মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৮ জুলাই ২০১৭, ১৩ শ্রাবণ ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

মধ্যম আয়ের দেশ যেতে হবে বহুদূর

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিগণিত হওয়ায় বাংলাদেশের কী লাভ হবে? এমন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। স্বাধীনতার ৪৫ বছরের প্রান্তে এসে নিম্ন আয়ের দেশটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। দেশটির বা দেশবাসীর জীবনে এতে গুণগত কী পরিবর্তন আসবে কিংবা আর্থসামাজিক ও মানবসম্পদের উন্নয়নে এর গুরুত্বই বা কী দাঁড়াবে? এমন প্রশ্ন মনে উঁকিঝুঁকি দেবেই। বিষয়টির অভ্যন্তরে আরও বিষয় থেকেই যায়। এমনিতেই মানুষের আয় বাড়লে, তার জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয়। আর বিশ্বব্যাংকের তালিকায় মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিগণিত হওয়া মানে আন্তর্জাতিকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। চলতি নতুন অর্থবছরের প্রথম দিনে অর্থাৎ ১ জুলাই নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ মাথাপিছু জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে এই শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে। বাঙালী জাতি হিসেবে বিশ্বব্যাংকের এই মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি বিশ্বসভায় সম্মানিত স্থানে আসন পাতার সুযোগ করে দিয়েছে। এ দেশকে আর হতদরিদ্র দেশ বলে কেউ বিদ্রƒপ করতে পারবে না। দারিদ্র্যসীমার মধ্যে যুগ যুগ থাকা দেশটির জন্য অবশ্যই এটি একটি বড় মাপের অর্জন এবং নতুন মাইলফলক। এর যেমন রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির বিষয়, সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও। বিশ্বব্যাংকের মানদ- হিসেবে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হলেও, এ বিষয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে জাতিসংঘ। এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে আরও তিন থেকে চার বছর লেগে যাবে। এই সময় পর্যন্ত দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের সুবিধাগুলো পাবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায় আরও উঁচুতে ওঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি প্রত্যাশা করছেন ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। সেই লক্ষ্যে তার সরকার কাজ করছে বলেও জানিয়েছেন। কিন্তু এটা তো বাস্তব যে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে প্রতিবছর ৭ দশমিক ৫ থেকে ৮ শতাংশ জিডিপি অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি প্রবাসী আয়েও কমপক্ষে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা যদি উদ্যমী না হয় কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধা পায়, তবে লক্ষ্যচ্যুত হবে।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ১৯৭৫ সালে। ২০১২ সালে জাতিসংঘ নির্ধারিত মানদ- অনুযায়ী বাংলাদেশ ছিল স্বল্পোন্নত দেশ। যেহেতু বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২০১৩ সালে ৯০০ ডলার, মানবসম্পদ সূচক ৫৪ দশমিক ৭ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক ৩২ দশমিক ৪ ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে মাথাপিছু জাতীয় আয়ের যে হিসাব করেছিল, সেখানে ২০১৩ সালে মাথাপিছু আয় ১০৫৪ ডলার হিসাব করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশ আরও অগ্রগতি সাধন করে। কেননা জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রফতানি, রেমিট্যান্স, খাদ্য নিরাপত্তা, ও এমডিজির সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অর্জন প্রশংসনীয়। সরকার ধারণা করছিল ২০১৮ সালের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় দেশটি অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু তিন বছর আগেই নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, যা অত্যন্ত আশাপ্রদ।

বিশ্বব্যাংক ঋণপ্রদান সুবিধার জন্য সদস্য দেশগুলোকে নিম্ন আয়ের দেশ, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং উচ্চ আয়ের দেশ এই চারভাগে ভাগ করেছে। তবে এই ভাগটি শুধু আয়ভিত্তিক বলে এখানে কোন দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চিত্রটি বোঝা যায় না। কেননা উচ্চ মাথাপিছু আয় থাকার পরও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক দেশ সামাজিক সূচকে পিছিয়ে থাকে। তাই জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছে। স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কাউন্সিলের উন্নয়ন নীতিমালা বিষয়ক সুপারিশ অনুযায়ী স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে আসার সূচকগুলো হলো তিন বছরের গড় মাথাপিছু আয়, পুষ্টি, স্থাস্থ্য, স্কুল ভর্তি ও শিক্ষার হারের সমন্বয়ে গড়া মানবসম্পদ সূচক এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক আঘাত, জনসংখ্যার পরিমাণ এবং বিশ্ববাজার থেকে একটি দেশের দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক। একটি দেশ যে কোন দুটি সূচক অর্জন করতে পারলে, সেটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটানোর যোগ্যতা অর্জন করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমনটা হয়েছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধির হার তুলনায় অনেক দেশের চেয়ে বেশি। আর সামাজিক খাতে এদেশের সাফল্য তো বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়বে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াতে পারবে। আন্তর্জাতিক ঋণপ্রাপ্তিতে সুবিধা পাবে।

স্বল্পোন্নত আয়ের দেশ থেকে বেরিয়ে আসায় বাংলাদেশ কিছু কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ইত্যাদি দেশে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। এছাড়া বাণিজ্য সংক্রান্ত মেধাস্বত্ব আইন বা ট্রিপস এবং বাণিজ্য সংক্রান্ত বিশেষ সুবিধাগুলো আর পাবে না। কিন্তু এই সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে রয়ে যেতে পারে না। কারণ এই সুবিধা এক সময় শেষ হয়ে যেতই। সুতরাং বাংলাদেশের লক্ষ্য হবে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে, মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটিয়ে অর্থনৈতিক নাজুকতা কাটিয়ে ওঠা।

বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বাংলাদেশকে অবশ্যই সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ চারটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। বিভাজিত রাজনীতি, আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্য, অতি মুনাফা প্রবণতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার- এই চারটি সমস্যাকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক। তাদের মতে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য নিরসন হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জিডিপির ২ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগ হচ্ছে। এগুলো অর্থনীতির ভাল নির্দেশক। কিন্তু সুশাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এটাই হচ্ছে অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়।

২০২১ সালের মধ্যে বা তার আগেই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নত করার সব সম্ভাবনা ও প্রস্তুতি সরকারের রয়েছে। কিন্তু এটি অর্জনের জন্য গৃহীত পরিকল্পনাও সূচিত কর্মসূচীর ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং তা বেগবান করা আবশ্যক। তবে আশা করা যাচ্ছে, উন্নয়নের ধারাবাহিকতার হাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শক্ত ও বলিষ্ঠ হাতে থাকায় বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে রূপকল্পের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে বাংলাদেশ।

yafarwayed@yahoo.com

প্রকাশিত : ৫ জুলাই ২০১৫

০৫/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: