বাংলা বর্ণমালা
বাংলা শুধু কোনো বর্ণমালার সমষ্টি নয়, এ এক অবিনশ্বর দর্শনের নাম। এ ভাষা আমাদের ভৌগোলিক সীমানা ছাপিয়ে এক পলিমাটির মানচিত্র তৈরি করেছে, যার নাম ‘অস্তিত্ব’।
আমাদের রক্তিম বর্ণমালাগুলো যেন এক একটি নক্ষত্র, যা তিমির রজনী বিদীর্ণ করে উদিত হয়েছিল ৫২-র রাজপথে। একুশের সেই দুপুর ছিল এক মহাজাগতিক মুহূর্ত, যেখানে শরীর থেকে ঝরে পড়া রক্তবিন্দুগুলো মাটিতে মিশে গিয়ে জন্ম দিয়েছিল একেকটি অবিনাশী অক্ষর। সালামের কণ্ঠরোধ করতে চেয়েছিল যারা, তারা জানত না যে শিমুল আর পলাশের ডালে ডালে তখন রচিত হচ্ছে এক অজেয় বিদ্রোহের কাব্য। সেই রক্তই আজ আমাদের প্রতিটি শব্দের ভেতরে ধমনীর মতো প্রবাহিত হয়।
বাংলা ভাষাকে উপমার জননী বলা হয়। যেন সেই জননী, যার আঁচলে লুকানো থাকে সহস্র বছরের বাউল গান, ভাটিয়ালির সুর আর রবীন্দ্র-নজরুলের চেতনা। মা যখন ‘খোকা’ বলে ডাক দেন, সেই ডাকের ভেতরে যে মহাজাগতিক শান্তি লুকিয়ে থাকে, পৃথিবীর কোনো ব্যাকরণ তার ব্যাখ্যা দিতে পারে না। এ ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এ হলো আত্মার আয়না। নদীতে যেমন জোয়ার-ভাটা খেলে, এ ভাষার ছন্দেও তেমনি জীবনের উত্থান-পতন দোলা দেয়।
ভাষার প্রতি ভালোবাসা মানে কেবল দিবসে ফুল দেওয়া নয়, বরং ভাষার মর্যাদা নিজের মননে ধারণ করা। একটি ভুল উচ্চারণে যখন আমরা গর্ব বোধ করি, তখন আসলে আমরা আমাদের শেকড়কেই আঘাত করি। বাংলা ভাষা আমাদের শেখায় বিনয়, শেখায় মাটির কাছাকাছি থাকতে। এর দর্শন হলো উদারতা—যা অন্যকে আপন করে নিতে জানে, কিন্তু নিজের স্বকীয়তা বিসর্জন দেয় না।
আজকের এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর বিশ্বায়নের যুগে আমাদের দায়িত্ব হলো এই ভাষাকে জং ধরতে না দেওয়া। আকাশ সংস্কৃতির ঝড়ে যেন আমাদের প্রাণের স্পন্দন ‘অ আ ক খ’ হারিয়ে না যায়। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি শুদ্ধ, মার্জিত এবং শক্তিশালী বাংলা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেম। ভাষার মান রক্ষা করা মানে নিজের আত্মপরিচয়কে সুরক্ষিত রাখা।
মনে রাখতে হবে, যতদিন এ ভাষা বেঁচে থাকবে, ততদিন আমরা বেঁচে থাকব। কারণ আমাদের প্রতিটি নিশ্বাসে, প্রতিটি স্বপ্নে আর প্রতিটি স্বাধীন পদক্ষেপে বাংলা ভাষা এক ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে।
প্যানেল হু








