৮ ই মার্চ পালিত হলো আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বাংলাদেশেও এ উপলক্ষ্যে সেদিন বিভিন্ন সভা, সেমিনার ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়েছে। নারীদের নিয়ে আমরা যে সব সংগঠন গুলো কাজ করছি তারাও বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের দাবী দাওয়া গুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। প্রতিশ্রুতিও শুনি। তারপর নারী দিবস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সকল অঙগীকার, প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন সবই অধরা হয়ে যায়।
আমি যদিও আলাদা ভাবে নারী দিবস পালনের পক্ষে নই, তবে বর্তমান সময়ে এসেও যখন ঢাকায় ৬ বছর বয়সী শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা, নরসিংদীতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর খুনের মত ঘটনা দেখি তখন মনে হয় দরকার আছে একটা দিবসের ও দরকার আছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন থানায় নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় সাত হাজার ৬৮টি মামলা হয়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সহিংসতা, নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৮৫১ নারী ও শিশু। উত্ত্যক্তকারীদের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৯৩ নারী। ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৭৪৯টি। ভুক্তভোগীদের বড় অংশ শিশু-কিশোরী। বছরজুড়ে এক হাজার ২৪ শিশু নানাভাবে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯ শিশুকে। যেখানে এখন ও নারী মানুষ নয় শুধুই নারী তখন হোক না একটা দিন নারীর।
নারীরা এখনো নানা দিক থেকে, নানান ভাবে বঞ্চিত। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে।
মূলত :প্রতিনিয়ত রাস্ট্র, সমাজ নারীর ক্ষমতায়নের বুলি আউড়ালেও সে লক্ষ্যে কেউ কাজ করে না এটাই বাস্তবতা। ফলে একটি বিশেষ দিনে যদি বিশেষভাবে আবার মনে করিয়ে দেয়া যায় নারীর ক্ষমতায়ন এবং অধিকারের বিষয় গুলোকে তাহলে মন্দ নয়।
এবারের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল "Give to Gain", পরিবর্তনের নেতৃত্ব দান। পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সমর্থনের শক্তির উপর জোর দেয়।
নারীর উন্নয়নের জন্য রাস্ট্র, সমাজ,প্রতিষ্ঠান এবং রাস্ট্রের মানুষ যদি উদারভাবে এগিয়ে আসে এবং সুযোগ তৈরি করে তবে নারীর উন্নয়ন সম্ভব এবং এর ফলে দেশ ও এগিয়ে যাবে।
কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবচিত্র হলো আমরা এখনো পুরষতান্ত্রিক মনোভাবে আটকে আছি। এখনো রাজনীতি থেকে শুরু করে সর্বত্র নারীকেই টার্গেট করা হয়।নারী মূলত কোথাও নিরাপদ নয়।।নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নারীকে নেতৃত্বের জায়গায় আনতে হবে, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে, উপরন্তু নারীর নিরাপত্তার বিষয় নিশ্চিত করতে হবে৷ কিন্তু যা থেকে আমরা অনেক দূরে।এখনো নারীর ক্ষমতায়ন কাঙক্ষিতভাবে দেখতে পারছিনা।
এটা বুঝতে আমাদের বেশী দূরে যেতে হবে না,একটু ১২ ই ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনের দিকে যদি তাকাই, জুলাই সনদের বিধান অনুযায়ী, সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনের বাইরে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে ৩০০ আসনের মধ্যে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল ।
জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য ৫ শতাংশ আসন রাজনৈতিক দলগুলো সংরক্ষিত রাখতে একমত হলেও বাস্তবে, তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। যেখানে, আমাদের অর্থনীতিতে নারীদের ৫০ শতাশের বেশী অবদান রয়েছে। সেখানে ৫ শতাংশ অনেকটাই দয়া দাক্ষিণ্য ছাড়া কিছুই নয়৷ কিন্তু সেখানেও গলদ।
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যানের চিত্র অনুযায়ী দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী ছিল না । বিএনপিসহ কোনো দলই ১০ জনের বেশি নারীকে মনোনয়ন দেয়নি,এবং যাদের বেশীরভাগ এসেছেন উত্তরাধিকার সুত্রে।
এমনকি যে রাজনৈতিক দল তাদের নেতৃত্বের ৪০% নারী বলে প্রকাশ্যে দাবি করেছে তাদের দল থেকেও কোন নারীকে মনোনয়ন দেয়া হয়নি।বলাই বাহুল্য, এতে করে পুরো রাজনৈতিক পরিসরে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে যে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে , তা ছিল মূলত প্রতীকী ও সীমিত।
অন্যদিকে,নির্বাচনের আগে আগে নারীকে অবমাননা করে একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষ থেকে নানান সময়ে নানান ধরনের কথা বলতে দেখা গেছে। নারীকে নেতৃত্বের জায়গায় আনা যাবে না এমনটাই মত প্রকাশ করতে দেখেছি আমরা। এমন যখন রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টিভঙগী সেখানে নারীর ক্ষমতায়নের ভাবনা দিনশেষে তলানিতেই থেকে যাবে এমনটাই স্বাভাবিক।
অথচ, জাতীয় সংসদে নারীর অংশগ্রহণ ও তাদের নেতৃত্ব, নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এক মাইলফলক হিসেবে ক্ষমতায়নের দ্বারকে শুধু উন্মোচিতই করেনা বরং নারীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়তা করে। কারণ নারী নেতৃত্ব ছাড়া ক্ষমতায়ন অসম্ভব।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল অধিকার নয়, বরং উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। তারা যখন নীতিনির্ধারণে অংশ নেয় তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশুকল্যাণ, নারীশ্রম ও সমানাধিকারের মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পায়। নারী তার অধিকার আদায়ে একটি প্ল্যাটফর্ম পায়।
নারীর ক্ষমতায়ন, নেতৃত্ব বিকাশ শুধু যে একটা সামাজিক ন্যায় এর বিষয় তা নয়, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম ভিত্তি। নারীর উন্নয়ন ছাড়া জাতির সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
নারীর প্রতিনিধিত্ব কেন গুরুত্বপূর্ণ এ সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, রাজনীতিতে নারীদের সংখ্যা বাড়লে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। ২০২১ সালের কোলোরাডো বোলডার বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা দেখা গেছে, সংসদে নারীরা প্রভাবশালী হলে সাধারণত দেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ে।
একইভাবে ২০২০ সালের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চলের দেশগুলোর সংসদে নারীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিশু মৃত্যুহার হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার কারটিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা সুপারিশ করেছিলেন, যেসব সংসদে নারীর সংখ্যা বেশি, সেসব সংসদ শক্তিশালী জলবায়ু নীতিমালা তৈরি কতে পারে।
ফলে, নারী যদি নীতিনির্ধারণে তার অবস্থান সংহত করতে না পারে, তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন আশা করা যায় না। যদি কারও স্ত্রী, সন্তান হয়ে নারী প্রতিনিধিত্ব করেন এবং কাজ সেভাবেই এগিয়ে চলে তবে সেটাকে নারীর ক্ষমতায়ন বলা যাবে।
সাবিনা স্যাবি
শিক্ষক, সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যম অধ্যায়ন, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারম্যান, পাওয়ার অব শি ট্রাস্ট
রাজু








