মঙ্গলবার ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু অনুপস্থিত ছিলেন না -স্বদেশ রায়

বাংলাদেশের মুুক্তিয্দ্ধুকে অনেকে অনির্বাচিত কোন সশস্ত্র রাজনৈতিক শক্তির সশস্ত্র বিপ্লবের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। আর ওই সব বিপ্লবের নেতার কাজের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কাজকে তুলনা করে তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। কখনই তাঁরা বিচার করেন না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি দ্বারা পরিচালিত স্বাধীন দেশের অভ্যন্তর থেকে বিদেশী হানাদার শত্রু বিতাড়নের একটি যুদ্ধ। ২৬ মার্চ ১৯৭১ এ স্বাধীন হবার পর আমাদের ৯ মাস সময় লেগেছিল ওই শত্রুদের বিতাড়ন করতে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তাদের আমরা বিতাড়ন করতে সক্ষম হই বলেই ১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস।

২৬ মার্চ বাংলাদেশের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, ওই ঘোষণাই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের ভিত্তিভূমি; অর্থাৎ ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে ভিত্তি ধরে ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ ঘোষণা পত্র বা বাংলাদেশের সংবিধানের মাতৃকোষ ঘোষিত হয় ও স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। এই ঘোষণা পত্রের ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ সংবিধান রচিত হয়। ১৯৭১ সালে ৯ মাস বাংলাদেশে যে যুদ্ধ হয় তা ছিল নিজ স্বাধীন দেশকে হানাদার বাহিনী থেকে মুক্ত করার যুদ্ধ। নির্বাচনের ভিতর দিয়ে আসা একটি স্বাধীন দেশের সকল মানুষ এই যুদ্ধ করে।

স্বাধীন বাংলাদেশ নামক যে দেশটি ২৬ মার্চ ১৯৭১ সালে জন্ম নিল এই দেশ বা রাষ্ট্রটি যে নির্বাচনের ভিতর দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত তা স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র বা বাংলাদেশের সংবিধানের মাতৃজনন কোষে স্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত। সকলেই জানি, স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রের সারাংশটি এমনই, ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯ ডিসেম্বরের ভিতর অনুষ্ঠিত যে নির্বাচন হয় ওই নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের ভিতর ১৬৭ আসনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা পাকিস্তানে একটি সরকার গঠন করার জন্যে তাঁদের শেষ চেষ্টাটি পর্যন্ত তাঁরা করেছিলেন। কিন্তু জনগণের হয়ে জনপ্রতিনিধিদের সেই সরকার গঠন করতে দেয়া হয়নি। বরং তাদের ওপর অবিচারমূলক যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানের সামরিক সরকার ইয়াহিয়া। এই গণহত্যা শুরু ও যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়ার পরেই বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত নেতা হিসেবে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। হানাদারদের বিরুদ্ধে সকলকে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সেটাকেই স্বাধীনতা ঘোষণা পত্রের মাধ্যমে সকল জনপ্রতিনিধি বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে বৈধ ঘোষণা হিসেবে মেনে নেন। আর বঙ্গবন্ধু ঘোষিত স্বাধীন দেশের জন্যে সরকার গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুকে ওই সরকারের প্রধান অর্থাৎ রাষ্ট্রপতিও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বৈধ সরকার তখন দেশের ওপর ওই ঘোষণা পত্র অনুযায়ী সকল আইন প্রণয়ন ও রাজস্ব সংক্রান্ত সকল অধিকার পায়।

অর্থাৎ ২৬ মার্চ যে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষিত হয় ওই রাষ্ট্রটি ১০ এপ্রিল থেকে তাদের সংবিধান ও বৈধ সরকার নিয়ে যাত্রা শুরু করে। রাষ্ট্রটির জন্য তখন পথ চলতে দুুটি মাত্র বাধা থাকে। এক. রাষ্ট্রটির অভ্যন্তরের বেশ কিছু স্থান তখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী দখল করে রেখেছে। দুই. রাষ্ট্রটির জন্য অন্য রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দরকার। এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য দুটি বিষয় জরুরী ছিল। এক. যারা এই রাষ্ট্র গঠন করেছে তাদের প্রমাণ করতে হবে তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়। দুই. রাষ্ট্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে কিনা? কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অন্য একটি গণতান্ত্রিক নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে গেলে প্রথমেই দেখতে হয় যারা নতুন রাষ্ট্র গঠন করেছেন বলে দাবি করছেন, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী কিনা? যদি তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রমাণিত না হয় তাহলে স্বীকৃতি পাবার ৭০ ভাগ শর্ত তারা পূরণ করে।

বাংলাদেশের এই পাকিস্তানী হানাদার বিতাড়নের যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু যদি পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতেন বা আন্ডার গ্রাউন্ডে গিয়ে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের মতো যুদ্ধ পরিচালনা করার চেষ্টা করতেনÑ তাহলে পাকিস্তানের সামরিক শাসক তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণ করার যথেষ্ট সুযোগ পেত। কিন্তু তাঁর দেশ আক্রান্ত হবার পরে বঙ্গবন্ধুৃ নিজ বাসভবন (যা তখন তাঁর অফিস হিসেবেও ব্যবহৃত হতো) সেখানে বসেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর মানুষকে আক্রমণকারীদের প্রতিহত করার আহ্বান জানান এবং বিশ্ববাসীর কাছে ওই নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি চান। এই ঘোষণা ও স্বীকৃতি চাওয়ার কাজটি ছিল প্রকাশ্যে এবং নির্বাচিত নেতা হিসেবে। তাই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যখন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে তখন তাঁরা একটি স্বাধীন দেশের নির্বাচিত সরকার প্রধানকে গ্রেফতার করে। এই গ্রেফতারের ভিতর দিয়ে পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেরাই বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে প্রমাণিত হয়। বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেন, তিনি বা তাঁর দল বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে এভাবে গ্রেফতার হবার ভিতর দিয়ে, স্বাধীনতা ঘোষণার পরে এই দেশটির আর বাকি যে বিজয় অর্জন করার ছিল তার ৭০ ভাগ তিনি একাই করলেন। অর্থাৎ তিনি বিশ্ববাসীর কাছে প্রমাণ করলেন, তিনি ও তাঁর দল বিচ্ছিন্নতাবাদী নয়, তাঁরা মূলত নিজস্ব ভূমি থেকে হানাদার মুক্তির জন্য যুদ্ধ করছেন।

গ্রেফতার হবার ভিতর দিয়ে যে আন্দোলন, সংগ্রাম বা যুদ্ধ থেকে কোন নেতা অনুপস্থিত থাকেন না তাঁর প্রমাণ এর আগেও বঙ্গবন্ধু আগরতলা মামলার ভিতর দিয়ে করেছেন। ওই মামলায়ও তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বানানোর চেষ্টা হয়েছিল। জেলখানায় বসেই তিনি তাঁর মানুষের আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান থেকে বঙ্গবন্ধু হিসেবে জেল থেকে বের হয়ে আসেন। পাকিস্তানী জান্তা তাকে ও তার সহযোদ্ধাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। ১৯৭১-এর ৯ মাসেও পাকিস্তানের জেলে যাবার ভিতর দিয়ে তিনি যেমন ৭০ ভাগ যুদ্ধে জিতিয়ে দেন বাঙালীকে তেমনি জেলে বসেও তিনি আগরতলা মামলার মতো নিজেকে রূপান্তরিত করেন। তাঁর আকৃতি আরও বিশাল হয়। আগরতলা মামলায় জেলে থেকে শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু হন, আইয়ুবের পতন ঘটে তাকে ফাঁসি দিতে গিয়ে। কিন্তু তারপরেও পাকিস্তানী সামরিক শাসকরা জনগণের নেতার শক্তি বুঝতে পারেনি। তারা ১৯৭১ সালে আরও বড় আকৃতির বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়, একটি দেশকে অন্যদেশের কারাগারে রাখা যায় না। ইয়াহিয়া যখন বঙ্গববন্ধুকে গ্রেফতার করে ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক শব্দ। তাই তারা বাংলাদেশকে লায়ালপুর জেলে ভরতে গিয়ে গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়। সমস্ত গণতান্ত্রিক বিশ্ব বলে, নির্বাচিত নেতাকে গ্রেফতার করার অধিকার পাকিস্তানী সামরিক কর্তৃপক্ষের নেই। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও তাঁর সিনেটে তিনি বার বার বাধাগ্রস্ত হন পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থনের বিল আনতে। সেদিনের পত্র পত্রিকার খবরগুলো দেখলে আজকের তরুণ প্রজম্ম বুঝতে পারবে, বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারকে সে সময়ে অনেক দেশ প্রকাশ্যে স্বীকার করে বিবৃতি দিতে না পারলেও তারা এটা জোরের সঙ্গে বলে, নির্বাচিত নেতাকে গ্রেফতারের পক্ষে তারা কেউ নয়। এ কথাও সকলে বলেন, একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই তাঁর দেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকারী। পাকিস্তানী সামরিক কর্তৃপক্ষ নয়। তাই মুক্তিযুদ্ধে যেমন বজ্রকণ্ঠের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের রাইফেলে, মাইনে, গ্রেনেডে সবখানে ছিলেন বঙ্গবন্ধু তেমনি আন্তর্জাতিক বিশ্বে প্রায় এককভাবে লড়াই করেন গ্রেফতার হওয়া নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

যে কোন মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম যেমন দেশের মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে হয় তেমনি তার সঙ্গে সহযোদ্ধা হিসেবে দাঁড়ায় গোটা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষ। গোটা পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষকে সেদিন বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানোর নায্যতা দিয়েছিলেন বন্দী স্বাধীন রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জনগণের কূটনীতিতে সেদিন ইয়াহিয়াকে পরাজিত করেছিলেন বন্দী বঙ্গবন্ধু। অর্থাৎ নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে, সশস্ত্র পথে হানাদার তাড়ানোর যুদ্ধে সেদিন বঙ্গবন্ধুর ডিপ্লোম্যাসির কাছে হেরে যায় পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ। বিজয়ী হন বঙ্গবন্ধু, রূপান্তরিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে।

পৃথিবীতে বাংলাদেশের এই নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে হানাদার বিতাড়নের মুক্তিযুদ্ধ হবার আগে ঠিক শতভাগ এই ধরনের আর কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ছাড়া আর যে বিপ্লবগুলো হয়েছিল তা সম্পূর্ণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চরিত্রের বিপরীত। ওই সব বিপ্লবের সঙ্গে মিলিয়ে বাংলাদেশের হানাদার মুক্তির যুদ্ধকে দেখা হয় বলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির বিষয়টি বিশ্লেষণে ভুল হয়। অনেকেই ভুল করে বলেন, বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন।

শীর্ষ সংবাদ:
পদত্যাগ করছেন প্রতিমন্ত্রী মুরাদ         প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদের বিতর্কিত অডিও সরাতে হাইকোর্টের নির্দেশ         বর্ণাঢ্য আয়োজনে শেরপুর মুক্ত দিবস পালিত         মুরাদের সঙ্গে আপত্তিকর ফোনালাপ নিয়ে মুখ খুলেছেন মাহিয়া মাহি         ঢাকা ছেড়ে কোথায় পালালেন ডা. মুরাদ?         বহিষ্কৃত মেয়র জাহাঙ্গীরের মোটরসাইকেলে মুরাদ, ছবি ভাইরাল         ইন্দোনেশিয়ায় আগ্নেয়গিরির উদগীরণে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২২         ‘লম্পটদের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর পদক্ষেপ অব্যাহত থাকুক’         আজ নালিতাবাড়ী পাক হানাদার মুক্ত দিবস         বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে ॥ স্পিকার         ভারতের জয়পুরে ৯ জনের দেহে ওমিক্রন শনাক্ত         ঢাকায় পৌঁছেছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব শ্রিংলা         বৃষ্টি থেমেছে, মিরপুর টেস্টের চতুর্থ দিনের খেলা শুরুর সম্ভাবনা         গত ২৪ ঘণ্টায় সারা বিশ্বে করোনায় মারা গেছেন ৫ হাজার ২৮০ জন         শীর্ষে যাবে রফতানিতে ॥ গার্মেন্টস শিল্পে ঈর্ষণীয় সাফল্য         ঢাকা-দিল্লী সম্পর্ক আস্থা ও শ্রদ্ধায় বিস্তৃত         ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ১১ মাসের মাথায় সুচির কারাদণ্ড         বিশ্বজুড়ে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন শেখ হাসিনা         অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সচিব পদোন্নতি দেয়ার প্রক্রিয়া!         বিজয়ের মাস