ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

ইতিহাসের শিক্ষা ও আগামীর বাংলাদেশ

শাহাব উদ্দিন মাহমুদ

প্রকাশিত: ২১:১৯, ৯ মার্চ ২০২৬

ইতিহাসের শিক্ষা ও আগামীর বাংলাদেশ

ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ

ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। একটি জাতির দীর্ঘ পথচলায় এমন কিছু মাইলফলক আসে যা কেবল মানচিত্র নয়, বরং জাতির সত্তাকেও বদলে দেয়। একটি জাতির পরিচয় কেবল তার বর্তমানে নয়, বরং তার লড়াইয়ের ইতিহাস ঐতিহ্যে নিহিত। ১৯৫২-র বর্ণমালার লড়াই থেকে আমরা পেয়েছি মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার। ১৯৭১ সাল আমাদের দিয়েছিল ভৌগোলিক মুক্তি।

১৯৭৫-এর সিপাহী-জনতার বিপ্লব থেকে ২০২৪-এর বিবেকের জাগরণ এবং ২০২৬-এর বিনয়- এই প্রতিটি অধ্যায় আমাদের একটি সত্যই শিখিয়েছেÑ এ দেশের মানুষ শৃঙ্খল ভাঙতে জানে। কিন্তু তারা চায় এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ‘ক্ষমতা’ হবে ‘আমানত’, আর ‘ন্যায়’ হবে ধ্রুবতারা। আজ যখন আমরা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, একটি টেকসই সামাজিক চুক্তি নির্মাণ করা, যা হবে আগামীর বাংলাদেশের টেকসই রাজনৈতিক মডেল।
আমাদের রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের রক্তভেজা রাজপথে। সেটি কেবল ভাষার অধিকার ছিল না, ছিল আত্মপরিচয় ও ইনসাফের লড়াই। সেই চেতনারই রাজনৈতিক রূপ ছিল ১৯৬৬ সালের ‘ছয়দফা’, যা বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছিল যে, কোনো স্বৈরশাসকই জনগণের সম্মিলিত শক্তির সামনে টিকে থাকতে পারে না। এই আন্দোলনের পথ ধরেই অর্জিত হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা। তবে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা জীবন দিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন আজও আমাদের তাড়িত করে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সংঘটিত ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য বাঁক। এটি ছিল আধিপত্যবাদ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এক স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে আসেন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি ভঙ্গুর একটি রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব নেন। একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে দেশকে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রে’ ফিরিয়ে এনে মানুষের নিশ্চিত করেন বাকস্বাধীনতা।
শহীদ জিয়ার ‘সাদা-মাঠা’ ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক। তার প্রবর্তিত ‘খাল খনন কর্মসূচি’ কেবল কৃষির উন্নয়ন ছিল না, বরং তা ছিল জনগণকে উন্নয়ন কর্মকা-ে সরাসরি সম্পৃক্ত করার এক বিশাল সামাজিক বিপ্লব। তিনি শিখিয়েছিলেন, উন্নয়নের চাবিকাঠি এসি রুমে নয়, বরং বাংলার পলল মাটিতে নিহিত। তার সেই শ্রমঘন ও উৎপাদনমুখী রাজনীতি আজ ‘জনগণের আমানত’ দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে অধিকাংশ সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া ১৯৭১-এর চেতনার পরিপন্থি। নতুন সামাজিক চুক্তিতে অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হতে হবেÑ লুণ্ঠনমুক্ত বাজার ব্যবস্থা। ব্যাংক খাতের সংস্কার, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধার এবং সিন্ডিকেট প্রথা ভেঙে দেওয়া আজ সময়ের দাবি। উন্নয়ন মানে কেবল জিডিপির প্রবৃদ্ধি নয়; উন্নয়ন মানে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি। শহীদ জিয়ার সেই স্বনির্ভর অর্থনীতির মডেলকে আধুনিক ডিজিটাল যুগে প্রয়োগ করে এমন এক ব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে রাষ্ট্রের সম্পদ হবে জনগণের আমানত, কোনো গোষ্ঠীর লুটের মাল নয়।
বর্তমানে যুবসমাজ এক ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন, যার নাম ‘মাদক’। এটি কেবল স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞ। মাদকের বিষাক্ত ছোবল তরুণদের সৃজনশীলতা ও নৈতিকতাকে গ্রাস করছে। একটি মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হলে মাদক নির্মূলের কোনো বিকল্প নেই। তবে এটি কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে সম্ভব নয়। প্রয়োজন পারিবারিক মূল্যবোধের জাগরণ এবং সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা। আগামীর রাজনৈতিক মডেলে মাদককে ‘জাতীয় শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে একে নির্মূল করতে হবে। যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।
আমরা দীর্ঘকাল ‘বিজয়ী সব পাবে’ (ডরহহবৎ-ঃধশবং-ধষষ) নামক এক অসুস্থ ও প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক ধারা দেখে আসছি। এক দল ক্ষমতায় গেলে অন্য দলকে নিশ্চিহ্ন করার যে ধারা, তা রাষ্ট্রকে বারবার পিছিয়ে দিয়েছে। নতুন চুক্তিতে ‘রাজনৈতিক সহাবস্থান’ হতে হবে আমাদের প্রধান সংস্কৃতি। ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং গুরুত্ব দিতে হবে। গণতন্ত্র মানে কেবল ভোট নয়; গণতন্ত্র মানে পরমতসহিষ্ণুতা। রাজনীতির সাফল্য সংসদীয় আসনের সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের ‘আস্থায়’ প্রতিফলিত হতে হবে। ধর্মকে রাজনৈতিক বিভাজনের অস্ত্র নয়, বরং নৈতিক শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রতিটি নাগরিক যেন তার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক হিসেবে নিজেকে অনুভব করতে পারে।
রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রে নয়, বরং বিচারে। গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে, আইন যখন প্রভাবশালীদের দাসে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র ভেতর থেকে ক্ষয়ে যায়। নতুন সামাজিক চুক্তিতে ‘ইনসাফ’ ও ন্যায়বিচার হতে হবে কেন্দ্রবিন্দু। বিচার বিভাগকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যাতে একজন অতি সাধারণ মানুষও রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার সাহস রাখে। ক্ষমতা যখন আমানত হিসেবে বিবেচিত হবে, তখন প্রতিটি পয়সা ও প্রতিটি সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান আমাদের সুপ্ত বিবেককে পুনরায় জাগিয়ে তুলেছে। এটি ছিল মূলত দমন পীড়ন, বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম-খুনের বিরুদ্ধে  ইনসাফ প্রতিষ্ঠার এক নতুন লড়াই। আর ২০২৬-এর উত্তরণ আমাদের শিখিয়েছে ‘বিনয়’। ক্ষমতা যখন দাম্ভিকতায় রূপ নেয়, তখন তার পতন অনিবার্য। এ জাতি ১৯৭১-এ স্বাধীনতা পেয়েছে, ২০২৪-এ বিবেক ফিরে পেয়েছে এবং ২০২৬-এ বিনয় শিখেছে। এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে আগামীর বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ- ক্ষমতার সংক্ষিপ্ত ও সুবিধাবাদী পথ। অথবা ন্যায়ের দীর্ঘ কিন্তু স্থায়ী পথ। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, সাময়িকভাবে বিচ্যুত হলেও এ জাতি শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের পথকেই বেছে নিয়েছে। শহীদ জিয়ার সেই ‘খাল খনন’ থেকে শুরু করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা- সবই আজ আমাদের একবিন্দুতে মেলাতে হবে। রাজনীতিতে বিজয় মানে কেবল নির্বাচনে জেতা নয়, বিজয় মানে মানুষের নৈতিক আস্থা অর্জন করা। আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে, রাজনীতির সাফল্য আসনে নয় আস্থায়। আর স্থায়ী বিজয় ভোটে নয়, নৈতিকতায়। নাগরিকরাই হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। আর রাষ্ট্র হবে তাদের বিশ্বস্ত আমানতদার। এই নতুন সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েই আমরা গড়ব এক উন্নত, সমৃদ্ধ ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ। জয় হোক মানুষের, জয় হোক ন্যায়ের।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]

প্যানেল হু

×