২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মুক্তিযুদ্ধের অমর গাথা


রহমান শোয়েব

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে এক সংগ্রামী ইতিহাস। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহীদ হয়েছেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন। যার মধ্যে একজন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত।

সংগ্রাম পরিষদ গঠন : একাত্তরের উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষিত হওয়ার পর পরই সারাদেশের মানুষ একটি স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও আন্দোলনের জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত হতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পরদিন ৮ মার্চ থেকেই চবিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির শুরু হয়। ওই দিন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের কক্ষে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। চবির প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য ড. এআর মল্লিকের সভাপতিত্বে ওই সভায় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা পোষণ করে গঠন করা হয় ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ’। পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় গণিত বিভাগের অধ্যাপক ফজলী হোসেন ও বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মাহবুব তালুকদারকে। সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ওই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারীরা।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্ততি : ১০ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদের (চাকসু) ভিপি মোহাম্মদ ইবরাহিম ও সাধারণ সম্পাদক আবদুর রব সশস্ত্র বহিনীর বাঙালী কর্মকর্তা ও সদস্যদের কোন অবস্থাতেই তাদের অস্ত্র জমা না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে এক বিবৃতি প্রদান করেন। ১২ মার্চ বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীদের নিয়ে অধ্যাপক আবুল ফজলের বাসায় গঠন করা হয় ‘শিল্পী-সাহিত্যিক সংস্কৃতিসেবী প্রতিরোধ সংঘ’ নামে একটি সংগঠন। এরপর চট্টগ্রামের লালদীঘির মাঠে ১৫ মার্চ আয়োজন করা হয় এক গণসমাবেশের। ওই সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল ফজল। ১৭ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক শামসুল আলমের বাসায় এক গোপন বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান কায়সার, আবু জাফর, ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন হারুন আহমেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ ও ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। বৈঠকে পাকিস্তানী বাহিনীর সম্ভাব্য আক্রমণ সম্পর্কে আলোচনা হয়। ২৪ মার্চ চবির প্রাক্তন ছাত্র সমিতির আয়োজনে প্যারেড মাঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থনে গণসঙ্গীত ও নাট্যাভিনয়ের আয়োজন করা হয়। ওইদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এআর মল্লিকের নেতৃত্বে একটি মিছিল মুসলিম ইনস্টিটিউট থেকে লালদীঘি মাঠে এসে শেষ হয়। এ সময় কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের চট্টগ্রাম কেন্দ্রের আবদুল হাই, পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শামসুল হক, এখলাস উদ্দিন আহমদ ও মিছবাহ উদ্দিন আহমেদের উদ্যোগে এবং উপাচার্য এআর মল্লিকের সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ে মলোটভ ককটেল প্রস্তুতের পরিকল্পনা করা হয়। পরবর্তীতে কারিগরি সমস্যার কারণে এ পরিকল্পনা স্থগিত হয়। এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের জন্য ছাত্র-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রদান চলতে থাকে। এজন্য ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ইনামুল হক সশস্ত্র প্রশিক্ষণের জন্য ছাত্র বাছাই ও ডামি রাইফেলগুলো সচলের উদ্যেগ গ্রহণ করেন। অল্প কিছুদিন ছাত্রদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়।

চবির ১৫ শহীদ : ’৭১-এর মহান মুক্তিযদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জন শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে একজন পেয়েছেন বীরপ্রতীক খেতাব। ১৫ শহীদ হলেনÑ মো. হোসেন বীরপ্রতীক (চেইনম্যান, প্রকৌশল দফতর), অবনীমোহন দত্ত (শিক্ষক, দর্শন বিভাগ), আবদুর রব (ছাত্র, ইতিহাস বিভাগ ও চাকসুর সাধারণ সম্পাদক), বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ফরহাদ উদ-দৌলা, মনিরুল ইসলাম খোকা, মো. হোসেন, মোস্তফা কামাল, অর্থনীতি বিভাগের আবদুল মান্নান ও নাজিম উদ্দিন খান, ইংরেজী বিভাগের আশুতোষ চক্রবর্তী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের আবুল মনসুর, প্রকৌশল দফতরের সাব-এ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার প্রভাষ কুমার সাহা, প্রহরী সৈয়দ আহমদ ও শিক্ষার্থী খোন্দকার এহসানুল হক আনসারী।