২২ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রাণের রহস্য অধরা


এসে গেছে এপিজিনোমিক্স এবং তা জিনোমিক্সকে ছাড়িয়ে। তথাপি মানুষের জিন-কুলুজি প্রকাশের এক দশকের পরও প্রাণের গভীরতম রহস্যটি রয়ে গেছে অধরা। মানুষের জিন ঈশ্বর নয়। তবু মানবজিনোম প্রকল্প জানার দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। জীববিজ্ঞান চর্চার ধারাটাই এতে বদলে গেছে। বড় বড় উদ্যোগ জন্ম নিয়েছে এই সূত্রে।

শরীর এমনকি অনেকাংশে স্বভাব গড়ার নির্দেশও রয়েছে আমাদের জিনে গাঁথা। সেগুলোকে শনাক্ত করে ফেলতে পারলে মানুষের শরীরের ব্লু প্রিন্ট চলে আসবে হাতে। জেনে ফেলবে জিনের সমস্ত কাজকর্ম। এমনকি অকাজও। অর্থাৎ ব্যাধির শিকার হয় মানুষ। গোলমাল শুধরে জিনগঠিত রোগ সারিয়েও ফেলা যাবে। তবে কেবল ডিএনএ মালা পড়ে ফেললে এবং জিনগুলোকে শনাক্ত করলেই কোষের কাজকর্ম নিশ্চিত জানা যাবে না। কারণ আরও কিছু রয়েছে। সংজ্ঞা অনুযায়ী, প্রতিটি জিন হলো ডিএনএ’র মতো একটা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্য, হয় একটানা বা বিচ্ছিন্ন, এর ভেতর গাঁথা রয়েছে এক একটা প্রোটিন তৈরির নির্দেশ। মানুষের শরীরের ডিএনএ একটা বিশাল লম্বা সুতোর মতো অণু আমাদের প্রতিটি কোষে যা তেইশ জোড়া টুকরো হয়ে রয়েছে। বাইরে থেকে এই তেইশ জোড়া টুকরোকে বলা হয় ক্রোমোজোম। ডিএনএকে ভাবা হয় দু’সারি পুঁতি দিয়ে সাজানো একটা লম্বা মালা হিসেবে। চার রকমের পুঁতি। পর পর বিভিন্নক্রমে সাজানো। এই ক্রমগুলোই হলো জিনের ভাষা। কোষের ভেতরে থাকা কিছু রাসায়নিক অণু-সমবায় সেই ভাষাকে ‘পড়ে ফেলে’। তারপর ‘অনুবাদ করে’ এবং তৈরি করে প্রোটিন। প্রোটিন মানব শরীর গড়ে। কোষের ভেতরে নানা কাজের পুরোহিত হিসেবে কাজ করে। কাজেই প্রতিটি জিনকে আলাদা করে চিনতে পারলেই গোটা শরীরের অন্ধিসন্ধি আসবে হাতের মুঠোয়। তবে ব্যাপারটা অত সহজ নয়। একই রকমের জিন থাকা সত্ত্বেও আমাদের শরীরের এক এক অঙ্গের কোষ এক এক চরিত্রের। হৃৎপি-ের কোষ চামড়ার কোষ থেকে আলাদা। ভেতরে যদিও উভয়েই ধরে রেখেছে একই ডিএনএ মালা, একই জিনপুঞ্জকে। দুই যমজ; যাদের সমস্ত জিন হুবহু এক হওয়ার কথা। অনেক সময়েই তাদের জিনের বাইরে থেকে আসা কিছু প্রভাব এর জন্য দায়ী। জিনকে তাই চূড়ান্ত নিয়ন্তা বলা যাচ্ছে না। জিনোমিক্স হলো জিনঘটিত ক্রিয়াকা-ের চর্চা।

কিন্তু তা পেরিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন ঝুঁকছেন এপিজিনোমিক্সের দিকে। খুঁজছেন জিন বহির্ভূত নানা প্রভাব। যা খোদ জিনের কাজকর্মেই ছাপ ফেলে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, জিন অবশ্যই নির্দেশ বহন করছে। কিন্তু কাজে তার প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কিছ,্ ুহৃৎপি- আর যকৃত শেষ অবধি আলাদা হয়ে ওঠে, দুই সেট জিন দু’জায়গায় থাকে বলেই। জিন সমষ্টির হদিস পাওয়া মানে যেন কোন রেসিপির উপকরণ তালিকার খোঁজ পাওয়া। কিন্তু সেগুলো কখন কোথায় ব্যবহৃত হবে, কখন কোনটা ‘অন’ কোনটা ‘অফ’ জানতে না পারলে, বিজ্ঞানীরা অন্ধকারেই থাকবে। ডিএনএ’র দিকে চেয়ে থাকা বিজ্ঞানীরা খোদ ক্রোমোজোমটিকে এতদিন যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। অণুবীক্ষণের নিচে ক্রোমোজোমকে দেখায় ছেঁড়া ছেঁড়া উলের টুকরোর মতো। কিন্তু কেবল পাকানো প্যাঁচানো ডিএনএ সুতোই নয়, গোটা ডি এনএ অণুটির গায়ে গায়ে লেগে আছে অজস্র প্রোটিনের পি-, হিস্টোন। ডিএনএ সেগুলোকে প্যাঁচিয়ে ধরেছে আঁটসঁাঁট হয়ে আরও পাকিয়ে গুলিয়ে উঠেছে। রূপ নিয়েছে ক্রোমোজোমের। তা পড়তে হলে এই পাক খুলে ডিএনএ অণুটিতে ট্যাগুু করতে হয়। কিন্তু সেখানেই নাক গলিয়েছে হিস্টোন। হিস্টোনের রাসায়নিক পরিবর্তন জিন পড়ার কাজটিকে আটকে দিতে পারে বা সুগম করতে পারে। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, জিন ছাপিয়ে পরিবেশের প্রভাব এখানে প্রকট হয়ে ওঠে, পুরনো জিনোমিজকে স্মরণ করে। আর সেই সূত্রে ক্যান্সারের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকা সম্ভব। অন্যান্য কিছু কিছু ছোটখাটো অণুও এই চাবির কাজ করে। সরাসরি ডিএনএতেও চাপতে পারে এমন চাবি।

সঠিক সময়ে সঠিক কোষটির সঠিক জিনটিই ‘অনূদিত’ হচ্ছে কিনা, তার দেখভাল করে ডিএনএ মিথাইলেশন। কোষের জিন সমষ্টি একজন মানুষের জীবনকালে কখনও পাল্টায় না বলা চলে। কিন্তু এই মিথাইলেশন এবং ডি-মিথাইলেশনও জীবনের একেবারে সূচনা থেকে নানা বয়সে ডিএনএ’র নানা অংশে, নানা মাত্রায় ঘটতে থাকে।

এপিজিনোক্সি হলো এই চাবিগুলোকে শনাক্ত করা। জিনের ওপর তাদের প্রভাব লক্ষ্য করার উদ্যোগ। ব্যাপারটা ভীষণ জটিল। মানুষের প্রতি কোষে আছে প্রায় ৩০ হাজার জিন। কিন্তু কোষগুলো ২শ এরও বেশি পৃথক রূপ নিয়েছে। এত বৈচিত্র্য থেকে আসল চাবিগুলোকে চেনা আর একটি জিনোম প্রকল্পের সমান কাজ। কিন্তু গত বছর থেকে সেই কাজটিই হাতে নিয়েছে হিউমান এপিজিনোম প্রকল্প নামে এক আন্তর্জাতিক উদ্যোগ। এক দশকে লেগে যায় এর ফল পেতে। এটি হবে ‘হ্যাড্রল কলাইডার অব বায়োলজি।’ জীবনের অন্যতম মৌলিক বহস্যের সন্ধানে এই প্রকল্প কতদূর এগোয় তার জন্য অপেক্ষা করা শ্রেয়।