ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

অরবিন্দ মৃধা

নব জাগরণের কবি

প্রকাশিত: ০৯:৪৬, ২৪ জানুয়ারি ২০২০

নব জাগরণের কবি

মধ্যযুগের জীবনধারা, শ্রীচৈতন্য প্রভাবিত কাব্যসাহিত্য, সামাজিক শাসন, শাস্ত্রের বন্ধন, কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে ব্রিটিশ রাজত্বকালে ভারতের বিশেষ করে তৎকালীন বঙ্গদেশে উনবিংশ শতকে সমাজ, শিক্ষা, ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে জোয়ার জাগে। ব্রিটিশ ভাবধারায় আধুনিক শিক্ষার প্রভাবে বাংলায় যোগাযোগ শিক্ষা, মুদ্রণসহ নানা ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী পরিবর্তন সৃষ্টি হয় তাকে নবজাগরণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পাশ্চাত্য ধারার শিক্ষার প্রভাবে বহু কৃতী মনীষীর আবির্ভাব ঘটে। বাংলা বাঙালীর নবজাগরণ বলতে মূলত এই সময়টাকে বুঝানো হয়। রাজা রামমোহন রায় (১৭৭৫-১৮৩৩), দারকানাথ ঠাকুর (১৭৯৪-১৮৪৭), রানী রাসমনি (১৭৯৩-১৮৬১), মরমী ধারার সমাজচুৎ ফকির লালন শাহ (১৭৭২-১৮৯০), গোঁসাই কুবীর (১৭৮৭-১৮৭৯) প্রমুখ মূলত এ ধারায় প্রথম বাঙালী পথিকৃৎ। মধুসূদন দত্ত এঁদের মধ্যে অন্যতম, তাঁর জীবনকর্মও বর্ণাঢ্যময়। রামমোহন রায় থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত নবজাগরণের শুরু এবং শেষ সময় ধরা হয়। এই সময়ে সমাজ সংস্কার, ধর্মীয় দর্শন, সাহিত্য সংস্কৃতি, দেশপ্রেম, বিজ্ঞানচিন্তা, প্রত্নতাত্ত্বিক ভাবনা, সাংবাদিকতাসহ নানা বিষয়ভিত্তিক পথিকৃৎতুল্য ব্যক্তির সমাহার ঘটে। তাঁদের জ্ঞান দর্শন ও মতবাদের ফলে মানুষ মধ্যযুগের অবসান ঘটিয়ে আধুনিক যুগের সূচনা করে। ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলায় শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে। ইউরোপীয় ধারায় প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা, গণমুখী সাহিত্যচর্চা, মুদ্রণযন্ত্রের প্রচলন বিলেতি ভাবধারায় পোষাক-আশাক, চালচলন অনুকরণে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। শিক্ষিত সম্প্রদায়ের জীবন ও বিশ্বাসে অনুসন্ধিৎসু, বস্তুতান্ত্রিক প্রভাব পড়ে। ফলে বাঙালী মানসে নবজাগরণ সূচিত হতে থাকে। ধর্মীয় গোড়ামী এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। মানুষ প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু করে। রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। সমাজ সংস্কার আন্দোলন, সমিতি, সংগঠন, নানা নামে রাজনৈতিক সামাজিক অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টাই নবজাগরণের দৃষ্টান্ত। ইংরেজী ভাষায় ইউরোপীয় ভাবধারায় শিক্ষিত রাজারাম মোহন রায় নবজাগরণের ব্যক্তিবর্গের মধ্যে অন্যতম। হিন্দু কলেজের ইংরেজ শিক্ষক ডি, রোজারিও, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের উইলিয়াম কেরী তাঁর বিপ্লবী শিষ্যগণ একাজে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। লালন ফকির, কুবীর গোঁসাই শিক্ষিত সমাজের বাইরে থেকে তাঁদের ভাব ধারার শিষ্যদের মাধ্যমে গানে গানে সমাজের কুসংস্কার ছুৎমার্গের বিরুদ্ধে পল্লীবাসীর মধ্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেন। শিক্ষা-সাহিত্য জ্ঞান চর্চায় বাঙালী নবজাগরণে বিপ্লবী ভূমিকা রেখেছেন সমাজ সংস্কারক, বাংলা গদ্য সাহিত্যকার শিক্ষা বিস্তারকারী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০-১৮৯১), বাংলা নাটক ও বাংলা সনেটের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সাহিত্য স¤্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, (১৮৩৮-১৮৯৩), মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫), অক্ষম কুমার দত্ত, কেশব চন্দ্র সেন (১৮৩৮-১৮৮৪), ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮২০-১৮৯১), স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২), কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-১৮৯৬), গিরিশ চন্দ্র ঘোষ; (অনুবাদ) রাজনারায়ন বসু (১৮২৬-১৮৯৯), নবাব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩), মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১), শিবনাথ শাস্ত্রী (১৮৪৭-১৯১৯), প্যারীচাঁদ মিত্র, তারাচরণ বন্দোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩) প্রমুখ। এছাড়া বিংশ শতকের অসংখ্য গুণীব্যক্তিবর্গ নবজাগরণে ভূমিকা রাখেন। ইংরেজী শিক্ষার প্রভাবে শিক্ষিত হয়ে মনীষীতুল্য বাঙালীগণ পাশ্চাত্য চিন্তাধারায় উজ্জীবিত হয়ে মানবতাবাদ, জাতীয়তাবাদ, বিজ্ঞানচিন্তা, মুক্তিবাদ, সমাজবাদ ও অন্যান্য বিষয়ে মতবাদ প্রকাশের মাধ্যমে জাগরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। তাঁরা ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রধান ব্যক্তিবর্গ যেমন- আইজ্যাক নিউটন (১৬৪২-১৭২৭), টমাস পেইন (১৭৩৭-১৮০৯), জেরেমি বেনথাম (১৭৪৮-১৮৩২), চালর্স ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২), জন স্টুয়ার্ট মিলসহ পাশ্চত্যের বহু চিন্তাবিদ ও মনীষীর অনুসারী হয়ে ওঠেন। উনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালী মানসে শিক্ষা-সংস্কৃতি চেতনা বোধের যে ঝলকানি বয়ে যায়, সেই ঝলকানিতে মধুসূদন এক নতুন মহিমায় দীপ্ত হয়ে ওঠেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মানব কল্যাণে আত্মনিয়োগ করেন। সামাজিক গোড়ামী আচার আচরণের বিরুদ্ধে মানুষ নতুনভাবে জীবন পরিবেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। রাজা রামমোহন রায় তাঁর জ্ঞানের ভান্ডার উজাড় করে বিশুদ্ধ যুক্তিবাদ, মানবতা বাদের মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কার কাজে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হন। বাঙালী জীবনের নানা ক্ষেত্রে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনীতিকসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে নবজাগরণের বাণী বাঙালী জাতিকে সম্মুখপানে এগিয়ে যাওয়ায় অনুপ্রাণীত করে। ইংরেজী শিক্ষা বিস্তারের ফলে মানুষের ধর্মীয় জড়তা, ছুৎমার্গ, ভেদবুদ্ধি অতিক্রম করে মানুষ সাহসী ও সক্ষম হয়। সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় শুধুমাত্র ধর্মীয় ভাবধারার বাইরে এসে বাস্তবমুখী সাহিত্যচর্চা, বাঙালী মানসে বিলেতি ভাবধারার চলন, ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে কোট-টাই-প্যান্ট এর ব্যবহার, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে ক্যাডারভিত্তিক চাকরিতে অংশগ্রহণ, শিক্ষায় বিস্তার, মুদ্রণযন্ত্রের আধুনিকায়ন, শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন, ব্যবসা বাণিজ্য শিল্প কলকারখানা প্রতিষ্ঠা, রেল সড়ক যোগাযোগে উন্নয়ন, শাসন ও বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের দ্বারা উনবিংশ শতাব্দীতে নব জাগরণ হয়। স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মান্দোলন, রামমোহনের সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান, ব্রাহ্মধর্মের প্রবর্তন, বিদ্যা সাগরের সমাজ সেবা মধুসূদনের নাট্য আন্দোলন, বাংলা ভাষায় সনেট, অমৃতাক্ষরছন্দ, রাম ঘোষের রাজনীতি চর্চা, বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য রচনা, দীনবন্ধু মিত্রের প্রতিবাদী নাট্য সাহিত্য রচনা সবই উনিশ শতকের নবজাগরণের ফসল। উনবিংশ শতাব্দীতে- বাংলা, বাঙালী, বাংলা ভাষা সংস্কৃতি জাগরণের অন্যতম পুরোধা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (জ. ২৫ জানুয়ারি ১৮২৪, মৃ: ২৯ জুন- ১৮৭৩ খ্রি:) বঙ্গদেশের প্রথম জেলা যশোহরের অন্তর্গত কেশবপুর উপজেলার কপোতাক্ষ তীরে সাগারদাঁড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা- রাজনারায়ণ দত্ত এবং মাতা- জাহ্নবী দেবী। পিতা- কলকাতা সদর দেওয়ানী আদালতে কর্মজীবী হিসেবে যথেষ্ট প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বাল্যকাল থেকে বিলাসবহুল জীবনে অভ্যস্ত মধুসূদন যৌবনে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পার্শ্চত্য সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করেন। জীবনের দ্বিতীয় পর্বে তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হন। মধুসূদন বাংলা ভাষায় সনেট ও অমৃতাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করে সাহিত্যে অনন্য অবদান রেখেছেন। মাইকেলের ব্যক্তিগত জীবন বর্ণাঢ্য, নাটকীয় এবং বেদনা বিধুর। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে তাঁর জীবনের শেষ প্রদীপ নিভে যায় কলকাতায়। তৎকালের হিন্দু কলেজ (প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ছিল বঙ্গদেশের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠ। ইংরেজ শিক্ষকদের শিক্ষাদান, আচার আচরণ এবং সাহিত্যপ্রীতি, পোশাক-আশাকে মুগ্ধ হয়ে তিনি অধ্যয়ন পর্বে মানসিকভাবে ইংরেজ কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশে প্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন। তিনি বিলাস-বসন, বাক পটুতা, বুদ্ধিমত্তায় ছিলেন অসাধারণ। কলেজের পরীক্ষায় তিনি বৃত্তি পেতেন, ইংরেজী কবিতা লিখতেন, ইংরেজী পত্রিকায় তা ছাপা হতো। কবি ওয়ার্ডস-ওয়ার্থ কে উৎসর্গ করে কবিতা লিখতেন। কবির বন্ধু গৌরদাস বসাকের ভাষায় “Nevertheless he was undeniably the Jupiter among the bright stars of the collage” ভোলানাথ চন্দ্র এঁর ভাষায় ‘Modu was the Jupiter.’ (মধুসূদন সম্পর্কিত স্মৃতিচারণ) মা জাহ্নবী দেবী ছিলেন মধুসূদন দত্তের চেতনা জাগরণের প্রথম শিক্ষক। মায়ের কাছে শিশুকালে তিনি রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতি গ্রন্থের পাঠোভ্যাস, শিক্ষা গ্রহণ করেন। জন্মস্থান সাগরদাঁড়ির পাশের গ্রাম শেখপুরা মসজিদের ইমাম লুৎফুল হকের কাছে তিনি ফার্সি, আরবি শিক্ষা লাভ করেছেন শিশু কালে। মধুসূদন তেরো বছর বয়সে কলকাতায় যান, স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে কিছুদিন অধ্যয়নের পর তৎকালীন হিন্দু কলেজে (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে অতি অল্প সময়ে তিনি- প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ডিএল রিসার্ডসন, অধ্যাপক ডিরোজিও সাহেবসহ অন্য শিক্ষকগণের প্রতি আকৃষ্ট এবং প্রিয় পাত্র হয়ে ওঠেন। এ সময় থেকে মধুসূদনের কাব্যচর্চা, দেশপ্রেম চর্চা শুরু হয়। কলেজে তাঁর সহাপাঠী রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক, ভুদেব মুখার্জী প্রমুখ ছিলেন সে যুগের খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালে মধুসূদন বড়মাপের ইংরেজ কবি হওয়ার এবং বিলেত যাওয়ার জন্য খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। মধুসূদন দত্ত ১৮৪৩ খ্রিঃ পাদ্রি ভিলটরির মাধ্যমে মিশনারী চার্চে গিয়ে খ্রিস্টিয়ান ধর্ম গ্রহণ করেন। এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায়। নতুন ধর্ম গ্রহণের পর পাদ্রী ভিলটরী তাঁর নামকরণ করেন ‘মাইকেল’। এ সময় থেকে তিনি ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ নামে পরিচিত হন। এই ঘটনার পর পিতা- রাজনারায়ণ দত্ত মধুসূদনকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর মাইকেল শিবপুর বিশপস কলেজ থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যান। এ সময়ে তাঁর পিতা চার বছর পর্যন্ত খরচ বহন করেন। এখানে কয়েকজন মাদ্রাজি ছাত্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। বিশপস কলেজে লেখাপড়া শেষ করে মধুসূদন কলকাতায় কর্মসংস্থানে ব্যর্থ হয়ে ভাগ্যন্নেষণে মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) চলে যান। এখানে সংসার ধর্ম কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। মধুসূদন ব্যারিস্টারী পড়ার জন্য ১৮৬২ খ্রিঃ মাঝামাঝি সময়ে ইংল্যান্ডে যান পুত্র-কন্যা সহ হেনরিয়েটাকে (স্ত্রী) কালকাতায় রেখে। ইউরোপে তিনি আর্থিক সঙ্কটে পড়লে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যা সাগরের সহযোগিতায় নিদারুণ বিপদ থেকে উদ্ধার পান। ১৮৬৫ খ্রিঃ ১৭ নবেম্বর তিনি ব্যারিস্টার স্বীকৃতি পান। মাইকেল মধুসূদন দত্ত মাদ্রাজে গিয়ে স্বল্প বেতনে একটি বিদ্যালয়ে ইংরেজী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পাশাপাশি ছদ্মনামে ইংরেজী পত্র পত্রিকায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। মাদ্রাজে তিনি একটি পত্রিকা সম্পাদনের কাজ করেন, কিন্তু অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এখানেই তিনি তাঁর ইংরেজী প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ক্যাপটিভ লেডি’ রচনা করেন। ইংরেজ কবি হিসেবে মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তাঁর বয়স ছিল পঁচিশ বছর। মাদ্রাজে আগমনের তিন বছর পর কবির মায়ের মৃত্যু হয়। মাদ্রাজ গমনের অল্প দিনের মধ্যে মধুসূদন অরফ্যান এসাইলমের বালিকা বিভাগের ছাত্রী রেবেকা ম্যাটাভিসকে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবন আট বছর স্থায়ী ছিল। তাঁদের দুই পুত্র ও দুই কন্যা সন্তান। মাদ্রাজ জীবনের শেষ প্রান্তে রেবেকার সঙ্গে মাইকেলের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। মধুসূদন ১৮৫৫ খ্রিঃ ২০ ডিসেম্বর বন্ধু গৌরদাস বসাককে লিখেছিলেন, ‘ও যধাব ধ ভরহব ঊহমষরংয রিভব ধহফ ভড়ঁৎ পযরষফৎবহ.’ ১৮৫৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি কলকাতায় পৌঁছান। (তথ্য : জীবন চরিত্র মাইকেল মধুসূদন দত্ত শ্রেষ্ঠ রচনা সমগ্র- সালাউদ্দীন বই ঘর, ৩৮ বাংলাবাজার : ঢাকা-১১০০) মাদ্রাজে অবস্থানকালে তিনি এমিলিয়া আরিয়েতা সোফিয়া নামে একজন ফরাসী তরুণীকে বিয়ে করেন। ইনি তাঁর শেষ জীবন পর্যন্ত সঙ্গিনী ছিলেন। কবির বন্ধু গৌরদাস বসাক একখানি ‘ক্যাপটিভ লেডী’ গ্রন্থ জেইডি বেথুনকে পড়তে দেন। তিনি ওই গ্রন্থের কাব্য রসে মুগ্ধ হয়ে মাইকেলকে দেশে ফিরে বাংলা ভাষায় কাব্য রচনার পরামর্শ দেন। এক পর্যায়ে তিনি কলকাতায় এসে বাংলা কাব্য সাধনায় মনোনিবেশ করেন, তবে আর্থিক অনটন তাঁর পিছু ছাড়েনি। কলকাতায় তিনি হাত খুলে নাটক, প্রহসন, কাব্য লেখা শুরু করেন। ১৮৬২ খ্রি: কিছুদিন তিনি ‘Hindo patriot’ নামে পত্রিকা সম্পাদন করেন। মধুসূদন ব্যারিস্টারী পাস করার পর কলকাতায় আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ১৮৭০ খ্রিঃ হাইকোর্টের প্রিভি কাউন্সিল অফিসে পরীক্ষকের কাজ করেন, কিন্তু বেতন স্বল্পতার কারণে কাজটি ছেড়ে দিয়ে ফের আইন ব্যবসা শুরু করেন। ১৮৭২ খ্রিঃ মানভুমে পঞ্চকোর্ট রাজ্যের আইন উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করেন। কয়েক মাসের মধ্যে আবারও ছেড়ে দেন। ফের আইন ব্যবসায় আসেন। কলকাতা থেকে মধুসূদন আইন বিষয়ে পড়ার জন্য ইংল্যান্ড যান কিন্তু আর্থিক অনাটন, আবহাওয়া, বর্ণবাদীতার কারণে টিকতে না পেরে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরে চলে যান ১৮৬০ খ্রিঃ। এখান থেকে চতুর্দশপদী সনেট বাংলাতেই প্রবর্তন করেন। মাতৃভাষা, মাতৃভূমির আদর, স্নেহ ভালবাসা কবিকে আপ্লুত করে রাখতো। এখানে বসে তিনি, অসংখ্য কবিতা, গীতিকবিতার মাধ্যমে তাঁর ভালবাসায় আকুলতার কথা ব্যক্ত করেছেন, যেমন- রেখ মা দাসেরে মনে এ মিনতি করি পদে, সাধিতে মনের সাধ ঘটে যদি পরমাদ, মধুহীন করোনাকো তব মনো কোকো নদে...। অথবা, হে বঙ্গ ভান্ডারে তব বিবিধ রতন তা সবে অবোধ আমি অবহেলা করি পরধন লোভে মত্ত করিনু ভ্রমণ...। বাংলা সাহিত্যে মৌলিক নাটকের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং সাহিত্যাঙ্গনে নাট্যকার হিসেবে পদচারণা শুরু হয়। রামনারায়ণ তর্করত্ন রচিত রত্নাবলী- নাটকের ইংরেজী অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি নিজে নাটক লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ১৮৫৯ খ্রিঃ মধুসূদন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক লেখেন বাংলা ভাষায়। ১৯৬০ খ্রিঃ বাংলা ভাষায় লেখেন দুটি প্রহসন- ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রো’ এবং ‘একেই কি বলে সভ্যতা’। নাটক লেখেন পদ্মাবতী তিনি পদ্মাবতীতে প্রথম অমৃতাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। এই বৎসর তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য গ্রন্থ লেখেন। ১৮৬১ খ্রিঃ মধুসূদন মেঘনাদ বধ মহাকাব্য, ব্রজঙ্গনা কাব্য, কৃষ্ণকুমারী নাটক লেখেন। ১৮৬১ খ্রিঃ বীরঙ্গনা কাব্য এবং ১৮৬৬ খ্রিঃ চতুদর্শপদী কবিতা লেখেন। মধুসূদন বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে নাটকের প্রতি পাইক পাড়ার জমিদারদের নাটকের প্রতি অনুরাগ অর্থ ব্যয় দেখে পাশ্চাত্য ধারার নাট্যশৈলী সংযোজন করে বাংলা নাটক প্রবর্তন করেন। তাঁর সাহিত্যে নারী উন্মেষ ঘটে এবং পুরাতন ধারাকে উল্টে প্রতিবাদী ধারার প্রবর্তন করেন। তিনি ১৮৭৪ খ্রিঃ মায়াকানন নামে একটি নাটক লেখেন যেটি অসমাপ্ত। মধুসূদন বাল্যকালেই বাংলার পাশাপাশি ফারসি ও আরবী ভাষা চর্চা করেন। তিনি ইংরেজী ছাড়াও ফারসি, হিব্রু, তামিল, তেলেগু লেটিন সংস্কৃতিসহ প্রায় বারোটি ভাষায় কথা বলতে পারতেন। তিনি ইতালি এবং ফার্সি ভাষায় কবিতা লিখতে পারতেন। তাঁর ভাষা চর্চা সম্পর্কে একটি চিঠিতে মন্তব্য করে গৌর দাসকে বলেছেন, ‘Perhaps you do not knwo that I devote Several hours daily to Tamil. ¸ life is more busy. Than that of a school boy. Here is my rout in: 6 to 8 Hebrew, 8 to 12 school. 12-02 Greek 2-5 Telegu and sanskrit. 5-7 latin. 7-10 English. এ থেকে বুঝা যায় মেধাবী এবং অধ্যবসায়ী মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন বহু ভাষাবিদ কবি। কবি লর্ড বায়রনের কবিতা মধুসূদনকে দারুণ ভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। বাঙালীর উপাখ্যান গ্রন্থ রামায়নের রাম-রাবণের যুদ্ধে রাবণকে দেশ প্রেমিক হৃদয়বান বীর যোদ্ধা হিসেবে এবং রামচন্দ্রকে পরদেশ আক্রমণকারী অন্যায়ই সমরে পুত্র মেঘনাদকে হত্যাকারী কাপুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করে বাঙালী মানসে স্বদেশ ভাবনার জাগরণ সৃষ্টি করেছেন এবং আক্রমণকারী ভিনদেশীদের অন্যায়, অবিচার, অত্যাচারের প্রতিবাদ প্রতিরোধ করার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। মধুসূদন মাদ্রাজ গিয়ে রেবেকা ম্যাটাভিস নামে এক ইংরেজ যুবতীকে বিয়ে করেন নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে। এ বিষয়ে তাঁর বন্ধু গৌর দাসকে লিখেছেন, ‘রেবেকাকে পেতে খুব ঝামেলা হয়েছিল, বুঝতেই তো পারছো তার সমস্ত শুভাকাক্সক্ষী এই বিয়ের বিরুদ্ধে ছিল।’... তাদের দাম্পত্য জীবন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নানা বিষয়ে মতবিরোধের কারণে ৭/৮ বছরেই তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। মাদ্রাজে অবস্থানকালে হেনরিয়েটা সোফিয়া নামে এক ফরাসী কন্যার সঙ্গে সম্পর্ক হয়। ইনিই মধুসূদনের সারাজীবনের সঙ্গিনী ছিলেন। হেনরিয়েটার গর্ভে জন্ম হয় নেপোলিয়ান নামে এক ছেলে এবং শরর্মিষ্ঠা নামে এক মেয়ে। তার বংশধরদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় লিয়েন্ডার পেজ। মধুসূদনের জীবন শিশুকাল থেকে বিত্তবৈভবের মধ্যে থেকে গড়ে ওঠে। ফলে তিনি দান-ধন, ভোগবিলাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। পিতা মাতা, পরিবেশের সামাজিক রীতিনীতির বন্ধনে তিনি আবদ্ধ হতে পারেননি। উচ্ছলতা, উচ্চাকাক্সক্ষা, বিলাসিতা, খ্যাতি, যশ পাওয়ার আশায় তিনি আমৃতকাল চেষ্টা ও পরিশ্রম করেছেন। দু’হাত উজাড় করে অর্থ ব্যয় করেছেন তাই বর্ণাঢ্যময় কর্মজীবনে অর্থাভাব কখনই তাঁর পিছু ছাড়েনি। অন্তিমকাল পর্যন্ত তিনি সাহিত্য সেবা করে গেছেন। অবশেষে রোগ শোকে ভুগে চরম হতাশা নিয়ে বাংলা কাব্য সাহিত্যের নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৭৩ খ্রিঃ ২৯ জুন মাত্র ৪৯ বছর বয়সে কলকাতার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।