গোধূলি লগ্ন, মাতামুহুরির শান্ত জল, সাদা পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা সবুজ বৃক্ষ, দূর পাহাড় থেকে ভেসে আসা পাখির মৃদু কলতান। এ যেন এক অপূর্ব দৃশ্য। মন ভোলানো এই পরিবেশ ‘সৌন্দর্য-পিয়াসী’ যে কাউকেই আকৃষ্ট করবে। বান্দরবানের লামা উপজেলায় অবস্থিত ওয়াইট পিক স্টেশন রিসোর্টের মাচায় বসে ভ্রমণ ক্লান্তি যেন নিমেষেই দূর হয়ে যায়।
প্রতিবছরের মতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (চবিসাস) আয়োজন করছে মিনি ট্যুর। এবার আমরা নাম বদলে রাখলাম আনন্দ ভ্রমণ। চবিসাস সদস্যরা কয়েকটা জায়গার নাম বললেও শেষ পর্যন্ত নতুন স্পটে ট্যুর দেওয়ার জন্যই সবাই আগ্রহী হলো। ঠিক হলো সদ্য নির্মিত বান্দরবানের লামা উপজেলায় অবস্থিত ওয়াইট পিক স্টেশন রিসোর্টেই হবে এবারের আনন্দ ভ্রমণ।
দুদিনের এই ট্যুর পরিকল্পনায় ছিল মানিকপুর থেকে রিসোর্ট পর্যন্ত নৌকা ভ্রমণ, নুনারঝিরি পাহাড় ভ্রমণ, নুনারঝিরি ঝর্ণাতে গোসল, মাতামুহুরি নদী পার হয়ে মারমা গ্রাম মিনঝিড়ি পাড়ায় ভ্রমণ। সেসাথে ছিল র্যাফেল ড্র, গান-আড্ডার আয়োজন।
বৃহস্পতিবার কাক ডাকা ভোরেই চবি ক্যাম্পাস থেকে আমরা বেড়িয়ে পড়লাম বান্দরবানের উদ্দেশে। যেহেতু এবার আমরা গাড়ী রিজার্ভ করিনি তাই কয়েকবার গাড়ী পরিবর্তন করতে হলো।
প্রথমেই বাসে করে মুরাদপুর, সেখান থেকে লেগুনায় করে নতুন ব্রিজ। এখান থেকেই আমরা চেপে বসলাম চকরিয়াগামী বাসে। চকরিয়া পৌঁছে আমরা সকালের নাস্তা খেয়ে নেই। এরপরে সিএনজিতে চড়ে আমরা যাই মানিকপুর। আমরা পৌঁছার আগেই তৈরি ছিলো ইঞ্জিনচালিত নৌকা। মাতামুহুরি পার হয়ে অবশেষে আমরা আসলাম আমাদের গন্তব্য ওয়াইট পিক স্টেশন রিসোর্টে। এখানেই আমরা কাটিয়েছি আমাদের ট্যুরের দুদিন।
অপরূপ নুনারঝিরি পাহাড় :
রিসোর্টে পৌঁছে আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। এরপর সবাই মিলে নুনারঝিরি পাহাড়ে আরোহণ করলাম। গাঢ় সবুজ পাহাড় থেকে আশেপাশের দৃশ্য মনোরম লাগছিল। পাহাড়ের উপর তৈরি করা ঐতিহ্যবাহী ‘মাচাং ঘর’ থেকে অপরূপ দেখাচ্ছিল চারপাশ। কেউ এদৃশ্য অবলোকন করেছে, কেউবা করছিল ‘ক্যামেরাবন্দী’। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নেমে এলো ঝুম বৃষ্টি। তখন পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে খুঁজে পেলাম অন্যরকম এক প্রশান্তি। প্রায় ঘন্টা খানেক পাহাড়ের বিচিত্র শোভা দেখে অবশেষে নেমে আসি আমরা।
মারমা গ্রাম মিনঝিড়ি পাড়া :
বিকেলে আমরা মাতামুহুরি নদী পার হয়ে ঘুরতে গেলাম স্থানীয় মারমা গ্রাম মিনঝিড়ি পাড়ায়। খুব বেশী বড় না হলেও নতুন কিছু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি আমরা। পাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ে সামাজিক মানচিত্র। সেখানে দেওয়া তথ্য মতে, মোট পরিবারের সংখ্যা - ৪১, জনসংখ্যা - ২১৩ জন। যার মধ্যে নারী -১০৯ জন, পুরুষ -১০৪ জন। নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে বেঁচে আছে এপাড়ায় বসবাস করা এসব মানুষ। অসম্ভব মিশুক তারা। তাদের জীবনের নানা গল্পও শুনালেন আমাদের।
নুনারঝিরি ঝর্ণার শীতল জলে অবগাহন :
শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমরা রওনা দিয়েছি নুনারঝিরি ঝর্ণার উদ্দেশে। নুড়ি পাথর, কাঁটা-সংকুল পথ মাড়িয়ে আমরা এসেছি ঝর্ণায়। বয়ে চলা নুনারঝিরির শীতল জলে যেন শৈশবের আনন্দ খুঁজে পেলাম। ঝর্ণার কলকল শব্দ আর শীতল অনুভতি যেন নতুনভাবে প্রাণিত করে।
এমন মুহূর্তের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে অনেকেই ‘ক্যামেরাবন্দী’ হয়েছেন। বেশ কিছুক্ষণ কাটানোর পর আবারও পাহাড়ি পথ ধরে আমরা ফিরে আসি রিসোর্টে। সকালের নাস্তা শেষে অনুষ্ঠিত হয় র্যাফেল ড্র। এবার আমাদের ব্যাগ গুছিয়ে ফেরার পালা। বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আবারও মনে করছিলাম দুদিনের স্মৃতি। মনে হলো এই দুদিন বহুবছর পরেও স্মৃতি হয়ে ফিরে আসবে।
রাজু








