আন্তর্জাতিক নারী দিবস (৮ মার্চ) নারীর অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস (৮ মার্চ) নারীর অধিকার, সমতা ও সক্ষমতার প্রতীক। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘গিভ টু গেইন’ নারীদের ক্ষমতায়ন ও সহযোগিতাকে উৎসাহিত করে। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও লিঙ্গ বৈষম্য বিদ্যমান। অবশ্য সরকার ২০৩০ সালে তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ ৩০ শতাংশ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। তবে বর্তমান নারীরা তথ্য-প্রযুক্তি তথা সোশ্যাল মিডিয়ায় যথেষ্ট সক্রিয় আছেন বলে প্রতিয়মান। যদিও সোশ্যাল মিডিয়া একসময় ছিল বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, ছবি শেয়ার করা, মতামত প্রকাশ কিংবা অবসর সময় কাটানোর জন্য।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মাধ্যমটি তার প্রচলিত সীমা অতিক্রম করে একটি শক্তিশালী সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া শুধু যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পরিসর, যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য বিপণন, আর্থিক লেনদেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ সোশ্যাল মিডিয়াকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং আয়ের উৎস ও পেশাগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে কোনো নির্দিষ্ট ভৌত প্রতিষ্ঠান, দোকান বা আউটলেট থাকার প্রয়োজন নেই।
একজন ব্যক্তি নিজের বাড়িতে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে। ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার করে পণ্য প্রদর্শন, অর্ডার গ্রহণ এবং ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা শুরু করা অনেক সহজ হয়েছে। আগে যেখানে দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন ও অন্যান্য খরচ ছিল বড় বাধা, এখন সেখানে সোশ্যাল মিডিয়া সেই বাধা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা শুধু পণ্য বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার সংযোগ অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। একজন ক্রেতা সোশ্যাল মিডিয়ায় পণ্য দেখে তাৎক্ষণিকভাবে অনলাইনে মূল্য পরিশোধ করতে পারছে। আবার বিক্রেতাও দ্রুত অর্থ গ্রহণ করতে পারছে। এতে সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ডিজিটাল মার্কেটিং, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ইত্যাদি পেশা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করেছে। অনেক তরুণ-তরুণী ইউটিউব ভিডিও, ফেসবুক কনটেন্ট বা ইনস্টাগ্রাম রিল তৈরি করে বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশিপের মাধ্যমে আয় করছে।
এই আয়ের ধারা প্রমাণ করে যে সোশ্যাল মিডিয়া এখন আর নিছক বিনোদনের জায়গা নয়, এটি একটি কার্যকর অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নারীর সম্পৃক্ততা বেশি। একটি ছোট ব্যবসাও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে পারছে। আগে যেখানে বিদেশে পণ্য রপ্তানি করা ছিল জটিল ও ব্যয়বহুল, এখন সেখানে অনলাইন উপস্থিতি একটি ব্র্যান্ডকে বৈশ্বিক পরিচিতি দিচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের নির্দিষ্ট গ্রাহক গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দিচ্ছে, যা প্রচলিত বিজ্ঞাপনের তুলনায় বেশি কার্যকর ও কম ব্যয়বহুল।
অনেক নারী রান্না, আঁকাআঁকি, সেলাই, মেকআপ, ফটোগ্রাফি কিংবা ভিডিও কনটেন্ট তৈরিতে দক্ষ হলেও আগে সেগুলো প্রদর্শনের সুযোগ পেতেন না। এখন এই দক্ষতাগুলোই ব্যবসায় রূপ নিচ্ছে। কেউ রেসিপি ভিডিও দিয়ে জনপ্রিয় হচ্ছেন, কেউ ফ্যাশন ব্লগিং বা অনলাইন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আয় করছেন। এতে নারীরা শুধু আর্থিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও পরিচিতি লাভ করছেন। গ্রামাঞ্চলের নারীদের ক্ষেত্রেও সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অনেক নারী ঘরে বসেই নকশিকাঁথা, পাটজাত পণ্য বা হাতে তৈরি সামগ্রী অনলাইনে বিক্রি করছেন। এর ফলে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙ্গা হচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছানোর সুযোগ থাকায় তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। সুতরাং সোশ্যাল মিডিয়া আজ শুধু বিনোদন বা যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে নারীদের জন্য আত্মনির্ভরশীল হওয়ার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। ঘরে বসেই আয় করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সোশ্যাল মিডিয়া-ভিত্তিক ব্যবসা নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ব্র্যান্ড তৈরি এবং সরাসরি গ্রাহকের সাথে যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করছে, যা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীরা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। সংসারের দায়িত্ব, সন্তান লালন-পালন, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ কিংবা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের পেছনে টেনে ধরে। এ প্রেক্ষাপটে সোশ্যাল মিডিয়া নারীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নারীরা নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে আয়ের উৎসে পরিণত করতে পারছেন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৪৬ শতাংশ নারী, বাংলাদেশে এই সংখ্যা প্রায় ৩৪.২ শতাংশ। নারী ঘরে তৈরি খাবার, হস্তশিল্প, পোশাক, গয়না, কসমেটিকস বা বেকারি পণ্য অনলাইনে প্রচার ও বিক্রি করতে পারেন।
এছাড়া লাইভ ভিডিও, পেজ বা চ্যানেল খুলে পণ্য প্রচার করা সহজ হয়েছে। অনেকেই কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে কাজ করে বিজ্ঞাপন ও স্পন্সরশিপ থেকে আয় করছেন। আবার কেউ কেউ অনলাইন প্রশিক্ষণ, রান্না শেখানো, বিউটি টিপস বা শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করেও উপার্জন করছেন। আগে যেখানে দোকান ভাড়া, কর্মচারী নিয়োগ ও অন্যান্য খরচের কারণে ব্যবসা শুরু করা কঠিন ছিল, এখন সেখানে একটি স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সংযোগই যথেষ্ট। ফলে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরাও উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস পাচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের পণ্যের প্রচার, ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে নারীরা নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করছেন।
নিজের পরিশ্রমের অর্থ দিয়ে সংসারে অবদান রাখার ফলে পরিবারে তাদের মতামতের গুরুত্ব বাড়ছে। এতে নারীরা মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হয়ে উঠছেন। এভাবে সোশ্যাল মিডিয়া নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা বাড়াচ্ছে, আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে এবং পরিবার ও সমাজে তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে। তবে সফল হতে হলে সততা, দক্ষতা ও ধৈর্যের প্রয়োজন।
তবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে নারীদের জন্য এমন প্ল্যাটফর্ম দরকার, যেখানে কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই অনিরাপদ পরিবেশ, হয়রানি, প্রতারণা, ভুয়া অর্ডার কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঝুঁকি থাকে। তাই নারীবান্ধব ও নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম থাকা জরুরি। নিরাপদ সোশ্যাল মিডিয়ার বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী প্রাইভেসি সেটিংস, সহজ রিপোর্টিং ব্যবস্থা, ভেরিফাইড প্রোফাইল, স্পষ্ট কমিউনিটি গাইডলাইন এবং দ্রুত সহায়তা। এতে নারীরা নির্ভয়ে নিজেদের কাজ প্রদর্শন করতে পারেন এবং ক্রেতা বা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পেশাদারভাবে যোগাযোগ রাখতে পারেন।
পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট ও অর্ডার ম্যানেজমেন্ট নিরাপদ হলে আয়ের পথ আরও সুগম হয়। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের উচিত নারীদের জন্য বিশেষভাবে নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। একই সঙ্গে নারীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো, অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং আইনি সহায়তার ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। পরিবার ও সমাজের সমর্থনও এখানে বড় ভূমিকা রাখে। ঘরে বসে নারীদের আয়ের সুযোগ টেকসই করতে হলে নিরাপদ সোশ্যাল মিডিয়া অপরিহার্য। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে নারীরা আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করতে পারবেন, যা পরিবার, সমাজ ও দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এমনটাই হোক সকলের প্রত্যাশা।
লেখক : অধ্যাপক, আইআইটি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্যানেল হু








