ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

গল্প ॥ সব দরজা একসঙ্গে খোলে না

ইজাজ আহ্মেদ মিলন

প্রকাশিত: ২১:৪৬, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গল্প ॥ সব দরজা একসঙ্গে খোলে না

দরজাটা বন্ধ ছিল

দরজাটা বন্ধ ছিল। বাইরে ঝুলছিল বড় একটা তালা। এতে কারো মনেই আতঙ্ক জাগেনি। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণও নেই। 
সকাল তখন পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কোলাহল নেই। নিস্তবদ্ধ পুরো এলাকা। পাড়ার ওপর হালকা কুয়াশা ঝুলে আছে। লাবনী চৌধুরী বাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয়বার কড়া নাড়ে। দোতলা বাড়ির নিচতলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন কাওসার চৌধুরী। দোতলা থেকে নিচে নেমে এসে বাবার ঘরের সামনে দাঁড়ায় লাবনী। দরজায় আটকানো তালা নাড়তে থাকে। ভেতর থেকে কোনো শব্দ এল না। অস্বাভাবিক কিছু যেনো ধীরে ধীরে বাতাসে ঘন হতে লাগল। রাতের খাবার খেয়ে দোতলায় গিয়ে ঘুমায় লাবনী আর নিচে তার বাবা মা। 
নরম স্বরে লাবনী ডাকতে থাকে-
আম্মু, আম্মু। আব্বু ও আব্বু.... 
কোনো সাড়া নেই। প্রতিবেশীরা এলেন। তালা ভাঙা হলো। ঘর খুলতেই সময় যেনো থেমে গেল।
মেঝেতে কাওসার চৌধুরী পড়ে আছেন। রক্তে ভেজা শরীরের জামা কাপড় শুকিয়ে গেছে। মেঝেতে পড়ে থাকা রক্ত জমাট। তার পাশেই পড়ে আছেন ফাতেমা বেগম। হাত পা বাঁধা। চোখ খোলা অথচ শব্দহীন, যেনো ভয় তাকে পাথর বানিয়ে রেখেছে। ঘরের বাতাস ভারী, অচল। কেউ প্রথমে কিছু বুঝতে পারে না; তারপর হঠাৎ সবকিছু একসাথে ভেঙে পড়ে। পাড়ার সকাল সেই মুহূর্তে আর সকাল থাকল না। 
কাওসার চৌধুরী ছিলেন হিসেবি মানুষ। স্বর্ণের ব্যবসা করতেন, কিন্তু জীবন ছিল সাদামাটা। তার দোকানের সাইনবোর্ড ঝকঝকে, অথচ ব্যক্তিগত জীবন নিরীহ, প্রায় নিস্তরঙ্গ। প্রকাশ্য শত্রুতা কারও সঙ্গে ছিল না, অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হতো।
ঘরের ভেতর বীভৎস দৃশ্য। পুলিশ এলো দ্রুত। নোটবুক খুলল। প্রশ্ন উঠল। উত্তর এলো না। হাত পায়ের বাঁধন খুলে ফাতেমা বেগমকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ডাক্তার বললেন-তীব্র মানসিক অভিঘাত। তিনি সব দেখেছেন, কিন্তু ভাষা যেনো তার গলা ছেড়ে পালিয়েছে। পাগলের মতো এদিক ওদিক ছোটছুটি করতে থাকে লাবনী। একটা অদ্ভুত অবিশ্বাস তাকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। 
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে কাওসার চৌধুরীর বাড়ির উত্তর পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায় আদনান মাসুদ। মাঝে মধ্যেই আদনান এ রাস্তায় যাওয়া আসা করতো। ওই রাতে যাওয়াটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।
আদনান পাড়ার ভাষায় ভবঘুরে। স্থায়ী চাকরি নেই। কখনো কোচিং সেন্টারে নোট বানায়, কখনো বইয়ের স্টল বসায়, আবার কখনো দিনভর অকারণে হাঁটে। তার চোখে সবসময় এক ধরনের দূরের দৃষ্টি যেনো সে এই শহরে থেকেও পুরোপুরি এখানে নেই। আর লাবনী- তার কাছে ছিল অপ্রাপ্য আলো। আদনান তাকাতো। লাবনী তাকাতো না।
তদন্ত খুব দ্রুত দিক পেয়ে গেলো অথবা দিক বানিয়ে নিল। একজন প্রতিবেশী বলল, রাতে ওকে দেখেছি। আরেকজন বলল, ছেলেটা ঠিক না। প্রমাণের চেয়ে সন্দেহের শব্দ বেশি জোরে ছড়ায়। আদনানকে গ্রেপ্তার করা হয় এক বিকেলে, যখন সে পুরোনো বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিল।
: আমি কী করেছি ? 
পুলিশের চোখে আদনানের সেই প্রশ্নের দাম ছিল না। থানার ঘরটা স্যাঁতসেঁতে। আদনান প্রথম রাতেই বুঝে যায়- সত্য এখানে ধীরে হাঁটে, অভিযোগ দৌড়ায়।
: তুমি ওখানে গিয়েছিলে?
: রাস্তা দিয়ে গেছি।
: কেন?
: আমি প্রায়ই যাই।
প্রশ্নের বৃত্ত ছোট হতে থাকে। উত্তরগুলো ক্রমে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। পর দিন খবরের কাগজে ছাপায় হয়‘প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের প্রতিশোধ?’ প্রথমবার লাবনীর নাম শুনে মাথা তুলে তাকায়। তার বুকের ভেতর কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। আদালত কক্ষে প্রথম দিন লাবনী দেখে আদনানকে।
ছেলেটা শুকিয়ে গেছে। চোখে ঘুম নেই। তবু সেখানে কোনো রাগ নেই তাড়া নেই অভিমান নেই-এই বিষয়টা লাবনীকে অদ্ভুতভাবে অস্থির করে তোলে। নিজেকে বোঝায় লাবনী-সহানুভূতি দেখানো যাবে না। কিন্তু মানুষের ভেতরের অনুভূতি আদালতের বিধি মানে না। মামলা এগোয়। সাক্ষ্য আসে। যুক্তি আসে। ফাঁকও আসে-কিন্তু ফাঁকের চেয়ে আবেগ বেশি জোরে বাজে। বিচারক শেষ দিন রায় পড়েন শান্ত কণ্ঠে।
‘মৃত্যুদ-’।
এক মুহূর্তের জন্য পুরো কক্ষ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। রায় শুনে আদনান চোখ বন্ধ করে মৃত্যুকে স্পষ্ট কল্পনা করে। কারাগারের দিনগুলো মানুষকে ভেঙে দেয় অথবা অন্য কিছু বানিয়ে ফেলে। আদনান কয়েক মাস কথা বলত না। তারপর একদিন জেল লাইব্রেরিতে বসে আবার বই খুলে পড়তে থাকে আদনান। মৃত্যুর অপেক্ষার মধ্যেই অদ্ভূতভাবে সে বাঁচতে শু থাকে। তার আইনজীবী আপিল করলেন উচ্চ আদালতে। ফাতেমা বেগম ধীরে ধীরে ভাষা ফিরে পাচ্ছিলেন। কিন্তু তার স্মৃতি ছিল ভাঙা আয়নার মতো। এক দুপুরে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন - ‘ও না’। সবাই ঝুঁকে এল। ‘যে এসেছিল তার গলায় দাগ ছিল। মাথার চুল কুকড়া।’
মুহূর্তের মধ্যে ঘর নিঃশব্দ হয়ে যায়। আদনানের গলায় কোনো দাগ নেই। মাথার চুলও সোজা। উচ্চ আদালতের শুনানি নতুন মোড় নেয়। মোবাইল লোকেশন মেলে না। ব্যবসায়িক বিরোধের ফাইল খুলে যায়। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়- প্রথম তদন্ত ছিল তাড়াহুড়োর, অসম্পূর্ণ, প্রায় অন্ধ। শেষ দিন বিচারপতি বলেন-‘ সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেওয়া হলো।’
আদনান মুক্ত হয়। কিন্তু জেলের গেট পেরিয়েও সে বুঝলো সব দরজা একসাথে খোলে না। পাড়ায় ফিরে সে দেখে- চোখগুলো বদলায়নি। আইন তাকে মুক্তি দিয়েছে। মানুষ দেয়নি। আদনান আর লাবনীর সামনে পড়তে চায় না। কিন্তু একদিন বিকেলে লাবনী নিজেই তার সামনে এসে দাঁড়ায়। অনেকক্ষণ কেউ কথা বলে না। তারপর-
: তুমি কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে? প্রশ্নটা অভিযোগের মতো শোনায় না। বরং ক্লান্ত কৌতূহলের মতো।
আদনান ধীরে বলে- 
: হ্যাঁ। কিন্তু আমি তোমার বাবার কোনো ক্ষতি চাইনি।
লাবনী দীর্ঘ সময় তার দিকে তাকিয়ে থাকে। সে প্রথমবার সন্দেহের বাইরে একজন মানুষকে দেখতে চেষ্টা করে। তাদের সম্পর্ক শুরু হয় না প্রেম দিয়ে। শুরু হয় নীরব কথোপকথন দিয়ে। লাবনী জানতে চায়-কারাগারের রাতগুলো কেমন ছিল। আদনান জানতে চায়- হঠাৎ বাবা হারালে ভেতরে কী ভাঙে।
ধীরে ধীরে তারা আবিষ্কার করে-দুজনই একই ঘটনার ভিন্ন প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন হারিয়েছে রক্তের মানুষ। অন্যজন হারিয়েছে সময়, সম্মান, ভবিষ্যৎ।
বছর দুয়েক পরে যখন তাদের বিয়ের খবর ছড়ায়, পাড়া স্তব্ধ হয়ে যায়। কেউ বিশ্বাস করে না। কেউ মেনে নেয় না। কিন্তু সত্যিটা সহজ ছিল না,সরলও না। লাবনী এক রাতে বলেছিল- ‘আমি তোমাকে একসময় ঘৃণা করতাম।’
আদনান মৃদু হেসে বলে -‘আমি নিজেকেও করতাম।’ সেই হাসির ভেতর দীর্ঘ অন্ধকার পেরিয়ে আসার ক্লান্ত আলো ছিল। অনেক পরে প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ে-ব্যবসায়িক লোভের জটিল চক্র উন্মোচিত হয়। খবরের কাগজে ছোট কলাম ছাপে। পাড়া কয়েকদিন চুপ থাকে।
তারপর জীবন আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়-যেন কিছুই ঘটেনি। সন্ধ্যা নেমেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে লাবনী আকাশ দেখছে। ভেতরে আদনান বই পড়ছে, অভ্যাসটা সে জেল থেকে নিয়ে এসেছে। 
লাবনী ধীরে বলে- ‘আমরা কি সত্যিই বেঁচে ফিরলাম?’ আদনান তাকায়। তার চোখে এখন আর সেই পুরানো অস্থিরতা নেই। সে বলে : আমরা এখনো চেষ্টা করছি। বাতাস নড়ে ওঠে। কোথাও কোনো দরজা শব্দ না করে খুলে যায়।

প্যানেল হু

×