২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এবার প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে হবে


শিক্ষা মানুষের সুপ্ত-প্রতিভা বিকাশে ও মনন-গঠনের প্রধান সহায়ক উপায়। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশের জনসংখ্যার অভিশাপকে আশীর্বাদে কিংবা জনসম্পদে পরিণত করার ক্ষেত্রে সঠিক ও কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প নেই। প্রযুক্তিগত কিংবা প্রায়োগিক দিক থেকে একটি জাতি যতই শক্তিশালী হোক না কেন যদি মানুষের যাপিত জীবনে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বের মতো সুকুমারবৃত্তির পরিপূর্ণ ও সুস্থ বিকাশ না ঘটে, তবে সেই জাতির বিনাশ অনিবার্য। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রশ্নফাঁস প্রায় নিয়মিত একটি ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গেও পরিচিত আমরা; কিন্তু প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রশ্নফঁাঁস অত্যন্ত উদ্বিগ্নের বিষয়। কারণ, এ পর্যায়েই শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের মতো বিষয়গুলোর প্রাথমিক ভিত্তি নির্মিত হয়; কিন্তু এই স্তরেই একজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষায় সহজভাবে উত্তীর্ণের উপায় হিসেবে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে যায়, তখন অর্জিত-শিক্ষা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ আর মনুষ্যত্ব থেকে সে হয় বিচ্যুত, তার পথ-চলার শুরুটাই হয় একটা মিথ্যা-ফাঁকি-মেকিত্বের মধ্য দিয়ে। সেই সঙ্গে জীবনাভিজ্ঞ অনেক অভিভাবকই তাদের সন্তানদের সবচেয়ে ভাল ফলের স্বীকৃতি প্রাপ্তিতে এতটাই উদগ্রীব হয়ে পড়েন যে অনেক সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসে বিচলিত না হয়ে, অর্জিত মূল্যবোধকে পাশ কাটিয়ে, ন্যায়-অন্যায়কে চুলোয় দিয়ে বহুমাত্রিক উপায়ে ফাঁসকৃত প্রশ্ন সংগ্রহ করে সন্তানের হাতে তুলে দিতেও দ্বিধাবোধ করেন না। এভাবেই প্রথম জীবনেই শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবার থেকেই দুর্নীতির সম্মতি পাচ্ছে, পাচ্ছে সহযোগিতাÑ ফলে অদূরভবিষ্যতে এই শিক্ষার্থীদের পক্ষে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বের পথে ফিরে আসা কতটুকু সম্ভব? যারা একদিন দেশকে নেতৃত্ব দেবে, পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেবে, তারা জীবনের শুরুতেই যে দুর্নীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠল সে পথ থেকে উত্তরণের উপায় কী? পরীক্ষায় অসাধু উপায় অবলম্বন করা নতুন কোন ইস্যু নয়Ñ দেড় যুগ আগেও পরীক্ষায় নকল করার অবাধ স্বাধীনতা এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রায় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তবে এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই ঘটনার লাগাম টানা হলেও তা রূপ পাল্টে আরও ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে। এখন পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নোত্তর চলে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের হাতে। কয়েক বছর ধরেই এসএসসি, এইচএসসি, জেএসসি ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীসহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠছে। প্রথম দিকে পরীক্ষার আগের দিন প্রেস থেকেই প্রশ্ন বাইরে চলে যেত। কয়েক সেট প্রশ্ন প্রণয়ন করে এই ঘটনা বন্ধের চেষ্টা চালানো হয়, তবে তা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি।

গত বছর শিক্ষা সচিব ঘোষণা দিয়েছিলেন এই বছর (২০১৫) থেকে প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে পরীক্ষার আগের দিন ডিজিটাল পদ্ধতিতে প্রশ্ন-প্রণয়ন ও বিতরণ করা হবে; কিন্তু তার বাস্তবায়ন ঘটেছে কি আদৌ? তবে পরীক্ষার দু’-তিন আগে প্রশ্নফাঁস রোধ করা গেলেও শেষ রক্ষা করা গেল না। এ বছর উদ্ভাবিত হয়েছে নতুন পদ্ধতি। অতীতে পরীক্ষার দু’-একদিন আগে প্রশ্নফাঁস হলেও এখন পরীক্ষা শুরুর এক-দুই ঘণ্টা আগে প্রশ্নপত্রের সিলগালাযুক্ত প্যাকেট খুলে বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে কখনও কখনও; যা প্রযুক্তির কল্যাণে ছড়িয়ে পড়ছে নিমিষেই। অতীতে একশ্রেণীর অসাধু কর্মচারী প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিল, এখন শিক্ষকরাই প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছেন। চলমান উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় বেশ ক’টি কেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটেছে। হিসাববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়নসহ কয়েকটি বিষয়ের প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক শিক্ষক হাতেনাতে ধরাও পড়েছেন। তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। কিন্তু যাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে তারাই কি প্রকৃত অপরাধী?

ট্রেজারি বা থানা থেকে প্রশ্নপত্র আনা থেকে শুরু করে পরীক্ষার হলে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত প্রশ্নপত্রের হেফাজত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার। এই সময়টুকুতে প্রশ্নপত্র থাকে তারই তত্ত্বাবধানে, তার হস্তক্ষেপ ছাড়া এ প্রশ্নপত্র বাইরে কিংবা শিক্ষকদের কাছে যাওয়া কোন প্রকারেই সম্ভবপর নয়। আর তার হেফাজতের সময় প্রশ্নফাঁস হলে তিনি তার দায় এড়াতে পারেন না। যদিও এই ঘটনার পর একজন ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্র কর্মকর্তাকে অপসারণ করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে; কিন্তু মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিচারের আওতায় আনা হলো না কেন, আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে; তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় না আনার পেছনে কি অন্য (?) কোন ঘটনা আছে? প্রশ্নফাঁসের এই ঘটনার পর সম্প্রতি ঢাকার ১৭টি কেন্দ্রকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই ঢাকার নামী-দামী কলেজ। জিপিএ ফাইভ বৃদ্ধি, পাসের হার শতভাগ নিশ্চিতকরণ কিংবা মেরিট পজিশন পেতে কিংবা ধরে রাখতে তারা কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নকে। নৈর্ব্যত্তিক প্রশ্ন দ্রুততম সময়ে সমাধান করা সহজ বলে নতুন কৌশলটি বেশ কার্যকর হচ্ছে। আবার এক প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা অন্য প্রতিষ্ঠানে হওয়ায় পারস্পরিক বোঝাপড়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ। অথচ সন্তানকে আদর্শ, নীতিবান ও চরিত্রবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বাবা-মায়ের পর শিক্ষকের ভূমিকাই সর্বাধিক। তাই প্রশ্নফাঁসের মতো গর্হিত একটি কাজে শিক্ষকদের সরাসরি সম্পৃক্ততা অত্যন্ত লজ্জাকর। শুধু তা-ই নয়, পত্রিকায় এমন খবরেরও দেখা পাওয়া যায় যেখানে কোন শিক্ষক কলেজে বসে ভেজাল পানির ব্যবসা করছেন; আবার কোন শিক্ষক গাইড বইয়ের বাণিজ্যে জড়িত। অন্যদিকে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সংবাদ তো আছেই। জাতি গড়ার শিল্পী অথবা মানুষ গড়ার কারিগরখ্যাত শিক্ষকদের মূল্যবোধের একি অবক্ষয়! এমন একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে কী শেখাবেন? তাই আমাদের মনে প্রশ্নের উদ্রেক হয়, আমরা কি শিক্ষকতার মহান পেশাকে কলুষিত করছি না?

জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’; শিক্ষকদের বেলাতেও কথাটা ঠিক। সকলেই শিক্ষক নয়, কেউ কেউ শিক্ষক। যে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মননবিকাশের ভেতর নিজের নিয়তিকে রক্তমাখা ভবিষ্যত হিসেবে প্রত্যক্ষ করতে পারেন, শিক্ষার্থীর জীবনের ভেতর শব-ই-বরাতের রাতের কোটি কোটি প্রদীপের মতো জ্বলে উঠতে পারেন, তিনিই তো শিক্ষক, তার স্মৃতিই তো ছাত্রের আমৃত্যু স্মরণযোগ্য। এভাবে প্রশ্নফাঁস হতে থাকলে জাতি পর্যবসিত হবে গভীর সঙ্কটে। শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোটি ভেঙ্গে পড়বে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হবে, মেধাবীরা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং ফাঁসকৃত প্রশ্নের আশায় তারা বই-খাতা-কলম ফেলে অনৈতিক পথে হাঁটবে কিংবা অধ্যবসায়ের পথ ছেড়ে দিয়ে শর্টকাট পথে সবচেয়ে ভাল ফলাফলের নেশায় আক্রান্ত হবে; শুধু তা-ই নয়, প্রকৃত মেধাবীদের প্রতি যেমন অবিচার করা হবে তেমনি তাদের নির্ণয় করার পথটিও রুদ্ধ হয়ে যাবে বলে আমরা আশঙ্কা করছি।

এই সঙ্কটে আশাহত হলে চলবে না। অনিবার্য ধ্বংস থেকে বাঁচতে চাইলে এই মুহূর্তে আমাদের সাবধান হতে হবে। শিক্ষা নিজেই হতে পারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের সামাজিক দায়িত্ব ও গুরুত্বের ওপর জোরারোপ করে বিভিন্ন ধরনের সেমিনার বা কর্মশালার আয়োজন করা জরুরী। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা পাকাপোক্তকরণ ও সহজভাবে সংশ্লিষ্ট বিধি এবং নিয়মনীতি বিবৃত থাকতে হবে; অবশ্যপালনীয় নীতিমালা পরিবীক্ষণের জন্য নির্দেশনা থাকতে হবে, ওই সকল নীতিমালা পালন না হলে কী ধরনের পরিণতি হবে তাও সুনির্দিষ্ট থাকতে হবে এবং পক্ষপাতহীনভাবে জবাবদিহিতার নীতিমালাগুলো প্রয়োগ করত কেউ নীতিবহির্ভূত কাজে জড়িত থাকলে কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। যে প্রযুক্তির কল্যাণে ফাঁসকৃত প্রশ্ন সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র, সেই প্রযুক্তিকেই কাজে লাগিয়ে প্রশ্নফাঁস রোধ করা সম্ভবপর। সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ থাকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরীক্ষার দেড়-দুই ঘণ্টা আগে প্রশ্ন পাঠানোর ব্যবস্থা করলে হয়ত প্রশ্নফাঁসের নতুন এই কৌশল ব্যর্থ করা যাবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে গৃহীত ‘ও লেভেল’ এবং ‘এ লেভেল’ পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। পাবলিক পরীক্ষা প্রায় দুই মাস ধরে চলতে থাকে। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এই সনাতন পদ্ধতির সময়সূচী পরিবর্তন করা অত্যাবশ্যক। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে সেরা বিশটি প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ব্যবস্থা বাতিল করাও সময়ের দাবি। কেননা কিছু প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক পজিশন নিশ্চিত করতে অনৈতিক ও অসাধু উপায় অবলম্বন করছে; যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নকলমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেও শুধু অভিনব উপায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ন্যক্কারজনক কাজের মাধ্যমে আমরা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারি না। তাই শুরু হোক পথচলাÑ নতুন পথে, নতুন উদ্যমে।