রাজধানীর লালমাটিয়ার ‘কলাকেন্দ্র’ গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই মনে হবে, এক অদ্ভুত জাদুকরী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন দর্শক। তবে এ আয়নায় নিজের অবয়ব নয়, বরং ভেসে উঠছে চেনা-অচেনা হাজারো মানুষের ভিড়। গ্যালারিজুড়ে সারি সারি মুখ। কোনোটি পথের ধারের সেই শীর্ণকায় ভিক্ষুকটির মতো, কোনোটিতে যেন ফুটে উঠেছে পাড়ার পরিচিত তরকারিওয়ালা রমিজ চাচার ক্লান্ত হাসি। কখনো বা ছাইওয়ালী জরিনা খালা কিংবা নেশাগ্রস্ত মন্টুর সেই নির্লিপ্ত চাহনিও উঁকি দিচ্ছে রেখার আড়াল থেকে।

শিল্পী ফারজানা আহমেদ উর্মির একক চিত্র প্রদর্শনী ‘আত্ম-অনুপস্থিতির সাক্ষ্য’ আসলে কেবল কিছু পোর্ট্রেটের সমাহার নয়; বরং এটি আমাদের সমাজের এক গভীর আখ্যান। শিল্পী তাঁর নিপুণ তুলিতে এই সাধারণ মুখগুলোকে তুলে এনেছেন চিরায়ত এক মহিমায়।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া ৯৭টি কাজের পরতে পরতে মিশে আছে সৃষ্টির এক অনন্য উন্মাদনা। শিল্পীর তুলি এখানে ধীরস্থির নয়, বরং ‘রাফ লাইন’ বা খসখসে রেখায় দ্রুততার সাথে আঁকা। কোথাও অবয়ব স্পষ্ট, কোথাও বা আধাবিমূর্ত। রঙের ব্যবহার এখানে সচেতনভাবেই মলিন রাখা হয়েছে, যা যাপিত জীবনের রুক্ষতাকেই ফুটিয়ে তোলে। বিমূর্ততার কুয়াশায় ঢাকা অনেকগুলো মুখাবয়ব স্পষ্ট না হলেও, দর্শক যখন তার সামনে দাঁড়ান, অচিরেই অনুমান করে নিতে পারেন—কেমন ছিল সেই মানুষটির জীবনবোধ। অফসেট কাগজে মিশ্র মাধ্যমের এই কাজগুলো কোনোটি ফ্রেমে বন্দি, আবার বেশির ভাগই বাঁধনহীনভাবে দেয়ালে সাঁটানো। যেন ফ্রেমের সীমানা ডিঙিয়ে কথা বলতে চাইছে এই চরিত্রগুলো।
উর্মি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ থেকে ছাপচিত্রে উচ্চতর শিক্ষা নিলেও তাঁর দীর্ঘ শিল্পযাত্রায় তৈরি করেছেন নিজস্ব এক শিল্পভাষা। গত ১০ বছরের নিরলস পরিশ্রমে আঁকা এই মুখগুলো কেবল ব্যক্তিগত পোর্ট্রেট নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁক পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী।
নির্বাচনের প্রাক্কালে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী যেন বর্তমান আর অতীতকে এক সুতোয় গেঁথেছে। শিল্পী নিজে একাত্তরের ভয়াবহতা শুনেছেন, নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন দেখেছেন স্বচক্ষে। এরপর পার হয়েছে দীর্ঘ সতেরো বছরের এক বিশেষ সময়কাল, আবার গত আঠারো মাসের অন্য এক প্রেক্ষাপট। সময় বদলেছে, বদলেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের ঘড়ি—কিন্তু সাধারণ মানুষের এই আদি ও অকৃত্রিম মুখগুলোর কি খুব পরিবর্তন হয়েছে? উর্মির ছবিগুলো যেন এই প্রশ্নই ছুঁড়ে দেয় দর্শকমননে।
প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন প্রখ্যাত শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান। তাঁর মতে, “শিল্পী এখানে তাঁর নিজস্ব আবেগ ও মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকে বিষয়ের ওপর প্রক্ষেপণ করেছেন। পাটাতন ও উপকরণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে শারীরিক ও মানসিক মিথস্ক্রিয়া ঘটে, তা-ই উর্মির চিত্রকলা।” কোলাজ এবং রঙের সংমিশ্রণে এই কাজগুলো এখন আর কেবল ছবি নেই, হয়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত সামাজিক ও ঐতিহাসিক দলিলের অংশ।
কলাকেন্দ্রের দেয়ালজুড়ে এখন সময়ের দীর্ঘশ্বাস আর আগামীর স্বপ্ন। শিল্পী ফারজানা আহমেদ উর্মির এই সৃজনশীল মহাযজ্ঞ চলবে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিল্পপ্রেমীরা খুঁজে নিতে পারেন নিজেদের হারিয়ে ফেলা কোনো পরিচিত মুখকে। উর্মির এই ‘আত্ম-অনুপস্থিতির সাক্ষ্য’ কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, এটি নাগরিক কোলাহলের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজের শিকড়কে চিনে নেওয়ার এক শৈল্পিক আমন্ত্রণ।








