ঐতিহাসিকদের মতে চট্টগ্রাম শহরের বয়স প্রায় এক হাজার দুই শ’ বছরেরও বেশি। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে আরব, ইউরোপীয় বণিকরা ব্যবসায়িক কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর ফেলেছিল। বিশ্বে যে কয়টি চলমান বন্দর আছে, চট্টগ্রাম বন্দর তাদের অন্যতম। বিশ্বের অনেক দেশের বন্দর অকার্যকর হয়েছে কালের পরিক্রমায়। চট্টগ্রাম বন্দর এখনও স্বমহিমায় জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার এই চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সারাদেশে সুষম উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করছে সরকার। দেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অংশ হিসেবে বন্দরনগরী চট্টগ্রামকে কার্যকর বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে। চট্টগ্রামের স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনতে শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে যানজট নিরসন, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে খাল খনন, পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কারে বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে আগামী ১০০ বছরের কথা চিন্তা করেই চট্টগ্রাম মহানগরীর যানজট সমস্যা সমাধানে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, আউটার রিং রোড, কর্ণফুলী টানেলসহ উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। সরকারের গৃহীত মেগা প্রকল্প বদলে দিচ্ছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম! উন্নত সমৃদ্ধ আধুনিক চট্টগ্রাম এখন আর স্বপ্ন নয়!
কর্ণফুলীর মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন
ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপত্তি কর্ণফুলী নদী। এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার কাছে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। দেশের লাইফ লাইন খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণ কর্ণফুলী নদী। বঙ্গোপসাগর থেকে জোয়ারের সময় এ নদী দিয়ে বন্দরের মূল জেটিতে জাহাজ আনা-নেয়া হয়। ফলে বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত খননের পাশাপাশি প্রয়োজন পড়ে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চ্যানেলের নাব্য-ড্রাফট ঠিক রাখা। প্রধানমন্ত্রী পটিয়ার জনসভায় ‘সদরঘাট টু বাকলিয়া চর ড্রেজিং’ প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন। বছরের পর বছর ৬৫ লাখ মানুষের এ নগরের অপরিশোধিত বর্জ্য, পাহাড়ী বালু, প্লাস্টিক সামগ্রীতে ভরা নদীর তলদেশে ড্রেজিং অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কারণ, বর্ষা মৌসুমে এ নদীর নাব্যর ওপর নির্ভর করে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের বিষয়টিও। নদীর গভীরতা কমে গেলে পানি ধারণক্ষমতা যেমন হারিয়ে ফেলে তেমনি বৃষ্টি, পাহাড়ী ঢলের পানি দ্রুত নামতেও পারে না। আবার জোয়ারের পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উজানে রুই-কাতলা-মৃগেল-কালীবাউশ মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের জন্য বিখ্যাত হালদায় মা-মাছ, ডলফিনসহ বিভিন্ন জাতের জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। সর্বোপরি চট্টগ্রামকে আধুনিক বিনিয়োগবান্ধব সমৃদ্ধ পর্যটন নগরীতে রূপান্তরের অংশ হিসেবে কর্ণফুলী নদীর ক্যাপিটাল ড্রেজিং কার্যক্রমের সূচনা করা হয়। ইতোমধ্যে কর্ণফুলী ড্রেজিংয়ের জন্য হল্যান্ড থেকে ১৩০ কোটি টাকার ড্রেজার ও সরঞ্জাম আনা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীর মাস্টারপ্লান প্রণয়ন বাস্তবায়নের কাজে দ্রুত এগোতে চায় সরকার। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে কর্ণফুলী নদীসহ ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর দখল-দূষণ ও নাব্য রোধে উচ্চপর্যায়ে মাস্টারপ্লান কমিটি গঠন করা হয়।
চট্টগ্রামে হাইটেক পার্ক
দেশব্যাপী আইটি পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রামেও তিনটি হাইটেক পার্ক নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামে তথ্য-প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি আইসিটি খাতে আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রস্তাবিত একটি স্থান, নগরীর কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকায় হাইটেক পার্ক নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত জায়গা পরিদর্শন করেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী। বিসিক শিল্প এলাকার বিএফআইডিসি রোড সংলগ্ন প্রস্তাবিত জায়গাটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব জায়গা। প্রস্তাবিত জায়গা পরিদর্শনে সন্তোষ প্রকাশ করে মন্ত্রী নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু করতে উপস্থিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। জানা যায়, হাইটেক পার্কের জন্য প্রস্তাবিত জায়গা নিয়ে ইতিপূর্বে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাছাড়া আগ্রাবাদে চসিকের নিজস্ব একটি মার্কেট ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। মার্কেটটির ষষ্ঠ থেকে দশম তলা পর্যন্ত ফ্লোরে হাইটেক পার্ক নির্মাণ করবে কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রামে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জনসাধারণের মাঝে ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতকরণে এই পার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
চট্টগ্রামে মেট্রোরেল
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরু করার পর চট্টগ্রাম মহানগরীতে মেট্রোরেল চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে যৌথ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ডিজাইন কর্পোরেশন-মজুমদার এন্টারপ্রাইজ সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে চায়না কোম্পানি ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড ট্রেন নেটওয়ার্কে চট্টগ্রাম মহানগরীকে যুক্ত করে মেট্রোরেল চালুর ক্ষেত্রে কোন সমস্যা নেই বলে জানিয়েছে। এ নিয়ে স্বপ্নের কথা শুনিয়েছে যৌথ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি । আগামী মাস থেকে তারা এ বিষয়ে চট্টগ্রামে কাজ শুরু করবে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ ব্যাপারে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের পরই মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হবে। ঢাকা শহরে মেট্রোরেল চালুর পাশাপাশি ঢাকা চট্টগ্রাম রুটে হাই স্পিড ট্রেন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ঢাকা চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালানোর ব্যাপারে সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। সমীক্ষায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালুর জন্য প্রস্তাবিত রেলপথের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ২৩৩ কিলোমিটারে নামিয়ে আনার বিষয়টি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। হাইস্পিড ট্রেনের গতি হবে সর্বোচ্চ ৩০০ কিলোমিটার। এই ট্রেনে মাত্র ৫৫ মিনিটেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসা যাবে। আগামী বছর নির্মাণ কাজ শুরু হলে ২০২৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালানো যাবে। চায়না রেলওয়ে ডিজাইন কর্পোরেশন-মজুমদার এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে সমীক্ষা রিপোর্ট উপস্থাপনের পর চট্টগ্রাম মহানগরীকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়টি সামনে আসে। ঢাকা থেকে মাত্র ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামে পৌঁছার পর স্টেশন থেকে ইপিজেড যেতে যদি তিন ঘণ্টা লাগে তাহলে হাইস্পিড ট্রেন চালুর পুরো প্রকল্পটির উদ্দেশ্যই অর্থহীন। এই অবস্থায় ঢাকায় যেমন চল্লিশ মিনিটে চার ঘণ্টার পথ পাড়ি দেয়ার জন্য মেট্রোরেল চালু করা হচ্ছে তেমনি চট্টগ্রামেও ৫/১০ মিনিটের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছার জন্য হাইস্পিড মেট্রোরেল চালুর পরামর্শ দিয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। বিপুলসংখ্যক মানুষের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। হাইস্পিড ট্রেনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ঢাকা শহরে মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এক্ষেত্রে চট্টগ্রামকে মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের বাইরে রাখার কোন সংযোগ নেই। যৌথ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রাম মহানগরীর কোন কোন এলাকাকে রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে হবে, রেললাইনের নকশা কি হবে, কত জোড়া রেল চলাচল করবে বা পুরো প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হবে তা বিস্তারিত উল্লেখ করে সমীক্ষা রিপোর্ট প্রদানের পর বন্দরনগরী চট্টগ্রামের আলাদা বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামে গণপরিবহনের সঙ্কট অনেকাংশে কেটে যাবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি
কর্ণফুলী নদীর মোহনায় বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ‘চট্টগ্রাম বন্দর’। দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের প্রসার ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বিশেষ অবদান রাখছে চট্টগ্রাম বন্দর। প্রবৃদ্ধি অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বর্তমান সরকার চট্টগ্রাম বন্দর কেন্দ্রিক ৩০ বছরব্যাপী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে আছে সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নও। গত কয়েক বছরে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এর পরিমাণ বাৎসরিক ১২-১৪% হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে বন্দর ৭০০ কনটেনার হ্যান্ডলিং করত সেটি এখন ২৮ লাখ কনটেনার হ্যান্ডলিং করছে। ২০১৪ সালে কন্টেনার হ্যান্ডেলিং হয় ১৭ লাখ, ২০১৫ সালে ২০ লাখ, ২০১৬ সালে ২৩ লাখ এবং ২০১৭ সালে তা ২৬ লাখে উন্নীত হয়েছে। চলতি ২০১৮ সালে ৩০ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক বন্দরগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে পরিচিতি পায়। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দশ বছরে ২৮ ধাপ উন্নীত হয়ে ৭০তম অবস্থানে চট্টগ্রাম বন্দর। ফলে গত কয়েক বছর যাবত চট্টগ্রাম বন্দরের গ্রোথ ডাবল ডিজিটে উন্নীত হয়েছে । প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রবল আগ্রহে বন্দরের সর্বস্তরে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে বন্দরের অটোমেশন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে। সংস্কার করা হয়েছে পুরনো বন্দর আইনের। চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকার কর্ণফুলী কন্টেইনার টার্মিনাল, পতেঙ্গা কন্টেনার টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল ও বে টার্মিনাল নির্মাণ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। স্বয়ংক্রিয় কন্টেইনার অপারেশন নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সিটিএমএস এবং বন্দরে নিরাপদে জাহাজ যাতায়াত ও বহির্নোঙ্গরে অবস্থানকালে জাহাজগুলোকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করার জন্য আধুনিক ভিটিএমআইএস চালু করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কার্যক্রম ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
চলবে...
লেখক : শিক্ষাবিদ ও গবেষক
[email protected]

