স্টাফ রিপোর্টার, যশোর অফিস ॥ ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে অভয়নগরে সালিশি বৈঠকে এক বিধবাকে (৩৭) মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। মারধরের পর তাকে দোষ স্বীকার করে সবার সামনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে। বর্তমানে ওই বিধবা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। অভয়নগরের সুন্দলী ইউনিয়নের রামসরা গ্রামে গত ৩০ আগস্ট সকালে এক সালিশি বৈঠকে বিধবাকে ঝাঁটা ও জুতা দিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। সালিশি বৈঠকে বিধবার ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, বিধবা ওই নারীকে সালিশি বৈঠকের মাঝে দাঁড়াতে বলা হচ্ছে। পাশ থেকে তাকে ক্ষমা চাইতে বলা হচ্ছে। তিনি পরনের শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখমন্ডলের ঘাম মুছছেন। এরপর তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে চা পান করছেন সুন্দলী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ইউনিয়ন কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি স্বপন সরকার।
বিধবা জানান, ১০ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। তাদের দুটি মেয়ে আছে। দুটি মেয়েরই তিনি বিয়ে দিয়েছেন। গ্রামের বাইরের দিকে ফাঁকা জায়গায় ঘর করে সেখানে তিনি একাই থাকেন। তিনি বলেন, গ্রামের একটি হিন্দু মেয়ে পাশের গ্রামের একটি মুসলমান ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছেন বলে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মেয়েটির সঙ্গে একই শ্রেণীতে পড়ালেখা করে গ্রামের একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হলে তিনি গুজবের ব্যাপারে সত্য-মিথ্যা জানতে চেয়েছিলেন। ছেলেটি বিষয়টি বাড়িয়ে মাতব্বরদের বলে দেয়। এরপর তার বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানোর অপবাদ দিয়ে ২৯ আগস্ট রাতে গ্রামের স্বপন সরকার ও নীলকোমল মন্ডলের নেতৃত্বে কিছু লোক তাঁর বাড়িতে এসে পরদিন ৩০ আগস্ট সকালে তাঁকে গ্রামের চার রাস্তার মোড়ে যেতে বলেন। এরপর ৩০ আগস্ট সকালে গ্রামের কয়েকজন লোক বাড়ি থেকে তাঁকে ধরে সালিশি বৈঠকে নিয়ে যান।
সেখানে স্থানীয় ইউপি মেম্বর তুষার কান্তি বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন সরকার, কলেজশিক্ষক বিকাশ ম-ল, স্কুলশিক্ষক নীলকোমল ম-লসহ দুই শতাধিক লোক উপস্থিত ছিলেন। সালিশি বৈঠকে হঠাৎ গ্রামের নারায়ণ বৈরাগী (৪৮) তাঁকে কয়েকটি লাথি মারেন। এরপর তাঁর স্ত্রী অঞ্জলী বৈরাগী (৩৭), বোন হবু বৈরাগী (৫২), চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী কালী বৈরাগী (৫০) এবং অপর চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী ষষ্ঠী বৈরাগী (৫২) তাঁকে ঝাঁটা দিয়ে মারতে থাকেন। এরপর নারায়ণ বৈরাগীর মেয়ে অর্পি বৈরাগী (১৯) পা থেকে জুতো খুলে তাঁকে পেটান। তাঁরা ১৫-২০ মিনিট ধরে তাঁকে পেটান। এতে তিনি ভীত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে তাঁরা তাঁকে ঘটনার দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলেন। চাপে পড়ে তিনি ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন। এরপর ভয়ে ও লজ্জায় তিনি বাড়ি থেকে বের হননি। ভয়ে একা না থাকতে পেরে তাঁর মাকে বাড়িতে এনে রেখেছেন।
বিধবা বলেন, পরে মাতব্বররা আমার বাড়িতে এসে সেদিনের ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। আমার সঙ্গে কারোর বিরোধ নেই। আমি কোন গুজব ছড়াইনি। অথচ শুধু গুজব ছড়ানোর অপবাদ দিয়ে আমার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। আমি এর বিচার চাই। বর্তমানে আমি ভীষণ ভয়ে আছি।
জানতে চাইলে সুন্দলী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ইউনিয়ন কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি স্বপন সরকার বলেন, ভিডিওতে দেখেন আমি চা খাচ্ছি। আমি ওই সময় বিলে যাচ্ছিলাম। সেখান থেকে আমাকে মিটিংয়ে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। মিটিংয়ে বিধবাকে মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। মিটিংয়ের মধ্যে তাঁকে মারধর করা হয়নি। বাড়িতে ঘরোয়াভাবে মিটিং হয়েছিল। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয়।
সুন্দলী ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তুষার কান্তি বিশ্বাস বলেন, ঘটনা ঘটেছে এটা সত্য। একটা সমস্যা হয়েছিল। বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা বসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে হবু বৈরাগী চড়াও হন এবং বিধবাকে দুটো বাড়ি মারেন। আমরা তাঁকে ঠেকাই। এরপর মেয়ের পরিবার মিটিংয়ে দোষ স্বীকার করেন। তাঁকে এভাবে মারধর করা ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, মিটিংয়ে বিধবার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি দোষ স্বীকার করে সবার সামনে ক্ষমা চান। ক্ষমা চাইতে তাঁকে বাধ্য করা হয়নি।
বিধবাকে ঝাঁটা দিয়ে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে হবু বৈরাগী বলেন, যে মেয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেয়া হয়েছে সে আমার ভাইয়ের মেয়ে। আর যে বিধবা অপবাদ দিয়েছেন তিনি আমার কাকাতো ভাইয়ের স্ত্রী। অপবাদ দেয়ায় আমার ভাইয়ের মেয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। এজন্য রাগে ক্ষোভে মিটিংয়ের মধ্যে আমি আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে উপস্থিত লোকজন আমাকে ঠেকিয়ে দেন। আমি তাঁকে মোটেই ঝাঁটা দিয়ে মারিনি।
জানতে চাইলে সুন্দলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিকাশ রায় কপিল বলেন, ঘটনাটি আমি পরে শুনেছি। যেদিন যা ঘটেছে তা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও নিন্দনীয়।

