২৪ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা আশা, সাধ্য ও স্বপ্নের মিলনমেলা


‘সবার জন্য ছাপচিত্র’ সেøাগান নিয়ে ঢাকা আর্ট সেন্টারে চতুর্থবারের মতো হয়ে গেল ‘কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা ২০১৫’। ঢাকা আর্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠিত ‘কিবরিয়া ছাপচিত্র স্টুডিও’-এর আয়োজনে বছরের প্রথম দিন থেকে সপ্তম দিন পর্যন্ত হয়ে গেল কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা।

’৪৭ সালে দেশভাগের পর জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে যে কয়জন শিল্পী ঢাকায় আর্ট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন শিল্পী শফিউদ্দিন আহমেদ তাঁদের অন্যতম। বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলার জনকও সফিউদ্দিনকেই বলা হয়। মূলত শিল্পী সফিউদ্দিনের হাত ধরেই বাংলাদেশে ছাপচিত্রের চর্চা শুরু।

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৫৪ সালে শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়া নবাবপুর স্কুল ছেড়ে তৎকালীন চারুকলা ইনস্টিটিউটে যোগ দেন। ইনস্টিটিউটের ছাপচিত্র বিভাগটি সফিউদ্দিন ও কিবরিয়ার জোটবদ্ধতায় এক নতুন গতি পায়। বাংলাদেশের ছাপচিত্রকে এই দুই দিকপাল ছাপচিত্রী এক অনন্য উচ্চতায় স্থাপন করেন। যদিও পরবর্তীকালে মোহাম্মদ কিবরিয়া বিমূর্ত চিত্রকলার দিকে অধিক মনোনিবেশ করেন এবং বাংলাদেশী বিমূর্ত চিত্রকলায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন বলা যায়।

দেশের শিল্পকলা ও শিল্পীদের উৎসাহিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা আর্ট সেন্টার যাত্রা শুরু করে। শুরু থেকেই আর্ট সেন্টারের কার্যক্রম সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে দেশের শিল্পীরা তাদের কার্যক্রমের জন্য সুবিধাজনক নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম পেয়ে যান, যা আমাদের শিল্পকলার চর্চাকে দারুণভাবে উস্কে দেয়। ফলে চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, ফটোগ্রাফিসহ শিল্পকলার সকল মাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীবর্গের মিলনমেলায় পরিণত হয় ঢাকা আর্ট সেন্টার। শুরু থেকেই চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজনসহ কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করতে থাকে আর্ট সেন্টার কর্তৃপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন কিবরিয়া প্রিন্ট স্টুডিও। এ সময়ে যাঁরা ছাপচিত্রের চর্চা করছেন তাঁদের জন্য খুব ভাল একটি সুযোগ হয়ে ওঠে কিবরিয়া প্রিন্ট স্টুডিও।

২০১২ সালে শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার জন্মদিনে আর্ট সেন্টারের কিবরিয়া প্রিন্ট স্টুডিও প্রথমবারের মতো আয়োজন করে কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা। তখন এটি শিল্পী, শিল্পবোদ্ধা, সংগ্রাহকসহ সর্বমহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। দেশের প্রায় সকল চারুকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাপচিত্র বিভাগ এতে অংশ নেয়। এছাড়াও যাঁরা ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিকভাবে প্রিন্ট স্টুডিও স্থাপন করেছেন তাঁরাও অংশ নেন এই মেলায়। বাংলাদেশে ছাপচিত্র নিয়ে এরকম আয়োজন আগে কখনও হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যেহেতু লক্ষ্যই ছিল সকলের কাছে ছাপচিত্র পৌঁছে দেয়া, তাই কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা প্রকৃত অর্থেই একটি মেলা হয়ে ওঠে। ছবির দামও রাখা হয় একদম হাতের নাগালে। সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা। তবে ২০০ টাকায়ও ছাপচিত্র বিক্রি হতে দেখা যায় সে বছর। প্রায় সকল শ্রেণী-পেশার মানুষই আগ্রহ নিয়ে মেলাটি দেখতে আসে। কখনও ছবি কেনেনি এমন লোকও ছাপচিত্র কিনেছেন বেশ আগ্রহ নিয়ে। দেশের নবীন-প্রবীণ ছাপচিত্রীদের জন্য কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সেক্ষেত্রে বলা যায় কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা তাদের লক্ষ্যকে পুরোপুরি সার্থক করে তুলেছে।

কিবরিয়া ছাপচিত্র মেলার এটি চতুর্থ আয়োজন হলেও ঢাকা আর্ট সেন্টার তরুণ ছাপচিত্রীদের জন্য এবারই প্রথম পুরস্কার চালু করে। দেশের বিশিষ্ট শিল্প সংগ্রাহক দুর্জয় রহমান জয়ের সৌজন্যে নবীন ছাপচিত্রী পুরস্কারের প্রচলন হয়। প্রথম পুরস্কার পঞ্চাশ হাজার টাকা ও দুটি সম্মান পুরস্কার চল্লিশ হাজার টাকা করে। এবারের পুরস্কার পেয়েছেন তারেক আমিন, মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ও পলাশ বরণ বিশ্বাস। পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে শিল্পী তারেক আমিন বলেন, ‘পুরস্কার পেয়েছি খুব ভাল লাগছে। আমার কাজ স্যারদের ভাল লেগেছে বলে আমি ভীষণ আনন্দিত। আমার গুরুগণ আমাকে প্রিন্ট মেকিংয়ের তালিম দিয়েছেন। আমি চেষ্টা করেছি আমার সাধ্যমতো কাজ করে স্যারদের সম্মান বজায় রাখার। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ আমাকে প্রথম পুরস্কারে ভূষিত করেছেন, এ জন্য আমি ঢাকা আর্ট সেন্টার ও স্যারদের কাছে কৃতজ্ঞ। ভবিষ্যতে কাজের প্রতি আমার মনযোগ আরও বেড়ে যাবে বলেই আমি মনে করি।’

পুরস্কার শিল্পীদের সবসময়ই উজ্জীবিত করে। কাজের প্রতি তাঁদের আগ্রহকে আরও নিবিড় করতে সহায়তা করে এই প্রাপ্তি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ অনেক প্রতিষ্ঠানই শিল্পীদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা করেছে। এ পুরস্কারগুলোর মাধ্যমে শিল্পীদের কাজের মূল্যায়ন হচ্ছে নিঃসন্দেহে। যদিও সে সব শিল্পী মূল্যায়ন নিয়ে শিল্পী ও শিল্পবোদ্ধাদের মধ্যে নানা আলোচনা আছে। তবে আশা করি ঢাকা আর্ট সেন্টারের দেয়া পুরস্কার ছাপচিত্রীসহ সকল শিল্পীদের কাজের প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধ অনেক অনেক বাড়িয়ে তুলবে। দেশী ছাপচিত্রের মানের আরও উন্নয়ন করতে সহায়তা করবে বলেই বিশ্বাস করি।

মেলা নিয়ে বলতে গিয়ে কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলার সদস্য সচিব শিল্পী রশীদ আমিন বলেন, ‘আমরা আসলে চিন্তা করেছি দেশের শিল্পীদের উজ্জীবিত করতে একটা কিছু করব। ছাপচিত্রের যেহেতু একটি গণমুখী ভূমিকা আছে, তাই আমরা চেয়েছি ছাপচিত্রটাকে মধ্যবিত্তের কাছে পৌঁছে দিতে। এ মেলার মধ্য দিয়ে শিল্পীদের পাশাপাশি সংগ্রাহকরাও অনেক উপকৃত হবেন। এভাবে ছাপচিত্র আরও জনপ্রিয় একটি মাধ্যম হয়ে উঠবে।’

গত ১ থেকে ৭ জানুয়ারি হয়ে যাওয়া ‘কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা ২০১৫’ তে স্টলের সংখ্যা ছিল ১৫টি। এ বছর আগের তুলনায় লোক সমাগম একটু কম হয়েছে বলে মনে হয়। অনেকে বলছেন, জয়নুল মেলার মতো এতবড় আয়োজন পরপর হওয়ায় হয়ত সংগ্রাহকদের সংখ্যা একটু কম। আশা করি ভবিষ্যতে প্রচার-প্রচারণা আরেকটু বাড়ালে মেলায় লোকসমাগমের পরিমাণ আরও বাড়বে। কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা বাংলাদেশের ছাপচিত্রকে দেশীয় অঙ্গনে জনপ্রিয় করে তোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। আর এভাবেই কিবরিয়া ছাপচিত্রমেলা বাংলাদেশের শিল্পকলার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে।