ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ৩০ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

হিন্দাল শারক্বীয়ার চার দুর্ধর্ষ জঙ্গি চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম অফিস

প্রকাশিত: ০০:১৭, ২ মার্চ ২০২৩

হিন্দাল শারক্বীয়ার চার দুর্ধর্ষ জঙ্গি চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার চার জঙ্গি

র‌্যাবের অভিযানে চট্টগ্রামের পটিয়া থেকে গ্রেপ্তার হয়েছে দুর্ধর্ষ ৪ জঙ্গি। এরা জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার সদস্য। পাহাড়ের গহীন বনে যৌথ অভিযানে টিকতে না পেরে এরা সমতলে ফিরে আসার পর মঙ্গলবার রাতে র‌্যাবের জালে ধরা পড়ে। র‌্যাব জানিয়েছে, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও  উগ্রবাদ বিষয়ক বিভিন্ন কথিত তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে পরিবার থেকে প্রথমে বিচ্ছিন্ন করা হয় তরুণদের। আর এসব কাজে সম্পৃক্ত থাকে সহপাঠী, নিকটাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব, স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের ভিডিও দেখানো, রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে মগজ ধোলাই করেই নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ায় যুক্ত করা হয় তরুণদের। পাহাড়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া নতুন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে ছত্রভঙ্গ। গ্রেপ্তারকৃতরা জানিয়েছে, তাদের সংগঠনের লক্ষ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনা, এমপি এবং বিচার কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপর হামলা চালানো। নতুন জঙ্গি সংগঠনটি জেএমবি ও হরকাতুল জিহাদ থেকে বের হওয়া বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য দ্বারা পরিচালিত বলে জানায় র‌্যাব। 
পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীনে সশস্ত্র প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া ৪ জঙ্গিকে চট্টগ্রামে পটিয়া থেকে গ্রেপ্তার করার পর তাদের কাছে একটি ভিডিও কনটেন্টও পাওয়ার কথা জানিয়েছেন র‌্যাবের পরিচালক  (আইন ও গণমাধ্যম) কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। অভিযান পরবর্তী বুধবার দুপুরে নগরীর চান্দগাঁও ক্যাম্পে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান তিনি। গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের মধ্যে পটুয়াখালীর হোসাইন আহমদ (২২), কুমিল্লার নিহাল আব্দুল্লাহ (১৯) ও আল আমিন (২২)। এবং ধর্মান্তরিত হয়ে আল আমিন নামে পরিচিত পার্থ কুমার দাসের (২১) বাড়ি খুলনায়। 
র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, তাদের কাছ থেকে আমরা চাঞ্চল্যকর একটি ভিডিও কনটেন্ট পেয়েছি। এটি পর্যালোচনা করা হবে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা এবং সদস্যদের ওপর হামলার পরিকল্পনা ছিল। তাদের বেশি ক্ষোভ রয়েছে আইনপ্রণেতা, বিচার কার্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি। আমরা এ বিষয়ে তৎপর রয়েছি। এই সংগঠনটির পলাতক সদস্যদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 
পাহাড়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে সমতলমুখী জঙ্গিরা ॥ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে সেনাবাহিনী ও র‌্যাব। যে কারণে সেখানে নতুন সংগঠনটির যেসব সদস্যরা সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল, তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় বলে জানিয়েছে র‌্যাব। জঙ্গিরা এখন ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এরমধ্যে অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে সম্প্রতি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চলমান অভিযানের কারণে জঙ্গিরা পাহাড়কে অনিরাপদ মনে করে সমতলমুখী হয়।

এ বিষয়ে র‌্যাবের পরিচালক বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল, আমাদের অব্যাহত অভিযান ও সেনাবাহিনীর টহল কার্যক্রমের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ওই এলাকাতে যে জঙ্গিরা অবস্থান করেছিল তারা অনিরাপদবোধ করছিল। সংগঠনের আমির থেকে নির্দেশনা পেয়েই তারা সেখান থেকে সমতলে চলে আসে আত্মগোপনের জন্য। মঙ্গলবার গোয়েন্দা তথ্য ছিল বান্দরবানের গহীন থেকে একটি গ্রুপ চট্টগ্রামের দিকে আসছে।

তাদের সমতলে আসার কারণ ছিল আত্মগোপনে থেকে পরবর্তী মিশন বাস্তবায়ন। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাতে পটিয়া বাইপাস এলাকায় একটি সিএনজি থেকে ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে আরেকটি সিএনজিতে থাকা ৪ থেকে ৫ জন পালিয়ে যায়। তাদের বিষয়ে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।
ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে মগজ ধোলাই ॥ র‌্যাবের গণমাধ্যম শাখার কর্মকর্তা খন্দকার মঈন জানান যে, গ্রেপ্তাররা সহপাঠী, নিকটাত্মীয় ও স্থানীয় গণমান্যদের মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন এই সংগঠনে যুক্ত হয়। 
বিভিন্ন সময়ে জামায়াতুল আনসারের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা বিশে^র বিভিন্ন স্থানে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের ভিডিও দেখানো, রাজনীতি, বিভিন্ন অনিয়ম, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা ও বিভিন্ন তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদান করার মাধ্যমে তাদের সশস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিতে পরিবার হতে বিচ্ছিন্ন করতে উৎসাহী করে তুলেছিল।
পাহাড়ে সামরিক ক্যাম্প ॥ ঘর ত্যাগ করার পর প্রথমে তাদের সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের তত্ত্বাবধানে রেখে পটুয়াখালী ও ভোলার চর এলাকা, ঢাকা ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় শারীরিক কসরত, জঙ্গিবাদ বিষয়ক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রদান করা হতো। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের সমতল হয়ে পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শূরা সদস্য রাকিবের মাধ্যমে তারা পার্বত্য অঞ্চলের বাকলাই পাড়া হয়ে কেটিসি পাহাড়ে প্রশিক্ষণ শিবিরে পৌঁছে। তারা সেখানে বিভিন্ন ধরনের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ, বোমা তৈরি বিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছে। 
শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা সমতলে যাওয়ার ॥ দীর্ঘদিন পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছিল নতুন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। তবে পাহাড়ে অভিযানের কারণে এখন তারা বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়ালেও সমতলে আসার নির্দেশনা দেন সংগঠনটির আমির। এমন দাবি করেছেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। পার্বত্য অঞ্চলে র‌্যাবের অভিযান শুরু হলে জামায়াতুল আনসারের আমিরের নির্দেশে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পার্বত্য অঞ্চলে আত্মগোপন করে।

তারা ছোট ছোট গ্রুপে সাইজামপাড়া, মুন্নুয়াম পাড়া, রোয়াংছড়ি, পাইক্ষং পাড়া, তেলাং পাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে। গত ৪ দিন আগে তারা সমতলে আসার উদ্দেশে পাহাড়ের গহীন থেকে হেঁটে বান্দরবানের টঙ্কাবতী এলাকায় আসে। পরবর্তীতে সিএনজিতে করে আসার সময় পটিয়া বাইপাস এলাকা থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়।

×