ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

বাংলা-সমালোচনা সাহিত্যের পথিকৃৎ

আবু সাঈদ

প্রকাশিত: ২২:৩৫, ৩০ মে ২০২৪

বাংলা-সমালোচনা সাহিত্যের পথিকৃৎ

শশাঙ্কমোহন সেন

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ধারায় মঙ্গলকাব্যকে শশাঙ্কমোহন সেন এজন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, এতে বাঙালির গার্হস্থ্য জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে। আবার বৈষ্ণব পদাবলী তাঁর কাছে এজন্যই তাৎপর্যপূর্ণ যে, এতে মানবমন এবং মানব প্রেমের জয়গান রচিত হয়েছে। মঙ্গলকাব্যে মানব ব্যক্তিত্ব পরাজিত হলেও বৈষ্ণব কাব্যে হয়েছে মানব প্রেমের জয়। বাঙালির জাগরণ কেন প্রলম্বিত হয়েছে তার ব্যাখ্যাও তিনি মঙ্গলকাব্যের মাধ্যমে দিয়েছেন এভাবে, ‘বৈষ্ণব কবিদের পদাবলী ব্যতীত নিখুঁত সাহিত্য নামের উপযুক্ত কবিতাও প্রাচীন সাহিত্যে বিরল

বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যের পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয় শশাঙ্কমোহন সেনকে (১৮৭২-১৯২৮)। সাহিত্য সমালোচনায় এবং বিশ্লেষণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। সমকালীন বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যের তিনি ছিলেন নিবিষ্ট পাঠক। ফলে বাংলা সাহিত্যের গতি-প্রকৃতি, রূপ-রীতি, শৈলীর আলোচনার পাশাপাশি বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তার তুলনামূলক আলোচনাও তিনি স্বচ্ছন্দে করতে পারতেন।

মূলত বাংলায় তুলনামূলক সাহিত্য-সমালোচনা তিনিই প্রথম আরম্ভ করেছিলেন। তাঁর লিখনচাতুর্যে, বৈদগ্ধময় বিশ্লেষণের কারণে সমালোচনা সাহিত্য সৃজনশীলতায় পরিণত হয়েছে। তাঁর সমকালীন বাংলা সাহিত্যকে সম্যক উপলব্ধি এবং বোঝার জন্য শশাঙ্কমোহন সেনের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। 
শশাঙ্কমোহন সেন ১৮৭২ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের ধলঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ব্রজমোহন সেন। ব্রজমোহন নিজেও কবি ছিলেন। শশাঙ্কমোহন সেন ১৮৯২ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এফ এ এবং ১৮৯২ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। পরবর্তীকালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে সংস্কৃতেও অনার্স সম্পন্ন করেন।

এ পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। শশাঙ্কমোহন সেন ১৮৯৭ সালে রিপন কলেজ থেকে আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম জজ কার্টে ওকালতি শুরু করেন। কিন্তু ১৯১৯ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহ্বানে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে যোগ দেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়াতেন ‘বাংলা সাহিত্যে বিশ্বসাহিত্যের আদর্শ’।

কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদাানের পর, শশাঙ্কমোহন অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। বাংলা এবং ইংরেজি সাহিত্যে তিনি যেমন পারদর্শী ছিলেন তেমনি সংস্কৃত সাহিত্যেও তাঁর ছিল অগাধ পা-িত্য। ফলে বাংলা সাহিত্য-সমালোচনা তিনি যে আঙ্গিকে করতেন তাতে পাঠকররা বিমুগ্ধ না হয়ে থা তে পারত না।

তাঁর সাহিত্য-সমালোচনায় রসবোধ এবং পরিমিতিবোধের এক আশ্চর্য সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। অধ্যয়ন এবং অধ্যাপনায় যেমন তাঁর ক্লান্তি ছিল না তেমনি সমালোচনায় তাঁর বৈদগ্ধের ছাপ থাকত। তাঁর উল্লেৃখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, সিন্ধুসংগীত (১৮৯৫), শৈল-সংগীত (১৯০৫), বঙ্গবাণী (১৯১৫), বাণীমন্দির (১৯২৮), মধুসূদন (১৯২২) অন্যতম।
 সমালোচনা কেবল সাহিত্যকে বুঝতে সহায়তা করে না উপযুক্ত সমালোচকের হাতে পড়লে সে সমালোচনা সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে ওঠে। যেমন, লনজিনাস, ভরত প্রমুখের সাহিত্য সমালোচনা। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে আঙ্গিক হিসেবে সমালোচনা-সাহিত্য রচনা খুব বেশি দিনের নয়।

বাংলার রেনেসাঁসের মানস পুত্ররা সৃষ্টিশীল সাহিত্য রচনার পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচনায়ও পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। যেমন, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতার বড় সমালোচক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্র মূলত ঈশ্বরচন্দ্রই ভাবশিষ্য। মধুসূদনও বড় সাহিত্য সমালোচক ছিলেন। প্রমাণ, তাঁর চিঠিপত্রগুলো। এরপরও বাংলায় তুলনামূলক সাহিত্য সমালোচনা সাহিত্যের আঙ্গিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় শশাঙ্কমোহন সেনের হাত ধরে।

পরবর্তীকালে এ ধারাটি আরো বৈচিত্র্যময় এবং ঋদ্ধ হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ নিজেও বড় সাহিত্য সমালোচক ছিলেন। তবে তাঁর সমালোচনার ধারাটি ছিল ‘আত্মগত’। অর্থাৎ সাহিত্য পাঠ করে তিনি যা বুঝতেন, তা-ই তাঁর পাঠককে জানিয়ে দিতেন। কিন্তু সমালোচনার মধ্যে নান্দনিকতা, তত্ত্ব ও তথ্য, দার্শনিকতা এবং এর আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বাঙালি পাঠকরা খুঁজে পায় মূলত শশাঙ্কমোহনের সমালোচনার মধ্যেই।

ড.আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখেও বলা চলে, বাংলা ভাষায় প্রতীচ্য আদলের ও মানের সাহিত্য সমালোচনা প্রথম শুরু“করেন কবিভাস্কর শশাঙ্কমোহন সেন (১৮৭২-১৯২৮), দ্বিতীয় ব্যক্তি মোহিতলাল মজুমদার (১৯৮৮-১৯৫২); তারপর আমরা শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধচন্দ্র সেন গুপ্ত, নীহাররঞ্জন রায় প্রমুখ অনেকতায় বহু সমালোচক-প্রাবন্ধিক পেয়েছি। সাহিত্যের মূল্যায়ন ও বিশ্লষণমূলক ইতিহাসকার রূপে দীনেশচন্দ্র সেন (১৮৬৬-১৯৩৬), সুকুমার সেন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ এনামুল হক, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ।

এঁদের অনেকেই সম্পূর্ণ কিংবা বিশেষ শাখায় মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণমূলক ইতিহাস রচনা করেছেন।’ (বিশ শতকে বাঙালি) আহমদ শরীফ শশাঙ্কমোহন সেনের সমালোচনার মধ্যে ‘প্রতীচ্যের আদল’ দেখতে পেয়েছেন আর বিনয় সরকার শশাঙ্কমোহনের সমালোচনা দার্শনিকতায় ঋদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেন।

ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নলীনিকান্ত ভট্টশালী বলেছেন, ‘যাহার আবির্ভাবে ইউরোপ ও আমেরিকায় কাব্য, নাটক, উপন্যাস প্রভৃতির ন্যায় সমালোচনাও সাহিত্যের একটি স্বতন্ত্র শ্রেণির স্থান অধিকার করিয়াছে; যেরূপ সমালোচনা সম্পর্কে সাহিত্যের মধ্য দিয়া জাতীয় জীবনের বিশেষত্বের বোধ জন্মে, বিশ্ব সাহিত্যের সহিত পরিচয় সংস্থাপিত হয় এবং অনির্ব্বচনীয় রহস্যময় বিশ্বাসের অনুভব সহজ হয়, এবং এই সকলের ফলে শিক্ষা ও সংস্কারগত সংর্কীণতা ঘুচিয়া গিয়া মানবমনের পরিধি বিস্তৃত ও সাহিত্যরুচি উদার হইয়া ওঠে ও সমালোচনা মৌলিক সাহিত্যসৃষ্টির গৌরব লাভ করে বাস্তবিকপক্ষে এ পর্যন্ত বঙ্গসাহিত্যে তাহার অত্যন্ত অভাবই ছিল বলিতে হইবে- শশাঙ্কমোহন সেই অভাব পূরণ করিলেন।’ বস্তুত শশাঙ্কমোহনের ‘বঙ্গবাণী’ (১৯১৫) গ্রন্থটিই বাংলা তুলনামূলক সাহিত্যের প্রথম আকর গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

শশাঙ্কমোহন সেনের সাহিত্য-বিচার কেবল রস,তত্ত্ব বা নন্দনতত্ত্বে আবদ্ধ থাকতো না, তাঁর সমালোচনায় অবধারিতভাবে চলে আসত আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও। ফলে তাঁর সমালোচনা বহুমাত্রিকতায় আলোকিত হতো। সমালোচনার এই বহু রৈখিক বিশ্লেষণ আমরা পরবর্তীকালে বিনয় ঘোষ, গোপাল হালদার এবং সিরাজুল ইসলাম চেীধুরীর মধ্যে পাই।

আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিভাবে সাহিত্যকে প্রভাবিত করে এমনকি সাহিত্যের দিক পরিবর্তন করে তার অন্যতম উদাহরণ ‘বঙ্গসাহিত্যের বিকাশ’ প্রবন্ধটি। এ প্রবন্ধে তিনি কেবল সাহিত্য নয়, ভাষাও কিভাবে একটি জাতির আত্মপ্রকাশ এবং আত্মবিকাশের সঙ্গে জড়িত এবং ভাষা কিভাবে একটি জাতির সামগ্রিকতাকে উপস্থাপন করে তার স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি মনে করেন, ভাষার মধ্যেই জাতির আত্মজাগরণের শক্তি নিহিত রয়েছে। এ প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘বঙ্গদেশের কথিত ভাষাই তখন গৌড় প্রাকৃত অভিহিত হইত, এবং গৌড় প্রাকৃতই বর্তমান বঙ্গভাষায় পরিণত হইয়াছে। এই বঙ্গভাষা খ্রিস্টাব্দের দ্বাদশ শতাব্দীতে দ-াচার্যের ব্যাকরণ-মধ্যে উল্লেখিত হইয়াছে। ওই সময়ে সংস্কৃতই সাধুভাষা, পুঁথির ভাষা, প-িত পুরোহিত ও সমাজের উপরিস্থিগণের প্রশংশিত ভাষা ছিল। .. .. আমরা জানি ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি চিরকাল সমাজস্থ জনসাধারণের উন্নতির উপরই নির্ভর করে।

যে জাতির জনসাধারণ জাগে নাই, কিংবা যে -জাতির হৃদয় কোনো বিশেষ দিকের জ্ঞানভাবের প্ররোচনাপ্রাপ্ত হয় নাই , এবং ঐ প্ররোচনা তাহাকে আত্মপ্রকাশে প্রয়াসী করিয়া তোলে নাই, সেই জাতির মধ্যে কষ্ট-শিক্ষিত ভাষায় বাক্য প্রকারে ধর্ম দর্শন কিংবা পৌরোহিত্য প্রকৃতির গ্রন্থ বহু রচিত হইতে পারে, কিন্তু উহা প্রকৃত সাহিত্য হয় না। প্রকৃত সাহিত্য চিরকাল মাতৃভাষার সম্পত্তি।

মনুষ্যমধ্যে সাহিত্যোন্নতির মূল কারণ তাহার সাধারণের জাগরণ।- (বঙ্গবাণী) মাতৃভাষাকে কেউ অন্তত তখন পর্যন্ত এভাবে দেখেননি। ভাষা যে জনগণের সম্পত্তি এবং ভাষার সঙ্গে জাতির আত্মজাগরণের যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে তা শশাঙ্কমোহন সেনের এ ব্যাখ্যার মধ্যে ওঠে এসেছে। বাঙালির ভাষিক পরাধীনতার কারণেই তার জাগরণ সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি মনে করতেন। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি শশাঙ্কমোহনের গভীর অনুরাগ যেমন ধরা পড়ে তেমনি আত্মজাগরণের জন্য মাতৃভাষার চর্চার উপরই তিনি জোর দিয়েছেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ধারায় মঙ্গলকাব্যকে শশাঙ্কমোহন সেন এজন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, এতে বাঙালির গার্হস্থ্য জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে। আবার বৈষ্ণব পদাবলী তাঁর কাছে এজন্যই তাৎপর্যপূর্ণ যে, এতে মানবমন এবং মানবপ্রেমের জয়গান রচিত হয়েছে। মঙ্গলকাব্যে মানব ব্যক্তিত্ব পরাজিত হলেও বৈষ্ণব কাব্যে হয়েছে মানব প্রেমের জয়।

বাঙালির জাগরণ কেন প্রলম্বিত হয়েছে তার ব্যাখ্যাও তিনি মঙ্গলকাব্যের মাধ্যমে দিয়েছেন এভাবে, ‘বৈষ্ণব কবিদের পদাবলী ব্যতীত নিঁখুত সাহিত্য নামের উপযুক্ত কবিতাও প্রাচীন সাহিত্যে বিরল। তখনকার কবিগণ প্রায়ই দেবদেবীর পরিতোষ উদ্দেশ্য করিয়াই কাব্য রচনা করিতেন। ধর্মের এক প্রকার অঙ্গাবরণ জড়াইয়া তাঁহাদের লেখাগুলো প্রকাশ করিতে হইত - ‘বিদ্যাসুন্দর’ - এর মতো পুস্তকও দেবী-মাহাত্ম্যর সঙ্গে জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে।

তখন ধর্মেরও তেমন কোন প্রচলিত উচ্চাদর্শ ছিল না.. .. চরিত্রের স্থৈর্য্য, মাধুর্য্য কিংবা পবিত্রতা, চিত্তের স্বাধীনতা, আত্মনিষ্ঠা কিংবা নৈতিক বল সাধারণের ধর্ম-আদর্শের মধ্যে কোথাও উদ্দিষ্ট ছিল না-অন্তত, উহা কবি-কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করিতে পারে নাই। .. .. কোনোরূপ জাতীয়তার আদর্শে কিংবা বিপ্লবের আদর্শেও পরিচালিত না হওয়ায়, ব্যক্তিগত শক্তি-সামর্থ্যরে বা স্বাতন্ত্র্যের উপর আস্থা না থাকায়, বরং পদে পদে ভাগ্য দৈব অথবা দেবদেবীর প্রসাদের উপরে প্রবলভাবে নির্ভর করায়, প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে প্রকৃত মনুষ্যত্বের আদর্শও অবাধে পরিপুষ্ট হইতে পারে নাই।

চন্দ্রধর প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যের প্রমিথিয়ুস। কিন্তু মানবের মাহাত্ম্যকীর্তন কবির উদ্দেশ্য ছিল না! তাই চন্দ্রধরকে মনসার হস্তে পরাজিত হইতে হইয়াছিল, সাহিত্য লোকের একটি অত্যুন্নত বীর পুরুষকে লৌকিক বিশ্বাসের যুপমূলে বলি দেওয়া হইয়াছিল। এই আদর্শে কবিকঙ্কনও ‘কালকেতু’র বীর চরিত্রকে ভীরুতা এবং কলঙ্কের অতলে ডুবাইয়া দিয়াছেন। .. .. দেবদেবীর পীঠস্থানে বারংবার মহাবলি চলিযাছে; এই উপলক্ষে কেবল গৌণভাবে কবিত্ব ফুটিয়াছে, বই নহে।’

(বঙ্গবাণী) মঙ্গলকাব্যকে এ আঙ্গিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা তখনকার সময়ে কেবল নতুন নয়, বৈপ্লবিকও ছিল। দেব-দেবীর মাহাত্ম্য এবং ভক্তিবাদের কাছে এভাবে নত হওয়ার প্রভাব যে রাজনৈতিক এবং সামাজিকভাবেও পড়েছে মূলত তা-ই শশাঙ্কমোহন বলতে চেয়েছেন।
  বাংলার রেনেসাঁসের প্রাণপুরুষ যদি রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩) হয় তবে এর ‘সাহিত্য-আত্মা’ মাইকেল মধুসূদন দত্তই। মধুসূদনের তিলোত্তমাসম্ভব কাব্যে শশাঙ্কমমোহন দেখেছেন সৌন্দর্যের প্রতি কবির অপার বিমুগ্ধতা। ইংরেজ রোমান্টিক কবিদের সৌন্দর্যচেতনা মাইকেলকে প্রভাাবিত করেছে সন্দেহ নেই। মধুসূদনের কাব্য প্রতিভা বিশ্লেষণে শশাঙ্কমোহন সেন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। আমরা জানি, মধুসূুদন দত্ত এবং ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাঁচা বয়সের বিরূপ সমালোচনা। পরে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভুল বুঝতে পেরেছিলেন।

অনুমান করা অসঙ্গত হবে না, এ ভুল ভাঙ্গাতে শশাঙ্কমোহনের প্রভাব থাকতে পারে। কারণ মধুসূদন সম্পর্কে অনেকেরই ভ্রান্তি দূর করেছিলেন শশাঙ্কমোহন সেন। অবশ্য মধুসূদনের উপর অনেকের শরনিক্ষেপের কারণ মধুসূদনের প্রতিভা নয় বরং তাঁর ধর্মত্যাগ এবং ‘ধার্মিক রামচন্দ্র’ এবং ‘পাপিষ্ট রাবণ’-এর পারস্পরিক স্থান বদল। এ কারণে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ও বিরূপ সমালোচনায় সমালোচিত হয়। শশাঙ্কমোহন সেন তাঁর বইয়ে প্রমাণ করেছেন রাবণ পাপিষ্ট নয় বরং সে মহৎ চরিত্র।

তিনি গ্রীক ভাস্কর্য লাওকনের প্রসঙ্গ এনে বলেছেন, ‘গ্রীক ‘দৈব’বাদের মূলতত্ত্ব যাহারা বুঝিয়াছেন তাঁহারা দেখিবেন, গ্রীক ভাস্কর্যের পরম শক্তিশালী শিল্প নমুনা লেওকুন  কি অতুলনীয় ভাবুকতায় উহাকে প্রমূর্ত করিয়াছে। লেওকুন পরিবার সর্ববলীয়ান এবং দুরতিক্রম্য দুরদৃষ্টের মহানাগপাশে পড়িয়া ছটফট করিতেছে। ধ্বংস অনিবার্য। গ্রীক অদৃষ্টবাদের দৃষ্টিতে উহাই তো মনুষ্যজীবন।

ঐ ভাস্কর্যমূর্তি মনে রাখিয়া চিন্তা করুন, খধড়পড়ড়হ এৎড়ঁঢ় -এর বাম দিকের মূর্তি বীরবাহু (বা কুম্ভকর্ণ?) ডাহিনে মেঘনাদ- মহাসর্পের দর্শন জর্জরিত মেঘনাদ। মধ্যস্থলে, নাগপাশের পূর্ণ পীড়নের কেন্দ্রস্থলে, মৃত্যু-দংশনের অব্যবহিত পূর্বমুহূর্তে, ঘনীভূত ক্ষোভ রোষ বিষাদের অশক্ত বীর্যমূর্তি রাবণ-মহাপুরুষ রাবণ। .., .. যে (মহানায়ক) অসহ্য যাতনায় পদে পদে নিষ্পেষিত হইয়া তিলে তিলে মরিবে তথাপি কোনোমতে আত্মসমর্পণ করিবে না- এমন আত্মনিষ্ঠ এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বীর পুরুষের অশক্ত ক্ষোভ রোষ - গর্জিত হাহাকার।

মন্ত্রৌষধি-রুদ্ধ-বীর্য মহাসর্পের হা-হুতাশন। প্রচ- অগ্নিজ্বালায় দহ্যমান মহাচুলল্লীর তপ্ত নিশ্বাস। রাবণ চরেিত্রর এই করুণ লক্ষণটি- গ্রীক লক্ষণটি বঝিতে না পারিলেই অবিচার!..,.. গ্রীক সাহিত্যে শিল্পের আদর্শ ছিল - ঐঁসধহরংস -মানবত্ব ’ (মধুসূদন) বঙ্কিমচন্দ্রের রচনার মধ্যে যে কাব্যপ্রতিভা লুকিয়ে আছে তা শশাঙ্কমোহনই প্রথমে আবিষ্কার করেন।

শশাঙ্কমোহন সেন বঙ্কিমের উপন্যাসের মধ্যে কেবল কল্পনা বা বিষয়বস্তু খুঁজে পাননি একই সঙ্গে পেয়েছেন, ‘জীবনের গভীরতর সত্য-সন্ধানের পথ।’ বস্তুত বঙ্কিমচন্দ্রকে নতুন আলোয় ব্যাখ্যার এ প্রভাব পরবর্তীকালে মোহিতলাল মজুমদার, সুবোধচন্দ্র সেনসহ অনেক বঙ্কিম-সমালোচককে প্রভাবিত করে থাকবে।
  রবীন্দ্রনাথকেও শশাঙ্কমোহন সেন বৈশ্বিক মানদ-ে মূল্যায়ন করেছেন। অধিকিন্তু রবীন্দ্রনাথ তখনো আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি লাভ করেননি। সেই ১৯০৫ সালেই শশাঙ্কমোহন সেন রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বসাহিত্যোর প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করতে শুরু করেন এবং মনে করতেন রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যর অঙ্গনে স্থান করে নেবে।

এবং এ কারণে বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্র-সাহিত্যেকে মূল্যায়ন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। রবীন্দ্রপ্রতিভা যে বহুমুখিনতার দিকে প্রসারিত হচ্ছে তা তিনি ওই সময়ই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের বিচার করিতে হইলে কেবল তাঁহার ভিতর যাহা আছে, দেখিয়্ইা বিচার করিতে হইবে না; অন্যের সঙ্গে তুলনা করিয়া, যাহা তাঁহার মধ্যে নাই তাহাও বিশেষভাবে দেখিতে হইবে।

বলা বাহুল্য এইরূপ অন্বয়ী এবং ব্যতিরেকে গুণ-বিচার ব্যতীত কোন কবির সমালোচনাই সম্পূর্ণতা লাভ করিতে পারে না। এইরূপ বিচারেই প্রকৃত রবীন্দ্রনাথের শক্তি এবং ওই শক্তির বিশিষ্টতা কিংবা সীমা বুঝা যাইবে। বঙ্গসমাজের একটা বিশিষ্ট ধনী পরিবার এবং ওই পরিবারজাত একটা বিশিষ্ট ৎবভরহবসবহঃ বা ভব্যতা, সর্বোপরি নিজের স্বভাবসিদ্ধ একটা চিত্র এবং সঙ্গীতের প্রতিভা এবং দার্শনিকতা – এই কয়টি ঘটনার ঘনফল বিশেষভাবে চিন্তা না - করিলে রবীন্দ্রনাথকে বঝিতে পারা যাইবে না।

এই কয়টি ঘটনাই তাঁহাকে মুখ্যভাবে গঠন করিয়াছে; এবং আধুনিক ইউরোপের একটা বিশেষ সাহিত্য-রীতির অভিনিবিষ্ট অধ্যয়ন উহার সাহায্য করিয়া এদেশের পূর্ব-সূরিগণের সঙ্গে নানাদিকে তাঁহার পার্থক্য ঘটনা করিয়াছে। পূর্ব কবিগণের, কিংবা সাহিত্য জগতের ‘সামান্য লক্ষণ’ বিজ্ঞাপক অনেক কিছুই তাঁহার মধ্যে নাই।

উহা নানাদিকে একটা ঐকান্তিক ‘বিশেষত্বজীবী’ প্রতিভা; কোনো কোনো দিকে সহজে অনুকরণীয় বলিযা প্রতীয়মান হইলেও, অনেকে দিকেই সমস্ত অনুকরণ -চেষ্টার বাহিরে।’ (বঙ্গ সাহিত্যের বিকাশ) মূলত শেক্সপিয়ার, দান্তে, গ্যাটে, হুগোর মধ্যে যে বহুমুখীন প্রতিভর সমন্বয় ছিল শশাঙ্কমোহন রবীন্দ্রাথের মধ্যেও সে বহুমখী প্রতিভার স্ফুরণ দেখেছিলেন। 
রোমান্টিক কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে প্রথমেই শশাঙ্কমোহন চিহ্নিত করেছিলেন। তবে রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনি শর্তহীনভাবে মাথা নোয়াননি। রবীন্দ্রনাথের অনেক সাহিত্য-কর্মের মধ্যে যে অতিভাষণ ছিল শশাঙ্কমমোহন তা নির্দ্ধিধায় প্রকাশ করার সাহস দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কখন বা রবীন্দ্রনাথের ভাষা ও ছন্দ ভাবকে আবৃত ও আচ্ছন্ন করিতেছে! সোনার তরী ও চিত্রা হইতে আরম্ভ করিয়া গীতাঞ্জলি ও খেয়ার মধ্যস্থিত সংগীত ও চিত্র ধর্মাক্রান্ত অনেক কবিতা তাহার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ছন্দের নৃত্য, ভাষার ঝঙ্কারে, সংগীততন্ত্রীয় আবেগে, ভাবের সুচিক্ষণ রশ্মি বা অর্থ ডুবিয়া গিয়োছে; অনকে স্থলে অস্তিত্ব এবং সঙ্গতি পর্যন্ত অনুভব করা দায় হইয়াছে । ভাষা ও ছন্দোবন্ধের উপর অতিমাত্রায় দখল জন্মিলে, সচারাচর অনেক কবির যে দোষ ঘটিয়া থাকে, রবীন্দ্রনাথের পক্ষেও তাহার বিপর্যয় ঘটে নাই। এই জাতীয় অনেক কবিতা বাহুল্যময়, অতিরঞ্জিত ও অতিভূষিত।

তিনি মহৈশ্বর্যশালী চিত্রকর; তাঁহার ভাবুকতার বর্ণ ভাল্ডার অপরিমেয়.. ..আঁকিতে আঁকিতে তিনি ভাবের বশে এত আত্মহারা হইয়া পড়েন যে, স্থানে স্থানে বুঝি তুলি দূরে নিক্ষেপপূর্বক সমস্ত ভা-টি রিক্ত করিয়াই নিষ্কৃতি লাভ করেন।..,.. সূক্ষ্মদর্শী সমালোচকের চক্ষে তাঁহার (এই জাতীয়) বহু কবিতার মাহাত্ম্য হয়ত উত্তর কালে কমিয়া যাইবে। কিন্তু চিরকাল মনে রাখিত হইবে, এ-জাতীয় কবিতা ‘চিত্র-কবিতা’ বা ‘গীত-কবিতা’ ।

.. ,..তাঁহার সৌন্দর্য ইন্দ্রজালের অল্পাংশ মাত্র সুবিচার বুদ্ধির রাজত্ব মধ্যে বিস্তৃত; বেশি অংশই স্নায়ুলোকে; অথবা অব্যক্ত লোকে।’ (বঙ্গ সাহিত্যের বিকাশ) মূলত রবীন্দ্র-সাহিত্যকে বিচিত্রভাবে বিচিত্র করে এবং নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করেন শশাঙ্কমোহন। এক্ষেত্রে তিনি বুদ্ধদেব বসু এবং আবু সয়ীদ আইয়ুবের পূর্বসুরি।
  বাংলা ছন্দে প্রবোধকুমার সেনের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলা ছন্দের ভুবনে প্রবোধকুমারের অবদানকে অস্বীকার না করেও বলা যায়- শশাঙ্কমোহনের  মাধ্যমেই বস্তুত বাংলা ছন্দের সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়। শশাঙ্কমোহনের এ অবদানকে প্রবোধকুমার সেনও অস্বীকার করেননি। তিনি বলেছেন, ‘১৩২১ সালের গোড়ার দিকে বাংলা সাময়িক পত্রিকায় পরপর তিনটি ছন্দ-আলোচনা প্রকাশিত হয়।

এই তিনটির মধ্যে কবি শশাঙ্কমোহন সেনের ‘বাংলা ছন্দ’ প্রবন্ধটি (১৩২০ চৈত্র ২৭ তারিখে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে পঠিত) বোধ করি অগ্রণীত্বের অধিকারী। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশের প্রকাশের (১৩২১ আষাঢ়) সঙ্গে সঙ্গে আগ্রহ নিয়ে প্রবন্ধটি নিজেও বারবার পড়েছি সহপাঠী বন্ধুদের পড়ে শুনিয়েছি এবং ব্যাখ্যা করে বোঝাতে চেষ্টা করেছি।’ (প্রবোধচন্দ্র সেন, নতুন ছন্দ পরিক্রমা)
  বাংলা-ইংরেজি-সংস্কৃত সাহিত্যে বৈদগ্ধেদীপ্ত শশাঙ্কমোহন সেন  বাংলা-সমালোচনা সাহিত্যকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর প্রতিটি সমালোচনা তথ্যে পূর্ণ, তত্ত্বে ঋদ্ধ এবং বিশ্লেষণে আতিশয্যরহিত। তাঁর সমালোচনার পদ্ধতি পরবর্তীকালে মোহিতলাল মজুমদার, বুদ্ধদেব বসুসহ অনেককে প্রভাবিত করেছে। দীর্ঘদিন শশাঙ্কমোহন সেন পাদপ্রদীপের আলোয় না আসলে বাংলা তুলনামূলক সাহিত্য-সমালোচনা মূলত তাঁর হাত দিয়ে শুরু হয়। 
সার্ধশতজন্মবর্ষে শশাঙ্কমোহন সেনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

(শশাঙ্কমোহন সেনের উদ্ধৃতিগুলো নেওয়া হয়েছে ড. অনুপম সেনের 
‘কবি-সমালোচক শশাঙ্কমোহন সেন’ গ্রন্থ থেকে) 
সহায়ক গ্রন্থ : ১. অনুপম সেন, কবি-সমালোচক শশাঙ্কমোহন সেন

×