ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

উন্নয়নের ছোঁয়া প্রতিটি গ্রামে

পাল্টে গেছে পঞ্চগড়ের যোগাযোগ ও গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র

ফজলুর রহমান, পঞ্চগড় থেকে ফিরে

প্রকাশিত: ০০:১০, ১৩ জুলাই ২০২৩

পাল্টে গেছে পঞ্চগড়ের যোগাযোগ ও গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র

১৫ বছর আগেও পঞ্চগড়ের রাস্তাগুলো ছিল ভাঙাচোরা, এবড়ো-খেবড়ো

১৫ বছর আগেও পঞ্চগড়ের রাস্তাগুলো ছিল ভাঙাচোরা, এবড়ো-খেবড়ো। যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল যান চলাচলের অনুপযোগী। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতে চাইতেন না। অর্থনৈতিকভাবেও পিছিয়ে পড়া একটি জেলা ছিল পঞ্চগড়। বর্তমান সরকারের ১৫ বছরের উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে পঞ্চগড়ের গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ খাতে। সড়ক ও জনপদ বিভাগের আওতাধীন ৭২ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্ত করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে এশিয়ান হাইওয়ে-২ এর উপযুক্ত করে। রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। ফলে কৃষি, চা ও পাথর শিল্পে বিনিয়োগ করছেন উদ্যোক্তারা।

কৃষিভিত্তিক শিল্প, পর্যটনসহ নানামুখী কর্মকা-ে বদলে গেছে এই জেলার গ্রামীণ চিত্র। পঞ্চগড় ছাড়াও আশপাশের জেলার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান। পঞ্চগড় জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, ২০০৮ সাল পর্যন্ত এলজিইডির আওতায় ৩০৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সময়ে এলজিইডির মাধ্যমে ৭৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ৬৯০টি পাকা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে, যার ফলে এই জেলায় মোট পাকা সড়কের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৯৫ কিলোমিটার।

একইভাবে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পঞ্চগড় জেলায় নির্মিত ব্রিজ-কালভার্টের সংখ্যা ছিল ৪৮৮টি (মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ হাজার ৬৮৫ মিটার)। পরে ২০০৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত সময়ে এলজিইডি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরও ৪৯২টি ব্রিজ-কালভার্ট (মোট দৈর্ঘ্য ১১ হাজার ৭৪২ মিটার) নির্মাণ করা হয়। যার ফলে মোট ব্রিজ-কালভার্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮০টি (মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ হাজার ৪২৭ মিটার)। এছাড়া এই জেলায় ৩৭টি হাটবাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করতে চাইতেন না। বর্তমানে গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় একাধিক কোম্পানি শুধুমাত্র চা শিল্পেই কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছেন। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে আসা পাথর সেখানে প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নেওয়া হচ্ছে। ধানসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ বেড়েছে কয়েকগুণ। পাল্টে গেছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় এটি সম্ভব হয়েছে।

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার কৃষক লিটু মিয়া ধানসহ বিভিন্ন খাদ্য শস্য আবাদ করেন। এসব স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন। কিন্তু ভালো দাম পেতেন না। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় ঢাকায় নিয়ে খাদ্য শস্য বিক্রি করছেন। এতে দাম ভালো পাচ্ছেন। লিটু মিয়া বলেন, ‘হামাগো দুরবস্থা ছিল। এহন সহোজে মেলা দামে মালামাল বিক্রিয় করার পারোই।’     
পঞ্চগড়ের বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তাগুলোও পাকা। হাট বাজারের অবকাঠামো উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। এই জেলায় ৩৬টি ছিটমহলের বাসিন্দারা অবহেলিত ছিলেন। ২০১৫ সালে ছিটমহল বিনিময়ের পর উন্নয়নের প্রভাব পড়ে বিলুপ্ত ছিটমহলেও। দেবীগঞ্জ উপজেলায় বিলুপ্ত ছিটমহল কোটভাজনী, সদর উপজেলার গোড়াতি এবং দেবীগঞ্জ উপজেলার দহলা খাগড়াবাড়ি ছিটমহল ঘুরে দেখা যায়, ছিটমহল বিনিময়ের মাত্র ৮ বছরের মাথায় এলাকার চিত্র পাল্টে গেছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ভবনসহ রয়েছে কমিউনিটি ক্লিনিক, বিদ্যালয়, মসজিদ-মন্দির। এক সময়ের বঞ্চনার শিকার এই জনপদের শিশুরা এখন পাকা রাস্তা দিয়ে বিদ্যালয়ে ছুটছে। 
বাংলাবান্ধা হয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটান যাওয়ার রাস্তাটি এশিয়ান হাইওয়ে-২ এর আদলে করা হয়েছে। পুরো বাংলাদেশে এই সড়কটি ব্যতিক্রম। এই পথে যাতায়াতের পাশাপাশি পণ্য আমদানি-রপ্তানির চতুর্দেশীয় অর্থনীতির সড়ক বললেও ভুল হবে না। পঞ্চগড়ের প্রতিটি ইউনিয়নকে ক্যাশলেস ইউনিয়ন করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। জেলার ৪৩টি ইউনিয়ন পরিষদ ও তিনটি পৌরসভার নাগরিকরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ঘরে বসে পাচ্ছেন নানা সেবা। ২০০৬ সালে মাত্র ৪৪ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিল, যেখানে ২০২৩ সালে ১০০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা ভোগ করছেন।
তেঁতুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মনসুর আলম বলেন, আগে নদী থেকে পাথর উত্তোলন ও কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন পঞ্চগড়ের বেশিরভাগ মানুষ। কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য জেলা কিংবা বিভাগীয় হাসপাতালে যেতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। রাস্তা-ঘাটের অবস্থা ভালো ছিল না। ছোট বেলা থেকে এমনটি দেখে আসছি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই জেলার চেহারা পাল্টে গেছে। ১৫ বছর আগের পঞ্চগড় আর ২৩ সালের পঞ্চগড়ের মধ্যে অনেক ব্যবধান। সরকার কথা রেখেছে বলেই এটি সম্ভব হয়েছে।

রেল যোগাযোগ যুগে প্রবেশ ॥ ২০০৮ সালের আগে পঞ্চগড় জেলার সঙ্গে সরাসরি ঢাকার ট্রেন চলাচল ছিল না। যে কয়েকটি সেক্টরের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে, তার মধ্যে রেলওয়ে অন্যতম। এ জেলায় রেল ট্র্যাক নির্মাণ, রেল যোগাযোগে নতুন কোচ চালুকরণ, আধুনিক রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের ক্ষেত্রে বিগত ২০ বছরে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে পঞ্চগড়ের সঙ্গে অন্য জেলায় মোট ছয়টি ট্রেন চলাচল করছে। ২০১৯ সালে পঞ্চগড় জেলায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের নামে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত দৃষ্টিনন্দন একটি রেলওয়ে স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। যাত্রীদের ব্যবহারের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে পঞ্চগড় থেকে তেঁতুলিয়া হয়ে আন্তঃরাষ্ট্রীয় রেল যোগাযোগের জন্য আধুনিক রেলওয়ে ট্র্যাক নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। 
বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম রেল স্টেশনের পাশে সত্তরোর্ধ মো. জালালের বাড়ি। ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কারণে ঢাকায় যাতায়াত করতেন। সেসব যাতায়াত তার কাছে সুখের ছিল না। কেননা, পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হতো। শাটল ট্রেন দিনাজপুর পর্যন্ত পৌঁছে দিত। তারপর আরেক ট্রেনে করে ঢাকায় আসতে হতো। এতে দিনাজপুর আসতে আসতে কখনো কখনো ট্রেনের টিকিট পেতেন না। ১২/১৩ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রেন যাত্রায় দাঁড়িয়ে বা বগির মেঝেতে শুয়ে-বসে ঢাকায় আসতে হতো। এখন পঞ্চগড় পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন যাওয়ায় সহজে টিকিট সংগ্রহ করে নিজের সিটে বসে আরামে ঢাকায় আসতে পারছেন। 
২০ বছর ধরে ঢাকায় চাকরি করেন পঞ্চগড়ের বাসিন্দা সুজা খান। একের পর এক ট্রেন পাল্টে বাড়ি যেতে হতো তাকে। তা না হলে বাসে দীর্ঘ সময় লেগে যেত। খরচও হতো বেশি। বর্তমানে পঞ্চগড় পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চালু হওয়ায় মাসে ২/১ বার অল্প খরচে ও সহজে বাড়ি যাচ্ছেন। বাড়ি থেকে ট্রেনে করে অনেক মালামাল ঢাকায় আনছেন। পঞ্চগড় বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. মাসুদ পারভেজ জানান, পঞ্চগড় পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন হওয়ায় যাত্রীর পাশাপাশি এখান থেকে অনেক পণ্য ঢাকায় নেওয়া হয়, আনা হয়। এতে ব্যবসায়িক সুবিধা হয়েছে। এই স্টেশন থেকে ৫০টি সিট রয়েছে। কিন্তু যাত্রীর চাপ ৫০ সিটেরও বেশি। 
জানতে চাইলে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, পঞ্চগড়ের অবকাঠামো উন্নয়নে গ্রামীণ চিত্র পাল্টে গেছে। রেল যোগাযোগের মাধ্যমে পঞ্চগড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন হয়েছে। মানুষ খুব সহজে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাতায়াত করতে পারছেন। এ ধরনের উন্নয়নমূলক কর্মকা- চলমান রয়েছে।

×