ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯

জরায়ু মুখের ক্যান্সার ও তার প্রতিকার

প্রকাশিত: ০৬:৩৬, ১৮ অক্টোবর ২০১৬

জরায়ু মুখের ক্যান্সার  ও তার প্রতিকার

বর্তমান সময়ে জরায়ু মুখের ক্যান্সার একটি ভয়াবহ রোগ। মহিলাদের মধ্যে স্তনে ক্যান্সারের পর এটি সংখ্যায় দ্বিতীয় প্রাণঘাতী রোগ। সারাবিশ্বে কিন্তু সারভাইক্যাল ক্যান্সারের একটি সুবিধা হলো প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে এটির চিকিৎসা সম্ভব। সুতরাং যাদের এই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাদের স্কৃনিং প্রোগ্রামের মাধ্যমে অতি প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে প্রতিরোধ করা সম্ভব। জরায়ু মুখের ক্যান্সারের কোন নির্দিষ্ট একক কারণ পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি এইচপিভি নামক ভাইরাসকে এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উল্লেখিত ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর রয়েছে। যেমনÑ বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে মা হওয়া, বেশি বেশি বাচ্চা হওয়া, দুই বাচ্চার মধ্যে কম বিরতি, নিম্মবিত্ত, একের অধিক যৌন সঙ্গী, এইচআইভি ভাইরাস ও অন্যান্য যৌন রোগ ইত্যাদি। সাধারণত রোগীরা দুর্গন্ধযুক্ত সাদাস্রাব, সহবাসের সময় রক্ত যাওয়া, অনিয়মিত রক্তস্রাব ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে আসে। ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে আরও কিছু উপসর্গ যেমন পেটে ব্যথা, কোমর ব্যথা, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, পায়খানার রাস্তায় রক্ত যাওয়া, জন্ডিস, পেটে পানি জমা ইত্যাদি দেখা দেয়। সাধারণত ডাক্তাররা উপসর্গ শুনে এবং শারীরিক পরীক্ষা করে সহজেই এই রোগ ধরতে পারে। এরপরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয়। প্যাপস স্মেয়ার, ভায়া, কল্পোস্কোপি ইত্যাদি পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা এই রোগের পুর্বাবস্থার উপস্থিতি টের পাই। এর মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত পরীক্ষা ভায়া যা শুধু একজন প্রশিক্ষিত নার্স করতে পারেন। কোন নারীর বয়স ৩০ অথবা বিয়ের বয়স ১০ বছর হলে তাকে ভায়া পরীক্ষা করাতে হবে। এটি একটি সহজ পদ্ধতি যা বিনামূল্যে সরকারী হাসপাতালের বহির্বিভাগে অল্প সময়ে সম্পন্ন করা যায়। এজন্য রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন নেই। ঝপৎববহরহম-এ নেগেটিভ হলে নীল রঙের কার্ড প্রদান করা হয় এবং তিন বছর পর পর ৫৫ বছর বয়স পর্যন্ত করতে বলা হয়। ঠওঅ পজিটিভ হলে গোলাপী রঙের কার্ড দেয়া হয় এবং পরবর্তী চিকিৎসার জন্য স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে কল্পোস্কোপি করতে বলা হয়। সন্দেহজনক হলে আক্রান্ত স্থানের মাংস নিয়ে বায়োপসি করে হিস্টোপ্যাথলজী করলে রোগটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। হিস্টোপ্যাথলজী পরীক্ষা এবং শারীরিক পরীক্ষায় জরায়ু মুখের ক্যান্সার যদি প্রাথমিক পর্যায়ে (ঝঃধমব ও ্ ঝঃধমব ওও অ) থাকে তাহলে অপারেশন (ডবৎঃযবরস’ং ঐুংঃৎবপঃড়সু) করে চিকিৎসা সম্ভব। আর যদি রোগ ছড়িয়ে পড়ে (ঝঃধমব ওও ই, ওওও ্ ওঠ) তাহলে রেডিও থেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা করতে হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল, পরিবার পরিকল্পনা মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্র, সরকারী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জরায়ু মুখের ঠওঅ, চধঢ়’ং ংসবধৎ, ঈড়ষঢ়ড়ংপড়ঢ়ু ইত্যাদি করে বিনামূল্যে ক্যান্সারের পূর্বাবস্থা নির্ণয়ের ব্যবস্থা করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও রয়েছে জাতীয় ক্যান্সার ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী যেখানে সব ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসা হয়। এইচপিভি ভাইরাসকে জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের অন্যতম কারণ হিসেবে শনাক্ত করে বিজ্ঞানীরা এর প্রতিরোধক টিকা আবিষ্কার করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ১৩০ ধরনের এইচপিভি ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে এইচপিভি ১৬ ও ১৮ প্রজাতি শতকরা ৭০ ভাগ জরায়ুর মুখের ক্যান্সারের জন্য দায়ী। বর্তমানে গার্ডাসিল ও সারভারিক্স নামে দু’ধরনের টিকা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত এই টিকা ৯-২৬ বছর বয়সে শুরু করতে হয় এবং তিনটি ডোজ দিতে হবে (০, ১ মাস, ৬ মাস)। তবে উপযুক্ত সময় হলো ৯-১৫ বছর বা বিবাহপূর্ব সময়। টিকা দুটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় সাধরণ মানুষের পক্ষে এর ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। যদি এই টিকাকে সরকারীভাবে সম্প্রসারিত টিকা দানের আওতায় এনে সাধরণ জনগণের জন্য সহজলভ্য করা হয়, তবে এই ভাইরাসকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। ডাঃ ইসরাত জাহান ইলা সহকারী অধ্যাপক শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, ঢাকা