মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৪ আগস্ট ২০১৭, ৯ ভাদ্র ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

মায়ের ভাষার ঋণ...

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

আমরা আমাদের লেখাপড়া বদলে ফেলেছি : আব্দুন নূর তুষার (টিভি উপস্থাপক)

যে ভাষা ভাল জানে, সে তো আরেক ভাষা মেশাবে না! যার নিজের ভাষার শব্দ জানা কম, সে তো অন্য ভাষার শব্দ ধার করে বলবেই! কিছুু মানুষ মনে করে যে, ভাষা মেশাতে পারাটা এক ধরনের কৃতিত্ব বা দক্ষতা। এটা বিশেষ করে হয়েছে, ভারতীয় চ্যানেলগুলোকে অনুকরণ করতে গিয়ে। তারা হিন্দি আর ইংরেজীকে মিশিয়ে একটা ভাষা তৈরি করেছে, হিংলিশ। সেখান থেকে আমরা বাংলিশ, ইংলাÑ এমন কিছু তৈরি করছি আর কী।

সালাম-বরকতদের ত্যাগের প্রতি দায়বদ্ধতা আমাদের অবশ্যই আছে। সেটা তো মুখে মুখে হবে না। সেটার জন্য নীতি প্রয়োজন। আমরা আমাদের লেখাপড়া বদলে ফেলেছি, আমরা আমাদের ইংরেজী শিক্ষাকে অনেক গুরুত্ব দিচ্ছিÑ সেজন্যই এটা হয়েছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা চার-পাঁচ রকমের। আমাদের উচিত ছিল, দেশব্যাপী একটি শিক্ষাব্যবস্থা রাখা। যেখানে বাংলা এবং ইংরেজী দুটাই জোর দিয়ে শেখাবে।

কেউ এখন ভাই বলে না। বলে, এই মাম্মা.. : সামিনা চৌধুরী (সঙ্গীতশিল্পী)

প্রথমত, আমরা খুব পরশ্রীকাতর। অন্যেরটা পছন্দ করি বেশি। দ্বিতীয়ত, ইংরেজী এবং হিন্দি খুব সহজ। বাংলা এবং ঊর্দু খুব কঠিন; কিন্তু, সুন্দর। বাংলা বলতে গেলে প্রতিটি শব্দচয়ন খুব সুন্দর হতে হয়।

তৃতীয়ত, আমাদের অনিচ্ছা। আমার ভাষাটাকে আমি এত সম্মান দেখাবো কেন? এই ধরনের একটা প্রবণতা আমাদের মধ্যে আছে।

বাংলা ভাষার মতো এত সৌন্দর্যময়, বর্ণময় পৃথিবীর কোনও ভাষা না। ইংরেজীতে যেমন ‘দ’ নেই, ‘ত’ নেই; বাংলা কিন্তু তেমন না। পরিপূর্ণ একটা ভাষা।

বাংলা ভাষা এখন এমন একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে, প্রায় প্রতিটা নাটকেই একদম গ্রামের পর্যায়ের নোংরা ভাষাগুলো ব্যবহার করা হয়। গ্রামের যে অশিক্ষিত লোকরা মনের দীনতা থেকে খুব বিশ্রী ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষাগুলো এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে। কেউ এখন ভাই বলে না। বলে, এই মাম্মা..

রাস্তায় পড়ে থাকা আবর্জনা যদি কেউ কুড়িয়ে ব্যবহার করে, সেটা যেমন জঘন্য হবে; ঠিক আমাদের ভাষার অবস্থাটা তাই। ব্যাপারটা খুব দুঃখের। এ থেকে মনে হয় না মুক্তি সম্ভব।

এই নিয়মটা ভাঙ্গা উচিত : কিবরিয়া সরকার (রেডিও উপস্থাপক)

প্রথমদিকে ঐতিহ্যগত যে উপস্থাপনার নিয়ম ছিল, বেসরকারী রেডিওগুলো সেটাকে ভাঙ্গার চেষ্টা করেছে। সে যায়গা থেকে কিছু জিনিস খুব অতিরিক্তও হয়ে গেছে। কিছু জিনিস ঠিকও ছিল। আসলে, অতিরিক্ত কোন জিনিসই ভাল না। আমি যদি জোর করে যেই বাংলা প্রচলিত না সেটা বলি, সেটা যেমন চলমান সমাজের সঙ্গে যায় না; এবং একই সঙ্গে, যেখানে বাংলা ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত শব্দ আছে, সেই শব্দকে বাদ দিয়ে যদি জোর করে অন্য ভিনদেশী শব্দ ঢোকানোর চেষ্টা করি, সেটাও কিন্তু চলমান সমাজের সঙ্গে যায় না।

তরুণ প্রজন্ম ইংরেজীর প্রতি দুর্বল। তারা ইংরেজী খুব ভাল বলে, তা না। তারা মনে করে, যদি আমরা ভাষার মধ্যে ইংরেজীটা টুকটাক ব্যবহার করতে পারি; তাহলে আমাদের সামাজিক সম্মানটা বেড়ে যায়। বা, আমি অনেক আধুনিক হয়ে গেছি, এই জিনিসটা প্রকাশ পায়। যার কারণে, কিছুটা হলেও তারা অযাচিত ইংরেজী শব্দ ব্যবহারের চর্চা করে।

এই নিয়মটা ভাঙ্গা উচিত। সেজন্য গণমাধ্যমের একটা বিশাল ভূমিকা আছে অবশ্যই।

নিছক জনপ্রিয়তার জন্যই কিছু মানুষ এমনটা করে : ফারজানা ব্রাউনিয়া (টিভি উপস্থাপিকা)

ভাষার যে নিজস্ব শক্তি আছে, সেটা থাকবে। আমরা হাজারো শব্দ মিশ্রিত করে কথা বললেও, দিন শেষে কিন্তু ওই শক্তিটা থেকেই যাবে। কতিপয় গোষ্ঠী আছে, যারা ভাষা বিকৃত করে কিছুদিনের জন্য জনপ্রিয়তা পায়, তাতে কিছু যায় আসে না। ভাষা আবারও ঘুরে এসে নিজের শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। এখন কিন্তু বিকৃত ভাষার প্রচলনটা অনেকখানি কম।

নিছক জনপ্রিয়তার জন্যই কিছু মানুষ এমনটা করে। এটা তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনার ব্যাপার। এসব ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা আসতে পারে। সচেতন হওয়াটাও জরুরী। চর্চাটাও বাড়াতে হবে।

শেঁকড়কে ভুলে কখনোই এগোনো যাবে না : আমিরুল মোমেনীন মানিক (সঙ্গীতশিল্পী ও টিভি উপস্থাপক)

পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কারণে আমরা আমাদের শেঁকড় ভুলে যাচ্ছি। যার ফলে, যারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা মনে করছেন যে; অতিরিক্ত আধুনিক হওয়ার জন্য বাংলা-ইংরেজী মিশিয়ে যদি কথা বলা যায়, নিজস্ব একটা ধারা দ্বার করানো যায়Ñ সেটা হয়ত তরুণ জাতি বেশি গ্রহণ করবে। এই ধারণাটা ভুল। আসলে, শেঁকড়কে বাদ দিয়ে কখনোই এগোনো যাবে না।

ভাষার প্রতি মমত্ববোধ কিন্তু তাদের আছে। আত্ম-উপলব্ধিটা নেই। তাদের বোধ এবং মননের মধ্যে বাংলা ভাষার প্রেরণাটা নাড়া দেয় না। চোখ থাকার পরও তারা দেখতে পায় না। তাদের সামনে হয়ত অন্য আলেয়ারা আলো ছড়ায়। এখন একটা সময়ের হাওয়া বইছে। এই হাওয়াটা কেটে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

এটার জন্য দায়ী আমাদের পরিবেশ : সাফা কবির (অভিনেত্রী)

আমরা দিনদিনই এমনটাতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রবণতাটাই এরকম হয়ে গেছে। কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সাধারণত আমরা ‘ধন্যবাদ’ এর বদলে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলি। আসলে, ইংরেজী শব্দগুলো এত বেশি সহজ হয়ে গেছে বাংলার থেকে, ওগুলো খুব সহজে বের হয়ে যায়।

নাটকের ক্ষেত্রেও পরিচালকরা কখনোই বলেন না যে, সাফা তুমি পরিপূর্ণ শুদ্ধ বাংলায় কথা বলবে, কোন ইংরেজী ভাষা ব্যবহার করতে পারবে না। এখন যদি যেভাবে কথা বলতে আমি অভ্যস্ত, সেটা বাদ দিয়ে পুরোটাই বাংলায় বলতে হয়, হয়ত আমি পারব না। অনেক চিন্তা করে বলতে হবে। কারণ, আমি বড় হয়েছি এভাবেই।

এটার জন্য দায়ী আমাদের পরিবেশ। আমাদের বাসায় এভাবে কথা বলে, বন্ধু-বান্ধবীরা এভাবে কথা বলে। আমি তো আমার আশপাশের মানুষগুলোর কাছ থেকেই শিখছি! যার ফলে, স্কুল-কলেজে আমরা যতটুকু শিখে আসছি, এর বাইরে বাংলা চর্চাটা তেমন হয় না।

চর্চা তো নিজের কাছেই : জাকিয়া ইমি (অভিনেত্রী ও টিভি উপস্থাপিক)

ভাষা বিকৃতিটা যারা করছে, তারা একদমই ঠিক করছে না। আমাদের উচিত বাংলা ভাষাটাকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়ে নিজেরা সুন্দর করে বাংলা শেখা এবং চর্চা করা।

চর্চা তো নিজের কাছেই। যে কেউ চাইলেই তা করতে পারে। শ্রদ্ধাবোধটা যদি ঠিক থাকতো বাংলা ভাষার প্রতি, তাহলে তো সবাই-ই চর্চা করত প্রমিত বাংলার। মন থেকে, দায়বদ্ধতা থেকে একটু চেষ্টা করলেই এ থেকে মুক্তি সম্ভব।

আমি আমার ভাষাটাকে সম্মান করি : তাহসান (সঙ্গীতশিল্পী ও অভিনেতা)

আমার কথাই বলি, গত আট বছর ধরেই শিক্ষকতা পেশায় আছি। একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটা নিয়ম আছে, আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ইংরেজীতে কথা বলতে হবে। আমাদেরকে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রত্যেকটা ক্লাসের আশি মিনিট করে সময় তো ইংরেজীতে বলতে হবেই; বাকি যে সময়টা কার্যালয়ে থাকি, তখনও ইংরেজীতে কথা বলতে হয়। এ কারণে ইংরেজীটা হয়তো আমার ভেতর ঢুকে গেছে। এটা কি খারাপ কিছু? আমার চাকরির কারণে এটা করতে হয়।

যার ফলে বাইরে যখন আমি কথা বলি, তখনও ইংরেজীটা চলে আসে। আমাদের আশপাশে এমনও প্রচুর আছে, যারা ভুল ইংরেজী বলে। তাদের শেখানোর জন্যও মাঝে মধ্যে আমি ইংরেজীতে কথা বলি।

তবে, আমি আমার ভাষাটাকে সম্মান করি, ভালবাসি। অপ্রয়োজনীয়ভাবে অন্য ভাষার শব্দ মিশ্রিত করে বলার প্রবণতাটা আমি পছন্দ করি না।

প্রকাশিত : ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

১৯/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ:
ঘূর্ণিঝড়, পাহাড় ধস, বন্যা ॥ দুর্যোগ পিছু ছাড়ছে না || বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যের শিকার পরিবারগুলোকে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান || বিটি প্রযুক্তির ব্যবহার দেশকে কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য এনে দিয়েছে || রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থ পুরো ফেরত পাওয়া যাবে || গ্রেনেড হামলা মামলার পলাতক ১৮ আসামিকে ফেরত আনার চেষ্টা || অনেক সড়ক মহাসড়ক পানির নিচে মহাদুর্ভোগের শঙ্কা || খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ’২১ সালের মধ্যে বিলিয়ন ডলার রফতানি || নূর হোসেনের দম্ভোক্তি উবে গেছে, কালো মেঘে ছেয়েছে মুখ || জবাবদিহিতা না থাকা ও রাজনৈতিক প্রভাবে পাউবো প্রকল্পে দুর্নীতি || রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে আজ চূড়ান্ত রিপোর্ট দিচ্ছে আনান কমিশন ||