্তর প্রদেশে হিমালয়ের পাদদেশে শাহারানপুরে একটি সুরক্ষিত বিমানবন্দরে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। বিমান থেকে নামার পরে ওই বিমানবন্দরেই রাতযাপন করি। সেখানেই রাতের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নেই। পরদিন ভোর পাঁচটার দিকে ঘণ্টা বাজলে একজন সেনা কর্মকর্তা এসে বলেন, ‘আপনারা প্রস্তুত হন। আপনাদের এখন দেরাদুন টানডুয়া ট্রেনিং সেন্টারে যেতে হবে।’ তার কথামত আমরা রওনা হলাম। সন্ধ্যায় সাড়ে ছয়টায় দেরাদুন ক্যাম্পে পৌঁছাই।

সেখানে বাংলাদেশের পতাকাকে সম্মান করে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর ৩/৪ দিন বিশ্রাম। এরপর আমরা ফিজিক্যাল প্রশিক্ষণ ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেই। সেখানে থ্রি নট থ্রি রাইফেল ফায়ারিং, নাইন এমএম পিস্তল, এসএসজি, সেভেন পয়েন্ট সিক্স এসএলআর, এলএমজি, দুয়েস মর্টার ও ৩৬ হ্যান্ডগ্রেনেড নিক্ষেপ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মূলত এ প্রশিক্ষণটি ছিল কিভাবে বোমা তৈরি করতে হয় এবং গেরিলা যুদ্ধ করতে হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে আমরা সবাই কলকাতার ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টে ক’দিন থাকার পরে শাহজাহান খানের (বর্তমান এমপি) নেতৃত্বে ১২০ জন নিয়ে আগস্টের মাঝামাঝি যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে আসি। এ সময় জিটি রোডের বাংলাদেশের অংশে এসে পাকসেনাদের আক্রমণে আমরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাই। এ সময় আমরা একটি আখ খেতে পানির মধ্যে ২৪ ঘণ্টা একটানা দাঁড়িয়ে থেকে কাটাই। পরের দিন রাত আটটার দিকে শাজাহান খান এবং এক ব্যক্তি আমাদের খুঁজে উদ্ধার করেন। এরপর সবাই একত্রিত হয়ে শাজাহান খানের সঙ্গে যশোরে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেই।

তারপর কপোতাক্ষ নদ পাড়ি দিয়ে আমরা শ্রমিক নেতা জাফর উল্লাহ ভাইয়ের ক্যাম্প বোয়ালমারী থানার কাছাকাছি অবস্থান করি। সেখানে জাফর উল্লাহ ভাইয়ের অনুরোধে বোয়ালমারীতে আমরা একটি যুদ্ধে অংশ নেই। এই যুদ্ধ ছিল মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দলের প্রথম যুদ্ধ। ওই যুদ্ধে বেশ কয়েক রাজাকার নিহত হয়।
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, পরের দিন আমরা রাজৈর এসে মাদারীপুর মুজিব বাহিনীর জেলা কমান্ডার সরোয়ার হোসেন মোল্লার ক্যাম্পে অবস্থান করি। বেশ কিছুদিন সেখানে থাকা অবস্থায় টেকেরহাটের পাকসেনাদের ক্যাম্পে আক্রমণ করি। ঈদের আগের দিন রাতে সরোয়ার হোসেন মোল্লার নেতৃত্বে রাজৈর থানা আক্রমণ এবং শাজাহান খানের নেতৃত্বে বৌলগ্রাম সড়ক অবরোধ ও আক্রমণ করি রাত ১২টায়। তার আগে শাজাহান খানের নেতৃত্বে দুটি ‘এন্ট্রিপ্যারসোনাল মাইন’ ব্রিজের ঢালে পুঁতে রাখি।

পাকসেনারা রাজৈর থানায় আক্রমণ করবে জেনে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে আসার সময় পাকসেনাদের জিপ উড়িয়ে দেই। এতে ৮-১০ জন পাকসেনা এবং ৫-৬ জন রাজাকার নিহত হয়। সারারাত যুদ্ধ করে ভোরবেলা যখন পূর্বাকাশে সূর্য লাল হয়ে ওঠে, তখন মাদারীপুর থেকে পাকসেনারা রাজৈর এবং বৌলগ্রামে আক্রান্ত পাকসেনাদের উদ্ধারে আরও সেনা সেখানে গেলে আমরা সেখান থেকে রাজৈর শাখারপাড় ক্যাম্পে চলে যাই। 
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আরও বলেন, শাজাহান খানের নেতৃত্বে রাজৈর থেকে শিরখাড়া গেলে শিরখাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন ক্যাম্প স্থাপন করি। সেখান থেকে আমরা কবিরাজপুর, শ্রীনদী হাট ও নদীপথে পাকসেনাদের নৌ যাতায়াতে বাধা সৃষ্টি করি। সেখানে এক মাস কাটানোর পর আমরা সদর থানার খোয়াজপুরে চরগোবিন্দপুর নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং খোয়াজপুর মাদ্রাসায় দুটি ক্যাম্প স্থাপন করি। তারপর সেখান থেকে মহিষেরচর লঞ্চঘাটে রাজাকারদের ক্যাম্পে আক্রমণ করি।

মাঝামাঝে পাকসেনাদের মধ্যে মানসিক যন্ত্রণা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হাওলাদার জুট মিলসে পাকসেনাদের ক্যাম্প আক্রমণ করি। প্রতিনিয়ত আমরা এভাবে রাজাকার ও পাকসেনাদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্যই ঝটিকা হামলা করি। আমরা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে পাক সেনাদের দিকভ্রষ্ট করে ফেলি। হানাদার বাহিনী বুঝতেই পারেনি কোথা থেকে কিভাবে তাদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। খোয়াজপুর মাদ্রাসা ক্যাম্পের সামনে বড় একটা বটগাছ ছিল। ৪ ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে ওই বটগাছের নিচে বসে শাজাহান খানের নেতৃত্বে আমরা অস্ত্র পরিষ্কার করছিলাম।

হঠাৎ পাকিস্তানি একটা হেলিকপ্টার আসার আওয়াজ পেয়ে এসএলআর দিয়ে হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে ফায়ার করি। তখন হেলিকপ্টারের পাখায় গুলি লাগে। কিন্তু হেলিকপ্টারটি ভূপাতিত হয়নি। পরে হেলিকপ্টারটি ঘুরপাক দিতে দিতে এআর হাওলাদার জুট মিলে গিয়ে অবতরণ করে। 
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে এআর হাওলাদার জুট মিলের ভেতরে হানাদার হানাদার বাহিনীর টর্চার সেলে মুক্তিযোদ্ধাসহ দুই হাজারের বেশি মুক্তিকামী নারী-পুরুষকে নির্যাতনের পর হত্যা করে টর্চার সেলের পশ্চিম পাশের মাঠে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এদের বেশিরভাগই ছিল পালং থানার বিভিন্ন গ্রামের। এই টর্চার সেলে যুদ্ধের নয় মাস হানাদার বাহিনীর নির্যাতন, ধর্ষণ আর হত্যাকা-ের নারকীয় তা-ব চলে। 
এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ৮ ডিসেম্বর রাত দুটার দিকে খোয়াজপুর ক্যাম্পে সংবাদ আসে- পাকসেনারা ভোর পাঁচটায় মাদারীপুর ক্যাম্প ত্যাগ করবে। আমরা পাকসেনাদের আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হই। ৩০-৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা দুই ক্যাম্পে থেকে একত্রিত হয়ে নৌকায় মহিষেরচর এসে লঞ্চঘাটে ডা. রেজাউল করিমের বাড়ির সামনে নামি।

সেখান থেকে মার্চ করে আমার নেতৃত্বে মাদারীপুর সদর থানায় পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় উপস্থিত হলে থানার তৎকালীন ওসি জয়নাল আবেদীন অস্ত্র, গোলাবারুদ জমা দিয়ে সকল পুলিশ সদস্য নিয়ে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করে। আমি থানার অস্ত্রাগারে অস্ত্র, গোলা বারুদ জমা রেখে অস্ত্রাগারের চাবি নিয়ে ট্রেজারিতে যাই। সেখানে গেলে কর্মরত পুলিশ আত্মসমর্পণ করে।

×