১৭ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

যাত্রাশিল্পের কিংবদন্তি


যাত্রার যাত্রাপথ কোনকালেই সুগম ছিল না। বিধিনিষেধ, প্রতিবন্ধকতা ও নানা সমস্যা সঙ্কটের কারণে যাত্রাচর্চা ব্যাহত হয়েছে বার বার। কিন্তু হারিয়ে যায়নি। গণমানুষের এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে জীবনভর যারা বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন- ছুটে বেড়িয়েছেন শহর-বন্দর-গ্রামে, সমকালীন সমাজ সংস্কৃতিতে তাদের অনেকেরই স্বীকৃতি নেই। শেষ জীবনে উপেক্ষা ও বঞ্চনাই যেন হয়ে ওঠে তাদের ললাট লিখন। এ দেশের এমনই এক দুর্ভাগা কুশলী নট তুষার দাশগুপ্ত, মেধা ও প্রতিভার গুণে শতবর্ষের যাত্রা পরিক্রমায় হয়ে উঠেছেন অন্যতম এক উজ্জ্বল চরিত্র। একুশে পদকপ্রাপ্ত স্বনামধন্য অমলেন্দু বিশ্বাসের সমসাময়িক এ দেশের যাত্রার আর এক দিকপাল তিনি। একাধারে অভিনেতা,নির্দেশক, সংগঠক ও দলমালিক হিসেবে প্রায় চার দশক যাত্রাঙ্গনে ছিল তাঁর সরব পথচারণা। ১৯৮৬ সালের ৭ জানুয়ারি যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শ্বাসকষ্টজনিত রোগ তিনি পরলোকগমন করেন। দেশীয় যাত্রাভিনয়ের মান উন্নয়নে অনেক সৃজনশীল কর্মকা-ের অগ্রনায়ক তুষার দাশগুপ্তের জন্ম ১৯২৩ সালে, চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া থানার ফকিরের খিল গ্রামে। স্কুলের শেষ পরীক্ষা দিয়েই যাত্রাদলের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন কবিয়াল রমেশ শীলের ভাবশিষ্য। তাঁর যাত্রা জীবনে হাতে খড়ি ব্রিটিশ যুগের বিখ্যাত অভিনেতা চট্টগ্রামের শ্যামাচরণ বাবুর দলে, যার মৃত্যুতে দৈনিক আজাদী লিখেছিল : চট্টগ্রামের নাট্যরবি গেলা অস্তাচলে (১৯৫৯) । শ্যামাচরণের যাত্রাদলে তিনি ১৯৪৬ সাল থেকে কয়েক বছর শিক্ষানবিশ ব্যবস্থাপক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৫৫-৫৬ সালে প্রধান দল পরিচালক হিসাবে যোগ দেন সিরাজগঞ্জের বাসন্তী অপেরায়।

এই দলেই তিনি অমলেন্দু বিশ্বাসকে নায়ক ও নির্দেশক করে নিয়ে আসেন ১৯৬১ সালে। এ বছর থেকেই দল পরিচালনার পাশাপাশি তাঁর অভিনয় জীবন শুরু। যাত্রাপালায় তাঁর পছন্দ ছিল ‘ভিলেন’ বা খলনায়কের চরিত্র। এই চরিত্রে তিনি শুধু সুপ্রতিষ্ঠিতই হননি, গতানুগতিক একটি নির্দিষ্ট ছক থেকে যাত্রার ভিলেনের এক নতুন রূপায়ণ ঘটান। অহেতুক চিৎকার আর বাচনিক অভিনয়ের চাইতে আঙ্গিক অভিনয়ে তিনি অধিকতর পারদর্শিতার পরিচয় দেন। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত তাঁর অভিনয় সমৃদ্ধ পালগুলো ছিলÑ সোহ্রাব রুস্তম, জালিয়াত, লোহার জাল, গৃহলক্ষ্মী, দোষী কে, পুষ্পচন্দন, একটি পয়সা। প্রত্যেকটিতে নায়ক ছিলেন অমলেন্দু বিশ্বাস। বস্তুত, বিগত শতাব্দীর ৬০ দশকে যাত্রাপ্রিয় লাখ লাখ দর্শকের মূল আকর্ষণ ছিল মহাপরাক্রমশালী দুই অভিনেতা অমলেন্দু বিশ্বাস ও তুষার দাশগুপ্তের যুগল অভিনয়। দুই বন্ধু যখন মঞ্চে উঠতেন, তখন অবস্থা ছিল এ রকমÑ এ বলে আমায় দেখ, ও বলে আমায় দেখ।

মুক্তচিন্তা ও নিজস্ব শৈল্পিক চেতনার প্রকাশ ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে তুষার দাশগুপ্ত নিজের নামানুসারে যশোর থেকে গঠন করেন একটি প্রগতিশীল যাত্রাদল ‘তুষার অপেরা’। বাংলাদেশে এই দলই প্রথম যাত্রাপালায় আলোক সম্পাতসহ কারিগরি কলাকৌশল উপস্থাপন করা হয়।

দেশীয় পালাকার গড়ে তোলা এবং তাদের পালা মঞ্চায়নের একটি ধারাও তৈরি করে যান তিনি। যাত্রামঞ্চে আধুনিক প্রযুক্তি আমদানির পথিকৃৎ বলা হয় থাকে। অমরেন্দু বিশ্বাসের যেমন ছিল মাইকেল মধুসূদন, লেনিন, হিটলার তেমনি ছিল তুষার দাশগুপ্ত ক্লিওপেট্রা, দস্যুরানী ফুলন দেবী, বিরাজ বৌ, নিহত গোলাপ এসব উঁচু মানের পালা পরিচালনা করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। শিরিন যাত্রা ইউনিটের ব্যানারে তার পরিচালিত নিহত গোলাপ শ্রেষ্ঠ পালা হিসাবে পুরস্কৃত হয় শিল্পকলা একাডেমির দ্বিতীয় যাত্রা উৎসবে তাঁর পরিচালিত যাত্রাপালায় অভিনয় করে পর পর দুইবার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর সস্মান লাভ করেন স্ত্রী শবরী দাশগুপ্ত (ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান ২০০৮ সালের ৩ জানুয়ারি)।

১৯৮৫তে বিটিভিতে সম্প্রচারিত হয় তাঁর ক্লিওপেট্রা যাত্রাপালা। এই পালায় তিনি জুলিয়াস সীজারের চরিত্রে অভিনয় করেন। এরপর তিনি শেক্সপীয়রের ‘ওথেলো’ যাত্রামঞ্চে পরিবেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। দুর্ভাগ্য আমাদের, এই মহৎ পালা মঞ্চায়ন শুরু না হতেই তাঁর জীবনদীপ নির্বাপিত হয়।

তুষার দাশগুপ্ত ছিলেন যাত্রাশিল্পের এক ক্ষণজন্ম প্রতিভা। অভিনয় ও নির্দেশনায় আধুনিক প্রযুক্তিসহ যুগোপযোগী ধ্যান-ধারণার সুষ্ঠু সমম্বয় ঘটানোর প্রয়াসী ছিলেন তিনি। প্রচার বিমুখ এই বরেণ্য শিল্পীর আজীবন বসবাস ছিল লোকায়ত জনপদে। যাত্রাদলে ‘ভবঘুরে জীবনের’ শেষ প্রান্তে এসে খুব কষ্টে যশোরের সিটি কলেজপাড়ায় একটি বসতবাড়ি গড়ে তুলেছিলেন। এটাই ছিল তাঁর ৪০ বছরের নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা সাধনার একমাত্র ফসল এবং স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। রাজধানী কেন্দ্রিক নগর সংস্কৃতিতে তাঁর তেমন যোগাযোগ ছিল না। ফলে যথাযথ মূল্যায়নও হয়নি। কোন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও জোটেনি তাঁর ভাগ্যে। ১৯৭৯-৮০ সালে শিল্পকলা একাডেমির যাত্রা উৎসবের মাধ্যমে তিনি কিছুটা আলোচিত হয়েছিলেন। সঙ্গত কারণেই জাতীয় পর্যায়ে তাঁর একটা সম্মানজনক প্রাপ্তি আদায়ের ব্যাপারে একাডেমি কর্তৃপক্ষই উদ্যোগ নিতে পারেন। ‘মরণোত্তর স্বীকৃতি’ ও তাঁর উত্তরসূরিদের জন্য হবে আনন্দের, গর্বের। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও নতুন প্রজন্মও জানাতে পারবে যে, এদেশের যাত্রার একজন বড় মাপের অভিনেতা, এক অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়েছিল, যাঁর নাম তুষার দাশগুপ্ত।