৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

ব্যাংকিং খাতের অর্থনীতি

প্রকাশিত : ১ মার্চ ২০২০
  • ড. মিহির কুমার রায়

প্রায়ই পত্র-পত্রিকায় মুখ রোচক খবর বেরুচ্ছে ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে অলস টাকার পাহাড়, দেশে বিনিয়োগের মন্দাভাব কাটছে না আবার তারল্য সঙ্কটের কথাও কেউ কেউ বলছে ইত্যাদি। তথ্যমতে ব্যাংকগুলোর ভল্টে জমা থাকা অলস টাকা থেকে ব্যাংক কোন আয় করতে পারছে না যা অর্থনৈতিক কর্মকা-ে স্থবিরতার লক্ষণ বলে মনে করেন দেশের অর্থনীতিবিদগণ। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় বিনিয়োগে গতিশীলতা আনয়ন করা কিন্তু এই অতিরিক্ত তারল্যের বিনিয়োগ নিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। এখানে সমস্যার ধারাবাহিকতা তিনটি ভাগে বিভক্ত- প্রথমত, ব্যাংক বিনিয়োগের অপেক্ষায় টাকা নিয়ে বসে আছে; দ্বিতীয়ত, শিল্প উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না; তৃতীয়ত, বিনিয়োগ নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে দ্বিমত রয়েছে। এই আলোকে সার্বিক পরিস্থিতি যদি বিশ্লেষিত হয় তাহলে দেখা যায় যে, দেশের ভেতরে নতুন বিনিয়োগের ভাটা বিগত কয়েক বছর যাবত বিদ্যমান যা সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে জিডিপির মাত্র ৩১ ভাগ। অনেক উদ্যোক্তা আবার দেশের বাইরে বিনিয়োগের জন্য আগ্রহী হচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য হলো দেশে তারল্যের সরবরাহের চেয়ে উদ্যোক্তাদের অনাগ্রহই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আবার ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের ভেতরে বিনিয়োগের ঘাটতি রয়েছে বিশেষত অবকাঠামোগত সমস্যা যেমন গ্যাস ও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে স্বল্পতার কারণে। আবার ঋণের উচ্চ সুদের হার যা সরকারকেই ভাবতে হবে এবং সহনীয় নিম্ন সুদে ঋণ দিলে ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হয়ে ও দেশে-বিদেশে বিনিয়োগ করে অনেক লাভবান হতে পারবে। আবার ব্যাংকাররা বলছেন বিদেশী ঋণ উদারীকরণ নীতি আর স্থানীয় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ চাহিদা না থাকায় বাড়ছে অলস টাকার পরিমাণ যদিও বিনিয়োগের পরিবেশ বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে, আমানতে গড়ে সুদ সাড়ে ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে এবং বিনিয়োগে সুদের হার গড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে নেমে এলেও বাস্তবে উদ্যোক্তারা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ সুদের নিচে ঋণ পাচ্ছে না যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি প্রথমার্ধের পরিসংখ্যানেও উল্লেখ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, অতি ক্ষুদ্র শিল্প ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রকৃত শিল্পখাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলছে যার মধ্যে রয়েছে শিল্পে জমি বরাদ্দ ও জ্বালানি সংযোগ, সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি। তাছাড়াও অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ ও যার কারণে ঋণ খেলাপী হওয়ায় এই ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি ঘাটতিতে দাঁড়িয়েছে। যার মূল কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে যাচাই-বাছাই না করে নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ বিতরণ করা যার বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে মুনাফা ব্যতিরেকে। ব্যাংকগুলোর এই ধরনের আচরণ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক শঙ্কিত নয় তবে এর উন্নয়ন কল্পে কি পদক্ষেপ নেয়া জরুরী তা নিয়ে প্রয়োগধর্মী আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা একদিকে বলছি আর্থিক দৈন্যর কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশের সার্বিক উন্নয়নে শরিক হতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ অনেকটা মানবদেহে রক্ত সঞ্চালনের মতো। তবে অর্থ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে আর্থিক হাতিয়ার বাংলাদেশ যদি সুবিধামতো প্রয়োগ করে এবং সরবরাহ যদি উৎপাদন খাতে হয় তবে মুদ্রাস্ফীতির সম্ভাবনা থাকবে না এবং জাতীয় উন্নয়নে মূল্য সংযোজন ঘটাবে যা প্রবৃদ্ধি সহায়ক কিন্তু মূল কথা হলো ঋণ সরবরাহে অভাব নেই, ঘাটতি হলো উদ্যোক্তার উদ্যোগের যিনি মূলধন গ্রহণ ও সংগঠন করে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংখ্যা, আয় ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

এই মানবীয় দিকটির সঙ্গে উদ্যোক্তার নৈতিকতার প্রশ্নটি জড়িত এবং প্রায়ই বলা হয় দেশে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে কম আর যারা আছেন তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জড়িত থাকার চেয়ে ট্রেডিং এ আগ্রহ বেশি অর্থাৎ এক বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করে অন্য বাজারে বিক্রি। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া উদ্যোগের চেয়ে নতুন উদ্যোগ ও উদ্যোক্তা তুলনামূলকভাবে বেশি যারা বিনিয়োগের পরিবেশকে বিবেচনায় রেখে সতর্কতার সঙ্গে সামনে আগাতে আগ্রহী। এই ধরনের একটি প্রেক্ষাপটে ব্যাংক, সরকারী প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তা- এ তিনটি স্টেক হোল্ডারের ওপর নির্ভর করছে বিনিয়োগের গতিধারা অর্থাৎ অলস টাকায় সচল অর্থনীতি গড়া। এর জন্য প্রয়োজন হবে প্রথমত- উদ্যোক্তাদের জন্য প্রয়োগধর্মী প্রশিক্ষণ যেখানে গুণগত উপাদানগুলো সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে। ধরা যাক বর্তমানে সরকারী ৪৭টি ও বেসরকারী ১০৫টি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ব্যবসায় প্রশাসন কোর্সে উদ্যোক্তা উন্নয়ন কোর্স পড়ানো হয় এই উদ্দেশ্যে যে, শিক্ষা কার্যক্রম সমাপনান্তে যারা উদ্যোক্তা হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে আগ্রহী এবং তারা যেন এই বিষয়ে একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিবছর বিবিএ ও এমবিএ গ্র্যাজুয়েট অর্জনকারীগণের খুবই কমসংখ্যক স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের আওতায় স্বাধীন চেতনা উদ্যোক্তার খাতায় নাম লেখাচ্ছে এবং বাকিরা চাকরির জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছে যেখানে সুযোগ ক্রমাগতই সীমিত হয়ে পড়ছে বিধায় বেকারত্বই তাদের মূল পরিচয়ের বাহক। আবার যে সংখ্যক উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী তাদের যদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করা যায় তবে বর্তমানে যে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহী নয় তা অনেকাংশে ঘোচাবে বলে প্রতীয়মান।

তবে প্রশ্ন এই ধরনের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে আছে কী? সেই জায়গাটিতেও কিছু সমস্যা রয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন কেন্দ্র (বিএমডিসি), ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইবিএম) এই ধরনের প্রশিক্ষণে পারদর্শী। কিন্তু এই সকল প্রশিক্ষণে উচিত মাঠপর্যায়ের কেস গুলোকে বেশি করে উপস্থাপিত করা যাতে বাস্তবভিত্তিক ধারণাগুলো মটিভেশনের বা প্রেরণার উৎস হতে পারে; দ্বিতীয়ত- দীর্ঘদিন ধরে দেশের ‘ব্যাংকিং’ খাতে অব্যবস্থাপনা চলছে কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নেয়ায় ঋণখেলাপি বাড়ছে, তৃতীয়ত- প্রশিক্ষণ ব্যাংকারদের মানবিক গুণাবলী পরিবর্তনের হাতিয়ার এর সফল উদাহরণ রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যার সফল বাস্তবায়ন এ দেশে হতে পারে কিন্তু তার সঙ্গে নৈতিকতার বিষয়টিকে যদি ধরা হয় সে ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ কতটুকু ভূমিকা রাখবে তা ভেবে দেখার বিষয়। তবে ব্যাংকাররা যদি মানবিক হয় তবে বিনিয়োগকারী অনায়াসেই বিনিয়োগে আকৃষ্ট হতে পারে। এতে অলস টাকার পরিমাণ কমে আসবে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। তবে ব্যাংক কখনও সাধারণ মানুষের আয়ের উৎস হতে পারে না, ব্যাংক শুধু আর্থিক খাতের মধ্যস্থতাকারী হিসাবে কাজ করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সাধারণ মানুষের বাড়তি আয়ের জন্য দেশে আর্থিক পণ্যের যথেষ্ট ঘাতটি রয়েছে।

ব্যাংকে টাকা রেখে কেন আমানতকারীরা প্রকৃত পক্ষে কোন লাভবান হচ্ছে না কেবল স্বল্পসুদের কারণে। তাই সাধারণ মানুষের জমানো অর্থ কখনও এক জায়গায় রাখা ঠিক নয় যা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে হতে পারে যেমন সঞ্চয়পত্র ক্রয়, ব্যাংক, শেয়ারবাজার ইত্যাদি। বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে আমরা বীমার আওতায় আনতে পারিনি অথচ দেশে-বিদেশে অনেক বীমা কোম্পানি ব্যবসা করছে। তাই ব্যাংক-বীমা ব্যবসা চালু করা দরকার; চতুর্থত- বর্তমানে বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা ৬৩টি এবং ব্যাংকের শাখা ১০ হাজার ৪৬৭টি যেগুলো চালানোর জন্য সমসংখ্যক সিইও, সিফও, এইচআরও কর্মকর্তা লাগবে। কিন্তু একই সঙ্গে এত দক্ষ লোক পাওয়া দুষ্কর। তার সঙ্গে ব্যয় উর্ধমুখী ও আয় নিম্নমুখী। প্রায় সব ব্যাংকে মূলধন প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে ব্যাংক একীভূতকরণের বিষয়টি চলে আসতে পারে।

প্রকাশিত : ১ মার্চ ২০২০

০১/০৩/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: