ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

দেশে আক্রান্ত প্রায় ৪ কোটি মানুষ

নীরব মহামারিতে রূপ নিচ্ছে কিডনি রোগ

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ২৩:২৮, ৭ মার্চ ২০২৬

নীরব মহামারিতে রূপ নিচ্ছে কিডনি রোগ

বাংলাদেশে নীরবে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে কিডনি রোগ

বাংলাদেশে নীরবে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে কিডনি রোগ। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ রোগ দ্রুত বাড়ছে। চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় অনেক রোগীই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে কিডনি রোগ দেশের জন্য বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার বিশ্ব কিডনি দিবস- ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। দেশের শীর্ষস্থানীয় কিডনি বিষয়ক বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কিডনি এওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। বক্তারা কিডনি রোগ প্রতিরোধে সরকারি, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাম্পসের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী কিডনি রোগ বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত, যা ডায়াবেটিস রোগীর প্রায় দ্বিগুণ এবং ক্যান্সার রোগীর তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি। ১৯৯০ সালে মৃত্যুর কারণ হিসেবে কিডনি রোগের অবস্থান ছিল ১৯তম, যা বর্তমানে ৭ম স্থানে উঠে এসেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে এটি মৃত্যুর ৫ম প্রধান কারণ হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশেও কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে এবং প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ কোনো না কোনো কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার রোগী ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এছাড়া আরও ২৪ থেকে ৩০ হাজার রোগীর আকস্মিক কিডনি বিকল হয়ে সাময়িক ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়। শহর ও গ্রামাঞ্চল উভয় জায়গাতেই কিডনি রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার, জন্মগত বা বংশগত সমস্যা, মূত্রতন্ত্রের সংক্রমণ ও পাথর কিডনি রোগের প্রধান কারণ। ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের বছরে অন্তত দুইবার প্রস্রাব পরীক্ষা ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন তিনি। তার মতে, প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনও কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাপপ্রবাহ, পানিশূন্যতা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, দূষণ এবং সংক্রমণ কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে তীব্র গরমে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে আকস্মিক কিডনি বিকলের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই অতিরিক্ত গরমে ‘রেস্ট, শেড ও হাইড্রেট’ এই তিনটি বিষয় মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ বলেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না আনলে কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, অসচেতনতার কারণে অনেকেই ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা করান না। অথচ প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে রোগ ধরা পড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কিন্তু পরবর্তী ধাপে গেলে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তিনি কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে কিডনি পরীক্ষা ও রেফারাল ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটির কাছাকাছি। ডায়ালাইসিস সুবিধার প্রায় ৬৫ শতাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক। তিনি জানান, সরকার জেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব জোবায়দা বেগম, দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক হাসান হাফিজ, অধ্যাপক ডা. আফরোজা বেগম, অধ্যাপক ডা. সৈয়দ জাকির হোসেন, সহকারী অধ্যাপক ডা. ফারহা হাসান চৌধুরী, খোন্দকার মোস্তান হোসেন, অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক, অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুর রহমান, মিজানুর রহমান পিন্টু, আলমগীর কবির, মোকারম হোসেন ও ড. মোহাম্মদ একরামুল ইসলামসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
ক্যাম্পসের নির্বাহী পরিচালক রেজওয়ান সালেহীন বলেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, কিডনি রোগ জীবননাশা তাই প্রতিরোধই বাঁচার আশা।
গোলটেবিল বৈঠকে সরকারি নীতিনির্ধারক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, শিল্পী ও ক্রীড়াবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

প্যানেল হু

×