ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ৯ আশ্বিন ১৪২৯

যশোরে চুক্তি করা বহু চালকলের কোন অস্তিত্ব নেই

চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে না

স্টাফ রিপোর্টার, যশোর অফিস

প্রকাশিত: ২৩:৫২, ১১ আগস্ট ২০২২

চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে না

চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হচ্ছে না

অস্তিত্ব নেই এমন সব চালকলের সঙ্গে চুক্তি করেছে যশোর খাদ্য বিভাগযার খেসারতে বিঘ্নিত হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচীচাল সংগ্রহে সরকারী লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় বারবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে বাজার

যশোরে চলতি বোরো মৌসুমে ২৬ হাজার ৭৫৪ মেট্রিক টন চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে খাদ্য অধিদফতরমে মাস থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছেশেষ হবে আগামী ৩১ আগস্টনির্ধারিত সময় শেষ হতে চললেও  সাত হাজার মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ বাকি রয়েছেবোরো চাল নিতে ২৫৪ টি রাইস মিলের সঙ্গে চুক্তি করে আটটি উপজেলা খাদ্য অফিসএরমধ্যে অটো রাইস মিল রয়েছে ২৩টিবাকি ২৩১টি পুরনো প্রযুক্তির হাসকিং মিল

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খাদ্য বিভাগের সঙ্গে চুক্তি করা অর্ধশতাধিক হাসকিং মিলের কোন অস্তিত্বই নেইঅথচ চাল দেয়ার প্রধান শর্তের মধ্যে রয়েছে, মিলিং ও ফুড গ্রেইন লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলকথাকতে হবে বয়লার, চিমনি এবং চাতালওপ্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয়ের সনদ থাকতে হবে প্রতিটি মিলের

এগুলোর কোন একটি না থাকলে সেই মিলের সঙ্গে চুক্তি করা যাবে নাকিন্তু যশোরের কোন উপজেলায় এসব শর্ত পুরোপুরি মানা হয়নিসদর উপজেলার বারীনগর বাজারের ভাই ভাই রাইস মিলের সঙ্গে চুক্তি করেছে যশোর খাদ্য বিভাগকিন্তু সরেজমিনে এই মিলের  কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নিএই মিলের মালিক আবুল খায়ের জানান, পাঁচ বছর ধরে তার চাতাল বন্ধচুক্তির চাল বাইরে থেকে কিনে দেনযা নীতিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থীনীতিমালার বাইরে গিয়ে এই রাইস মিলের নামে ২৪.৪৮০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে

এ পর্যন্ত কী পরিমাণ চাল খাদ্য গুদামে দিয়েছেন সেই সম্পর্কে কিছুই বলতে পারেননি মালিক আবুল খায়েরযদিও জেলা খাদ্য বিভাগ বলছে ভাই ভাই রাইস মিল বরাদ্দের সবটুকু চাল সরবরাহ করেছেবারীনগর বাজারের একতা রাইস মিলের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে খাদ্য বিভাগেরএই রাইস মিলের মালিকের নাম তবিবর রহমানতিনি ১৮ মেট্রিক টন চাল দেবেন বলে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেনকিন্তু এ পর্যন্ত কোন চাল দিতে পারেননি

সরেজমিনে দেখা গেছে, তার কোন রাইস মিলই নেইযে ঘরে মিল ছিল সেই ঘর তিনি চঞ্চল নামে এক ব্যক্তির কাছে ভাড়া দিয়েছেন অনেক আগেইচঞ্চল ওই ঘরে বীজ ধান প্যাকেট করেনএকই অবস্থা দেখা যায় চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারের ভাই ভাই রাইস মিলে

এই মিলের মালিক জিয়াউর রহমান স্বীকার করেন তিনি মিলটি বাবলু নামে এক ব্যক্তির কাছে লিজ দিয়েছেনতাহলে সরকারী খাদ্যগুদামে চাল দেন কীভাবে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা, গোপালগঞ্জ ও নড়াইল থেকে মোটা চাল এনে সরবরাহ করেন বলে জানান তিনিজিয়াউর রহমানের চাতালবিহীন রাইস মিলের নামে ১৯.৯৮০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছেন স্থানীয় খাদ্য কর্মকর্তারাএই রাইস মিলের নামে ১০.০২০ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করা হয়েছেবরাদ্দ দেয়ার আগে কর্মকর্তারা খোঁজও নেননি মিলের অবস্থাটা কী

একই উপজেলার খড়িঞ্চি গ্রামে রয়েছে রকি রাইস মিলএই মিলের মালিক মিজানুর রহমানঅনেক আগেই একজন প্রবাসীর কাছে জায়গাসহ মিলটি বিক্রি করে দিয়েছেন ৮০ লাখ টাকায়এই মিলে কোন চাতাল নেইতারপরও তাকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৪.৫৪০ মেট্রিক টন চালএই চাল দেয়ার মতো কোন সুযোগ তার নেইএরপরও বিধি বহির্ভূতভাবে বাইরে থেকে এনে ২০.০৪০ মেট্রিক টন চাল দিয়েছেন মিজানুর রহমান

 চৌগাছার মতো দশা মনিরামপুর, অভয়নগরসহ অন্যান্য উপজেলায়ওবরাদ্দ পাওয়ার তালিকায় নাম রয়েছে মনিরামপুরের বিজয়রামপুর খইতলার গাজী রাইস মিলেরএই রাইস মিলের চাতাল তিন-চার বছর আগে থেকে বন্ধমালিক জহির উদ্দিন গাজী বলতে পারেননি তিনি কীভাবে সরকারী খাদ্যগুদামে চাল সরবরাহের বরাদ্দ পেয়েছেনঅথচ তাকে ৬০.৫৪০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছেখাদ্য বিভাগের তালিকায় এই রাইস মিলের ঠিকানা দেয়া হয়েছে তেঁতুলিয়া, লাউড়িযা স্পষ্টই দুর্নীতি বলে মনে করেন স্থানীয়রা

গাজী রাইস মিলের নামে ইতোমধ্যে ১৫ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করা হয়েছেএই এলাকার বিসমিল্লাহ রাইস মিলের মালিকের নাম আকরাম হোসেনতার নামে ৪৮.৭২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে খাদ্য বিভাগঅথচ এই মিলে অনেক শর্তই পূরণ নেইরাইস মিলটি ইতোমধ্যে ৩৪.৪২০ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করেছেচিনাটোলা বাজারের কলেজ রোডে রয়েছে চিত্তরঞ্জন রাইস মিলএই মিলের কোন চাতালই নেইতিন-চার বছর ধরে বন্ধতারপরও ১৩.৫৩০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছেনমালিক চিত্তরঞ্জন পাল জানান, তিনি এখন আর মিল চালান নামোহনপুরের উত্তম নামে একব্যক্তি চালানকিন্তু চাতালে কোন কাজ হয় নাএই রাইস মিলটি এখন পর্যন্ত কোন চাল দিতে পারেনি

এ বছর জেলায় চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ হাজার ৭শ৫৪ মেট্রিক টনএরমধ্যে ৭ আগস্ট পর্যন্ত ১৯ হাজার ৬০৪.২৫০ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহ হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কু-ু

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লাইসেন্স রক্ষা করতে অস্তিত্বহীন মিলের মালিকরা বিভিন্ন জায়গা থেকে চাল কিনে খাদ্যগুদামে কমবেশি দিয়েছেনতারা অটো রাইস মিল থেকে চাল কেনেন বলে খাদ্য বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছেএসব সূত্র জানিয়েছে, অন্যান্য বছর খোলাবাজারে মোটা চালের দাম কম থাকেএ কারণে চুক্তিবদ্ধ মিলাররা শর্ত ভেঙ্গে বাজার থেকে চাল কিনে খাদ্যগুদামে দিয়ে ব্যবসা করেছেন

গত দুমৌসুম খোলাবাজারে চালের দাম বেশি থাকায় সুবিধে করতে পারছেন না অস্তিত্বহীন মিলের মালিকরাএ কারণে চুক্তি করার পরও কেউ কেউ নামমাত্র চাল দিয়েছেনআবার কেউ একেবারেই দেননিএ কারণে স্থানীয় খাদ্যগুদামে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে নাফলে, রেশনিং ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীতে প্রভাব পড়ছেযদিও খাদ্য বিভাগের বক্তব্য, স্থানীয়ভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সরকার চাল আমদানি করে সঙ্কট মোকাবেলা করে থাকে

এ বিষয়ে যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কু-ু বলেন, সংগ্রহের আগে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকরা মিলগুলো সার্ভে করেনচাল দেয়ার উপযোগী কিনা যাচাই করার পর চুক্তি করা হয়তারপরও দুএকটিতে সমস্যা থাকতে পারেগত আমন মৌসুমে শর্ত পূরণ না থাকায় বেশ কয়েকটি মিলের চুক্তি বাতিল করা হয়এবারও খোঁজখবর নিয়ে যদি এমনটি প্রমাণিত হয় তাহলে সেগুলোও বাতিল করা হবে