পদোন্নতি বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মীর মোফাজ্জল হোসেনের অপসারণের দাবি উঠেছে। অভিযোগগুলোর প্রাথমিক তদন্তে অনিয়মের ইঙ্গিত মিললেও তিনি এখনো স্বপদে বহাল থাকায় ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত কয়েক বছরে পদোন্নতি ও বদলি প্রক্রিয়াকে ঘিরে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতার পরিবর্তে আর্থিক লেনদেন এবং ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন কর্মরত অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে জুনিয়র কর্মকর্তারা দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হয়েছেন।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এমডি দায়িত্ব নেওয়ার পর পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। এতে ব্যাংকের প্রচলিত নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া উপেক্ষিত হয়েছে। অনেক কর্মকর্তা বছরের পর বছর পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকলেও তাদের নাম তালিকায় ওঠেনি।
এ অনিয়মের প্রতিবাদে গত বছরের ৯ আগস্ট পদোন্নতি বঞ্চিত কয়েকশ কর্মকর্তা ও কর্মচারী জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, পদোন্নতির ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেন হয়েছে এবং নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে পরিকল্পিতভাবে তালিকা তৈরি করা হয়েছে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্তে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে সিনিয়র কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং এতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের পর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেন অভিযোগ অস্বীকার করে জনকণ্ঠকে বলেন, “পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ীই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি। যার যার বিরুদ্ধে আমি ব্যাবস্থা নেই সেই আমাকে নিয়ে অভিযোগ দায়ের করে। এ বিষয়ে নিয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই।
আনসার-ভিডিপির মুখপাত্র আতিকুজ্জামান দৈনিক জনকণ্ঠকে বলেন, একসময় ব্যাংকটির আর্থিক পারফরম্যান্স সন্তোষজনক ছিল না; বরং দীর্ঘদিন লোকসানের মুখে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। নিয়ম অনুযায়ী এই ব্যাংকের ঋণ সুবিধা মূলত আনসার সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নীতিমালার বাইরে গিয়ে অন্যদের কাছেও ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলাও করা হয়েছে।
তবে ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের দাবি, পদোন্নতি নীতিমালা ২০১২ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এত সংখ্যক কর্মকর্তা বঞ্চিত হতেন না।
এদিকে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দেয়। কিন্তু সেই নির্দেশনাও এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মোফাজ্জল হোসেনের সাম্প্রতিক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারকে ঘিরে নানা অসঙ্গতি ও তথ্যবিকৃতির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি দাবি করেছেন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তার নেতৃত্বে ব্যাংকটি প্রথমবারের মতো লাভ করেছে। তবে ব্যাংকের গত পাঁচ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২০-২১, ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরেও ব্যাংকটি লাভে ছিল। ফলে ‘প্রথমবার লাভ’ সংক্রান্ত বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের হার নিয়েও তার বক্তব্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ একসময় ২৫ শতাংশে পৌঁছেছিল এবং তার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা কমেছে। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কখনোই ২৫ শতাংশে পৌঁছেনি। বরং তিনি যোগদানের আগে ২০২৪ সালের জুনে শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২৫ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের জুনে বেড়ে ৩৩১.২৭ কোটি এবং ডিসেম্বর ২০২৫ এ তা আরও বেড়ে ৪৩৪ দশমিক ৮০ কোটিতে দাঁড়ায়।
এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকটির ৪৩ দশমিক ৮৮ কোটি টাকা লোকসানের পর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই সময় পরিচালন মুনাফা ১০ দশমিক ৩৩ কোটি টাকা কমেছে এবং শ্রেণীকৃত ঋণও বেড়েছে। তবুও নিট মুনাফা দেখানোর বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শ্রেণীকৃত ঋণের একটি বড় অংশ পুনঃতফসিলকৃত ঋণ হিসেবে দেখিয়ে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আড়াল করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে যেখানে পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ছিল ৮৩ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা, সেখানে তা বেড়ে ১৬৭ দশমিক ৮১ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। এতে প্রভিশন কম রেখে কাগুজে লাভ দেখানোর মাধ্যমে ব্যাংকের আর্থিক ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা না থাকলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়। যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হলে তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।” সেই সঙ্গে দোষী ব্যক্তিদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী বলে জানান তিনি।
গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের সারাদেশে প্রায় ২৫০টি শাখা এবং প্রায় ৮০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ ও বিতর্ক তৈরি হওয়ায় ব্যাংকটির কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে আস্থা ফিরে আসবে। অন্যথায় সংকট আরও জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সানজানা








