ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৪ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩

যশোরের কুমড়ো বড়ি

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য রঙিন করে তোলে শীতের সকাল

সাজেদ রহমান

প্রকাশিত: ২২:২৬, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫; আপডেট: ২৩:১৭, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য রঙিন করে তোলে শীতের সকাল

শীত নামলেই যশোরের গ্রামবাংলা জেগে ওঠে এক বিশেষ ব্যস্ততায়, কুমড়ো বড়ি তৈরি। বর্ষানুক্রমে চলে আসা এই প্রাচীন  রেওয়াজ আজও গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে শীতের সকালকে রঙিন করে তোলে। কড়া রোদের নিচে চাটাই বা নেটের ওপর সারিবদ্ধভাবে সাজানো বড়ির দল যেন জানিয়ে দেয়, ঐতিহ্য এখনো জীবন্ত।
কুমড়ো বড়ি শুধু খাদ্য নয়; এটি বাঙালির রান্নাঘরের আবেগ, স্মৃতি আর স্বাদের ইতিহাস। মাছের ঝোল হোক বা নিছক কোনো সবজি, একটু বড়ি দিলে স্বাদের মাত্রা বদলে যায় পুরোপুরি। বাজারে নানা রকম বড়ি মিললেও চালকুমড়া বা মুলার সঙ্গে মাষকলাই ডালের মিশ্রণে তৈরি বড়ির কদর যশোরে বিশেষভাবে বেশি।
শার্শার সামটা গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা রেবেকা সুলতানা প্রতিবছর শীতেই তৈরি করেন এই বড়ি। তিনি বলেন, ‘বড়ি রোদে শুকিয়ে কৌটায় ভরে রাখলে অনেকদিন ভালো থাকে। আর তরকারিতে এটা দিলে স্বাদ অপূর্ব হয়।’
এ বড়ি তৈরির পদ্ধতিটিও গ্রামীণ জীবনের এক চমৎকার কারুকাজ। দেউলি গ্রামের গৃহবধূ লিলি আক্তার জানান, আগের দিন খোসা ছাড়ানো মাষকলাই ডাল পরিষ্কার করে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। একই সন্ধ্যায় চালকুমড়াও খোসা ছাড়িয়ে ভালো করে ধুয়ে মিহি কোড়ানো অংশ কাপড়ে বেঁধে সারারাত ঝুলিয়ে রাখা হয় যাতে অতিরিক্ত পানি ঝরে যায়।
পরদিন ভোরে ডাল ছেঁকে বেটে তৈরি হয় মিহি পেস্ট। এরপর পানি ঝরানো কুমড়ার সঙ্গে মিশে যায় প্রায় সমপরিমাণ ডাল, সঙ্গে সামান্য লবণ। তারপর পরিষ্কার কাপড়, চাটাই বা নেটের ওপর ছোট ছোট দিয়ে রোদে শুকাতে হয়। যত বেশি ভালো রোদ, তত ভালো শুকোবে বড়ি, তত দীর্ঘসময় রাখা যাবে।
এই বড়ি ঘিরে রয়েছে লোকজ
অভিজ্ঞতা এবং আবহাওয়ার সঙ্গে নিবিড় যোগ। শার্শার জামতলার জুলি খাতুন তাই বলেন, ‘শীত না পড়লি বড়ি জুত হয় না। যত বেশি শীত, তত বড়ি বেশি স্বাদ হয়।’ মাটি পুকুরের পারুল খাতুন জানান, বড়ি তেলে ভেজে মাছের তরকারি বা সবজিতে দিলেই স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়।’
তবে সময়ের স্রোতে বড়ি তৈরির রেওয়াজ যেন হারাতে বসেছে। পারুল খাতুনের আক্ষেপ, নতুন প্রজন্মের মেয়েরা আগের মতো বড়ি বানানো শেখার আগ্রহ দেখায় না। ফলে ভবিষ্যতে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যাদবপুরের ফাতেমা খাতুন জানান, মাষকলাই ডালের সঙ্গে পেঁয়াজ, পাকা লাউ, আলু, পেঁপে কিংবা কপি মিশিয়েও বড়ি তৈরি করা যায়। বিশেষ করে পেঁয়াজের বড়ি দারুণ সুস্বাদু, যদিও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না।
বিগত প্রজন্মের হাত ধরে আসা এই শিল্প শুধু একটি খাবারের রেসিপি নয়, এ এক গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। শীতের রোদে শুকোতে থাকা কুমড়ো বড়ি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঐতিহ্যের স্বাদ এখনো ঘরোয়া উনুনে জ্বলছে, শুধু তাকে ধরে রাখতে প্রয়োজন যত্ন, আগ্রহ এবং প্রজন্মাস্তরের সেতুবন্ধন।

 

প্যানেল / জোবায়ের

×