ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

মানস ঘোষ

বেকার হোস্টেল থেকে যারা বঙ্গবন্ধুর মূর্তি সরাতে চায়

প্রকাশিত: ০৪:১৯, ২৯ মার্চ ২০১৭

বেকার হোস্টেল থেকে যারা বঙ্গবন্ধুর মূর্তি সরাতে চায়

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ৭ এপ্রিল তিনদিনের সরকারী সফরে ভারতে আসছেন। কিন্তু তাঁর সফরের প্রাক্কালে এক অস্বস্তিকর ও অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যা তাঁর সফরের ওপর ছায়া ফেলতে পারে। এক কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠন সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ কামরুজ্জামান এক বিবৃতিতে দাবি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৬-’৪৭ সালে মধ্য কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে বেকার হোস্টেলের যে ২৩ নম্বর কামরায় থাকতেন, সেখানে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে শেখ হাসিনার সরকার যে দেড় ফুট উচ্চতার আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত করে তা যেন অতি সত্বর সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। কামরুজ্জামানের যুক্তি বেকার হোস্টেলে কোন প্রকার ইসলামবিরোধী কাঠামো গড়া যায় না। কারণ, ওই হোস্টেল ক্যাম্পাসে একটি বড় মসজিদ আছে। যেহেতু মূর্তি প্রতিষ্ঠা ইসলাম ধর্মের আদর্শবিরোধী সে জন্য মূর্তিটি হোস্টেল থেকে সরিয়ে কলকাতার যে কোন সরকারী জায়গায় স্থাপন করা হোক। কামরুজ্জামান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর ‘ডান হাত’। সিদ্দিকুল্লার যে কোন সভায় কামরুজ্জামানকে একই মঞ্চে দেখা যায়। যদিও তার সংগঠন নিজেকে অরাজনৈতিক বলে দাবি করে, কিন্তু সংগঠনটি প্রায়শই রাজনৈতিক ইস্যুকে ঘিরে নানান মিটিং মিছিল করে থাকে। বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার প্রক্রিয়া চলাকালীন এবং তারপরে তার মৃত্যুদ-াদেশ ঘোষণার পর কামরুজ্জামান তার সংগঠনের পক্ষ থেকে কলকাতার বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের বাইরে প্রতিবাদ মিছিল মিটিং করে দ-াদেশ প্রত্যাহারের জোরালো দাবি জানায়। সিদ্দিকুল্লা হলেন সেই নেতা যিনি বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণকান্ডে ধৃত মৌলবাদীদের আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে মুক্ত করার ঘোষণা দেন এবং সেই লক্ষ্যে মুসলিম সমাজকে মুক্তহস্তে অর্থ সাহায্য করার আহ্বান জানান। ১৯৯৮ সালে বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধু ব্যবহৃত ঘরটিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত করা হয় এবং তার উদঘাটন শেখ হাসিনাই করেন। এই সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধু ব্যবহৃত একটি খাট, একটি টেবিল, চেয়ার ও কিছু বই স্থান পায়। প্রায় এক দশক পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বঙ্গবন্ধুর একটি দেড় ফুটের ছোট আবক্ষ মূর্তি সংগ্রহশালায় স্থাপন করেন। প্রশ্ন উঠেছে, মূর্তি স্থাপনের সময় যখন কোন প্রতিবাদ করা হয়নি, তাহলে এক দশকের বেশি সময় অতিবাহিত হবার পর কেন এখন বিশেষ করে শেখ হাসিনার ভারত সফরের পূর্বমুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি সরানোর দাবি করা হচ্ছে? কামরুজ্জামান খুব ভাল করেই জানেন যে সংগ্রহশালাটি শেখ হাসিনার এক বিশেষ অনুভূতির জায়গা। তাই কামরুজ্জামান জেনেই সেটিকে আঘাত হানতে চায়। প্রেস বিবৃতিতে যে ধরনের শব্দ চয়ন করা হয়েছে তা রীতিমতো দুর্ভাগ্যজনক, যেমন বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা মুসলমান হয়েও ইসলামী মতাদর্শের বাইরে গিয়ে নিজের পিতার মূর্তি স্থাপন করেছেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় মুসলিমদের জাতীয় সম্পত্তির মধ্যে পিতার মূর্তি স্থাপন করা এটা তারা কোনভাবেই মেনে নেবে না।’ অবিলম্বে ওই মূূর্তি সরানোর জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ভারতের বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে কামরুজ্জামান চিঠি লিখেছেন। মজার ব্যাপার হলো সে যুগের ইসলামিয়া কলেজ এখন মৌলানা আজাদ কলেজ নামে পরিচিত এবং রাজ্য সরকারের শিক্ষা দফতর দ্বারা পরিচালিত। সেই কলেজের প্রধান অধ্যক্ষ বিজয় রায় এতটাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন যে, তিনি কামরুজ্জানের দাবি নিয়ে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কোন কথাই বলতে চাইছেন না। তিনি বলছেন, আমাকে এ সম্বন্ধে কেউ কিছু লেখেনি সুতরাং আমি কিছু জানি না। যা বলার সরকার বলবে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার এ ব্যাপারে এক অস্পষ্ট নীরবতা পালন করছে। রাজ্যের বুদ্ধিজীবীরাও যেন মৌনব্রত অবলম্বন করছেন। তাদের কেউ কেউ বলছেন, ‘আমরা সেক্যুলার। ধর্মীয় ব্যাপারে মন্তব্য করব না। মন্তব্য করে মুসলিম অনুভূতিতে আঘাত হানব না।’ বুদ্ধিজীবীদের বেশিরভাগই এখন মমতাপন্থী। সম্প্রতি কামরুজ্জামান প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে ভারত সরকারকে ১৫ দিনের সময় দিয়েছে যার মধ্যে মূর্তি সরিয়ে না নিলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দিবে তারা। চিন্তার বিষয় হলো, কলকাতার মুসলিম সমাজের এক বিরাট অংশ কামরুজ্জামানকে বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাঙ্গার হুমকি দেয়ার জন্য বিপুলভাবে অভিনন্দিত করেছে। তাদের বক্তব্য, কামরুজ্জামান তার হুমকির মাধ্যমে ‘ইমান’ তুলে ধরা ও রক্ষা করার মহান ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু মাসুম আখতারের মতো কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ আছেন যারা ঋধপবনড়ড়শ-এ ঢ়ড়ংঃ করেছেন ‘কামরুজ্জামান কি কলকাতাকে আফগানিস্তান বানাতে চায়।’ বলতে দ্বিধা নেই বঙ্গবন্ধুর মূর্তি ভাঙ্গার হুমকি দিয়ে বাংলাদেশের জাতির পিতাকে শুধু অসম্মান করাই হয়নি, তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চরম হেনস্থা ও অপদস্ত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, তাঁর আগামী সফরের আবহাওয়াকে দূষিত করে বিষিয়ে তোলা। বঙ্গবন্ধুর মূর্তি গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকির মাধ্যমে কামরুজ্জামানরা ভারত সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় মোদি সরকার তা কিভাবে গ্রহণ করে? কলকাতার বাংলাদেশের উপদূতাবাসের কর্মকর্তারা যারা ওই সংগ্রহশালার দায়িত্বে আছেন তারা খুবই উৎকণ্ঠিত। এমনও শোনা যাচ্ছে কামরুজ্জামানদের ইন্ধন যোগাচ্ছে ওপারের জামায়াতে ইসলামের নেতারা, যাদের এক অংশ বাংলাদেশ থেকে তাড়া খেয়ে কলকাতায় একটি বড় ঘাঁটির গোড়াপত্তন করেছে। তারাই কামরুজ্জামানদের সাহস ও স্পর্ধা জুগিয়েছে, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা সম্বন্ধে অপমানজনক বক্তব্য রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভারতের কিছু রাজনীতিবিদও যে এই হুমকির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সে সম্বন্ধে অনেকেই দ্বিধাহীনভাবে বলছেন। তাদের বক্তব্য হঠাৎ করে কেন এই ইস্যু! লেখক : ভারেতের সিনিয়র সাংবাদিক কলকাতা ২৮ মার্চ
monarchmart
monarchmart