স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানীর মিরপুর ও উত্তরা এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য লিটন ও আজাদকে গ্রেফতার করেছে র্ ্যাব। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে শুক্রবার রাতে র ্যাব-৪ এর একটি দল তাদের গ্রেফতার করে। এ বিষয়ে শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রেফতারকৃতদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়।
র ্যাব জানিয়েছে, গত মে মাসে পার্শ্ববর্তী একটি দেশে বাংলাদেশের এক তরুণীর পৈশাচিক নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর র ্যাব ওই মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা বস রাফিসহ চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করে। এছাড়াও দেশী-বিদেশী গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদে একজন মহিয়সী মা সম্পর্কে জানা যায়। যে মা নিজ জীবন বিপন্ন করে, জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে পাচার হওয়া মেয়েকে উদ্ধার করেন। ওই ঘটনায় কাল্লুনাগিন চক্রের হোতাসহ পাচার চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে র্যা ব। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন নারী ভিকটিম মধ্যপ্রাচ্যে মানবপাচার সংক্রান্ত অভিযোগ র্যা বকে জানায়। ফলশ্রুতিতে র্যা ব ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এরই ধারাবাহিকতায় র ্যাব-৪ এর একটি আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার ভোরে রাজধানীর মিরপুর এবং উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা মোঃ লিটন মিয়া ওরফে কথিত ডাঃ লিটন (৪৪) ও আজাদ রহমান খানকে (৬৫) গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় প্রাইভেটকার, পাসপোর্ট, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই, ল্যাপটপ, ৪০৭ পিস ইয়াবা, ১২ ক্যান বিয়ার।
র ্যাবের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় গ্রেফতারকৃতরা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারী চক্রের হোতা। চক্রে দেশে বিদেশে ১৫-২০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এই চক্রটি বিভিন্ন প্রতারণামূলক ফাঁদ ফেলে উচ্চ বেতনের লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মানবপাচার করে। পুরুষদের পাশাপাশি চক্রটি নারীদেরও পাচার করে থাকে। বিভিন্ন পেশায় দক্ষ নারী যেমন নার্স, পার্লার ও বিক্রয় কর্মীদের টার্গেট করে এই চক্রটি। চক্রটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন হাসপাতাল, ক্লিনিক, মার্কেট, সুপারশপ, বিউটি পার্লারসহ বিভিন্ন চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভিকটিমদের আকৃষ্ট করত। তাদের মূল টার্গেট ছিল বিদেশে চাকরিচ্যুত দক্ষ নারীদের প্রলুব্ধ করা। প্রতারণার কৌশল হিসেবে চক্রের হোতা লিটন নিজেকে ঢাকা মেডিক্যাল থেকে পাস করা এমবিবিএস ডাক্তার হিসেবে ভুয়া পরিচয় দিত এবং বতর্মানে ইরাকের বাগদাদে একটি স্বনামধন্য হাসপাতালে কর্মরত বলে সবাইকে বলত। অপর সহযোগী গ্রেফতারকৃত আজাদ একটি এজেন্সির আড়ালে নারী পাচারের সঙ্গে যুক্ত। এই চক্রটি বিদেশে পাচারের পর ভিকটিমদের অনৈতিক কাজের জন্য বিক্রি করে দিত। ভিকটিমদের প্রথমে বাংলাদেশ হতে টুরিস্ট ভিসায় মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে নেয়া হতো। অতপর ওই দেশে ১-২ দিন অপেক্ষা করিয়ে ভিজিট ও টুরিস্ট ভিসায় ইরাকসহ অন্য দেশে পাচার করত। গ্রেফতারকৃত লিটন ইরাকে কয়েকটি সেফ হাউসে ভিকটিমদের অবস্থান করাতো। এজন্য ভিকটিমদের কাছ থেকে ৩-৪ লাখ টাকা নেয়া হতো। তারপর সুবিধাজনক সময়ে ভিকটিমদের বাংলাদেশী মুদ্রায় তিন লক্ষাধিক টাকায় বিক্রি করা হতো। চক্রটি রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। এ চক্রটি ২০০ থেকে ২৫০ জনকে পাচার করেছে। তারমধ্যে ৩৫-৪০ জন নারী রয়েছে।
র ্যাবের মতে, গ্রেফতারকৃত লিটন ওরফে ডাঃ লিটন সরকারী একটি সংস্থায় মেডিক্যাল এ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে চাকরি করত। ২০১০ সালে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে সে চাকরিচ্যুত হয়। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর সে ২০১৩ সালে ইরাকে গমন করে। ইরাকে সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলে। ইরাকে অবস্থানকালীন ২০১৬ সালে সে আজাদ সম্পর্কে জানতে পারে এবং পরবর্তীতে তার সঙ্গে সখ্যতা তৈরি হয়। বাংলাদেশ থেকে নারীদেরও মধ্যপ্রাচ্যে পাচারের কাজে গ্রেফতারকৃত আজাদ সহযোগিতা করত। প্রতারণামূলকভাবে এই মানবপাচারের নামে অনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত থাকায় সে ইরাকে গ্রেফতার এড়াতে বাংলাদেশে ফিরে আসে। সে দুইবার ইরাকে গ্রেফতার হয়েছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে সে বালুর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। গ্রেফতারকৃত লিটন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে নারীদের পাচার করত। গ্রেফতারকৃত লিটনের নামে বিভিন্ন থানায় মানবপাচার ও প্রতারণাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। আজাদ ২০১৬ সাল হতে এই চক্রের সঙ্গে জড়িত হয়। সে গ্রেফতারকৃত লিটনের সঙ্গে যোগসাজশে মধ্যপ্রাচ্যে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক অবৈধ মানবপাচারে যুক্ত হয়। সে এই চক্রের পাসপোর্ট ও অন্য নথিপত্রের ব্যবস্থা করত। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় প্রতারণা ও মানবপাচার সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলা রয়েছে।

