সীমাহীন সম্ভাবনা থাকার পরও আফসোস সঙ্গী করে এবারের নারী এশিয়ান কাপে মিশন শেষ করতে হয়েছে ঋতুপর্ণা-মনিকা-মারিয়াদের
ধরুন ২০২৪ সালের অক্টোবরে কাঠমান্ডুর ওই হোটেলে পিটার বাটলারের কথামতো মাসুরা পারভীন মাথা থেকে টুপিটা খুলে ফেলতেন। ধরুন, এরপর আর কোচের সঙ্গে সিনিয়রদের কোনো ইগোর লড়াই হতোই না। ধরুন, সিনিয়রদের মধ্যে দলে জায়গা হারানোর আতঙ্ক বসিয়ে দিতেন না বাটলার। ধরুন, বাটলার শুরুর দিকেই মারিয়া মান্দাকে সাইড লাইনে বসিয়ে না দেওয়ায়, ট্রমার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো না প্রতিভাবান এই মিডফিল্ডারকে। ধরুন, সাবিনা খাতুনেরা কখনই বিদ্রোহ করতেন না কোচের বিরুদ্ধে। তাহলে হয়তো এই বাংলাদেশ দল কে জানে এশিয়ান কাপের কোয়ার্টার ফাইনালেও যেতে পারতো।
কিন্তু ওপরের সব ঘটনাই ঘটে গেছে। এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশ নারী দল ফিরছে সামান্য কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে। প্রথমে চীনের সঙ্গে দুর্দান্ত খেলে ২ গোলে হার। এরপর উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ৪৫+ মিনিট দুর্দান্ত খেলে পরের হাফে গুলিয়ে ফেলে ৫ গোলে হার। শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের সঙ্গে শুরুতেই গোল খেয়ে এলোমেলো। অতঃপর ৪ গোলে হার। সব মিলিয়ে ১১ গোল হজম বাংলাদেশের। আমার অনুমানের চেয়ে একটু কম গোলই খেয়েছেন ঋতুপর্ণারা। সাদা চোখে দেখলে চীনের কাছে ০-২ গোলে হেরেছে র্যাংকিং ও অভিজ্ঞতার পার্থক্যে। চীনের র্যাংকিং যেখানে ১৭, বাংলাদেশের সেখানে ১১২। ৯ বারের চ্যাম্পিয়ন চীনের বিপক্ষে এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম এশিয়ান কাপ ম্যাচ।
এই দলের কি সম্ভাবনা ছিল, কি হতে পারত এবং কেন এমন রেজাল্ট হয়েছে সেটা একটু বলি। গত বছর জুলাই মাসে বাংলাদেশ নিশ্চিত করে তারা অস্ট্রেলিয়ায় চূড়ান্ত পর্বে খেলবে। এরপর কেটে গেছে ৭ মাস। এই ৭ মাসে সিনিয়রদের কৌশলে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। আর জুনিয়র যারা চীন, কোরিয়া, উজবেকদের সঙ্গে ফিটনেস, অভিজ্ঞতা, শারীরিক উচ্চতায় যোজন যোজন পিছিয়ে তাদের নিয়ে দল গড়ে অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া হলো। মাঝখানে শুধু নভেম্বরে মালয়েশিয়া ও আজারবাইজানের সঙ্গে ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টে খেলা।
দেশের বাইরে ক্যাম্প করার কথা বলে চট্টগ্রাম ইপিজেডে কাজ সারা। থাইল্যান্ডে যাওয়ার কথা বলে সরাসরি অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়া। আর কোনো প্রস্তুতি ম্যাচই নেই! এবার আসি অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার আগে তড়িঘড়ি করে নারী লিগ শেষ করা। এই লিগে জাতীয় দলের সব ফুটবলার খেলেছেন। কিন্তু খেলতে গিয়ে বেশির ভাগই ইনজুরিতে পড়েছেন। এবং শতভাগ ফিট নয়- এমন অভিজ্ঞ ও কি প্লেয়ারদের ওপরই ভরসা করতে হয়েছে কোচের।
যতদূর জেনেছি মেয়েদের বেশির ভাগেরই ইনজুরি ছিল। চলুন জেনে নিই কার কেমন ইনজুরি ছিল। গোলরক্ষক রুপনা চাকমার ট্রাপিজিয়াস মাসল পেইন। ডান সাইডে কাঁধের নিচের দিকে ব্যথা। লো ব্যাক পেন। কোমর ব্যথা। অ্যাঙ্কেল স্প্রেইন। (কাঁধে টেপিং ও কোমরে টেপিং নিজে করা সম্ভব না রুপনার। দলে একজন ডাক্তার গেছেন বাট উনি টেপিং জানেন না)। দলের সঙ্গে কোনো ফিজিও নেই। যেনতেন করে একজন পুরুষকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে! অথচ লিগে খেলার সময় রুপনার প্রতিদিন ৬টা টেপ লেগেছে। অতঃপর উচ্চতার দোহাই দিয়ে রুপনার বদলে মিলির অভিষেক। অবশ্য মিলি দুর্দান্ত খেলেছে এবার। তাকে নিয়ে তাই কোনো প্রশ্ন নেই। এবার আসি ঋতুপর্ণা চাকমার প্রসঙ্গে।
ওর কাফ মাসল ক্রাম্পিং। বোথ অ্যাঙ্কেল জয়েন্ট স্প্রেইন গ্রেড-টু। আরেকজন ডিফেন্ডার আফঈদা খন্দকার। ওর- বোথ অ্যাঙ্কেল জয়েন্ট স্প্রেইন গ্রেড-টু। আরেক ডিফেন্ডার শিউলি আজিম। ওর-লিগামেন্ট ইনজুরি। নি পেইন। শামসুন্নাহার সিনিয়রের দুই কাফে ক্লাউডিকেশন। মাঝমাঠের মধ্যমণি মনিকা চাকমার অ্যাঙ্কেল স্প্রেইন। শিন বোন পেন আছে। আরেকজন মারিয়া মান্দার অ্যাঙ্কেল ইনজুরি। লিগামেন্ট ইনজুরি। শামসুন্নাহার জুনিয়রের নি পেইন। স্বপ্নার কোমরে ক্রনিক কোমর ব্যাথা।
তহুরার কোমর ও নি পেইন। প্রীতির সারভাইকাল লোডোটিক কারভেচার ডিক্রিস ইন সারভাইকাল জয়েন্ট। আলপি আক্তার অ্যাঙ্কেল স্প্রেইন। উন্নতির হাঁটুর ইনজুরি। শাহেদা আক্তার রিপার রিস্ট ইনজুরি ও কাফ মাসলে শর্টনেস অব কাফ কোমরে আপার ব্যাক পেন। স্বর্ণা রানী ম-লের অ্যাঙ্কেল ইনজুরি। কোমরে ব্যথা। টেপিং করে নিয়মিত। এই হচ্ছে আমাদের ফুটবলারদের অবস্থা। এরপর একদিনে মেয়েদের ৫টা করে লিগ ম্যাচ হয়েছে। লিগ শেষ করা হয়েছে তড়িঘড়ি করে। ২৯ ডিসেম্বর শুরু করে ১৩ ফেব্রুয়ারি শেষ করা হয়েছে। লিগটা আরও সময় নিয়ে করা যেত। এই তড়িঘড়ির প্রভাবে মেয়েরা ফিটনেস রিকভারির সময় পাইনি। প্রস্তুতিও হলো কোথায়?
এর সঙ্গে ছিল মেয়েদের নিয়ে মোবাইল কোম্পানির এন্তার শূটিং। দিনভর শূটিং। লিগের মাঝখানে শূটিং। ঢাকা স্টেডিয়ামে দিনমান শূটিং। মেয়েদের মুখ শুকিয়ে পাংশুবর্ণ। ফ্যাকাসে। চেহারার দিকে তাকানো যেত না। তবুও রাতে ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে শূটিং শেষ করা হয়েছে। যাক এসব কথা। সবাই বলবে বাংলাদেশ র্যাঙ্কিং অনুসারে খুব ভালো খেলেছে। কিন্তু আমি বলব বাংলাদেশের আরও ভালো খেলার সামর্থ্য ছিল। আছে। এই দলে থাকতে পারত মাসুরা, সাবিনা, কৃষ্ণা, মাতসুসিমা সুমাইয়াÑতবেই দলটা হতো ব্যালান্সড।
উজবেক ফরোয়ার্ডদের সামনে কোহাতি কিসকু আর আফঈদাকে কতটা অসহায় লেগেছে সেটা যারা খেলা দেখেছেন তারা একমত হবেন। আফসোস আছে ঋতুপর্ণার দুটো গোলের জন্য! চীন আর উজবেকদের বিপক্ষে দারুণ সুযোগ পেয়েও গোল হয়নি। সে গোল দুটো ডিজার্ভ করে। এই দল কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারলে বাংলাদেশের নারী ?ফুটবলের গল্পটা অন্যরকমভাবেও লেখা হতো। দিন শেষে একটু আফসোস তো থাকেই! এবার আসুন সংক্ষেপে চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক এশিয়ান কাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে।
মনোসংযোগের অভাব ॥ চীনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ৪৪ মিনিট পর্যন্ত দারুণ লড়াই করে গোলশূন্য রাখতে পেরেছিল, কিন্তু প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে মাত্র ৩ মিনিটের ব্যবধানে ২টি গোল হজম করে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায়। আক্রমণের সুযোগ নষ্ট: ঋতুপর্ণা চাকমার ৩০ গজ দূর থেকে নেওয়া একটি দুর্দান্ত লব চীনের গোলরক্ষক কোনোমতে রক্ষা করেন, যা গোল হলে ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারত।
শারীরিক শক্তি ও ফিটনেস ॥ উত্তর কোরিয়ার কাছে ০-৫ গোলে হার। উত্তর কোরিয়ার খেলোয়াড়দের শারীরিক গঠন এবং ফিটনেসের কাছে বাংলাদেশ একেবারেই অসহায় ছিল। তীব্র গরমের মধ্যে তাদের উচ্চ গতির ফুটবলের সঙ্গে বাংলাদেশ তাল মেলাতে পারেনি।
প্যানেল হু








