রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অবিশ্বাস্য নাটক না নষ্ট রাজনীতি

প্রকাশিত : ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • কামাল লোহানী

মাদাম জিয়া ফার্স্ট লেডি থাকাকালে তার স্বামী রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে তারই সহযোদ্ধারা হত্যা করলেও তার বিকৃত দেহাবয়ব দেখতেও পারেননি, তখনও কিন্তু বেশ শক্তই ছিলেন, জ্ঞানহারা হননি অথবা ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়নি। হঠাৎ কোকোর হার্টফেলের খবরে বেগম সাহেবা এতটাই ‘ক্যামন’ হলেন যে তাকে ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে ঘুমিয়ে রাখলেন। ঠিকই তো, প্রধানমন্ত্রী হাসিনার আসাতেও তার সে ঘুম ভাঙল না। তো হাসিনা খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে কী আর করবেন, চলে যেতে

বাধ্য হলেন

আমার এক বান্ধবী টেলিফোনে বললেন, ‘আসলেই আমরা মহিলা।’ কথাটা শুনে প্রথমে চমকে উঠলাম। তাকেই শুধোলাম, ‘সেকি, একি কথা বলছো? কেন তুমি কি নিজেকে অন্য কিছু ভাবতে?’ ভদ্রমহিলা বললেন, ‘মহিলারা একে অন্যকে হিংসে করে। চুলোচুলি করে, গালমন্দ করে। এমনকি কখনও কখনও হাতাহাতিও করে। কিন্তু দেখলাম, সত্যিই তাই। যত উপরেই উঠুক না কেন, খাসলত যায় না মলে।’ কথা যে সত্য, তাই উপলব্ধি করলাম।

বাংলাদেশের অসংখ্য টেলিভিশনে তাই প্রত্যক্ষ করছিলাম যে দৃশ্য, তারই প্রতিক্রিয়ায় ভদ্র মহিলা এমন মন্তব্য করলেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর হঠাৎ মৃত্যুর খবরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ১৪ দলীয় নেত্রী মহাজোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুলশান দু’নম্বরের ৮৬ নম্বর বাড়ি- বিএনপি চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন পুত্রশোকে সমবেদনা জানাবার জন্য। গিয়ে দেখলেন কার্যালয়ের গেট খোলা থাকলেও তখন বন্ধ ছিল। কেউ খুললেন না। তোফায়েল-আমু এগিয়ে গেলেন কথা বলার জন্য, কার সঙ্গে যেন কথাও বললেন। কিন্তু হদিস মিলল না। হাসিনা গাড়ি থেকে বের হলেন। এগিয়ে গেলেন। তবু কেউ এলেন না গেটটা খুলতে। কেউ বোধহয় (বিএনপি নেতৃবৃন্দের কেউ নন) বললেন, ম্যাডামকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে, কারণ পুত্রশোকে মুহ্যমান। হতেই পারে। অতীত ইতিহাস যতটুকু জানি, মাদাম জিয়া ফার্স্ট লেডি থাকাকালে তার স্বামী রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে নৃশংসভাবে তারই সহযোদ্ধারা হত্যা করলেও তার বিকৃত দেহাবয়ব দেখতেও পারেননি, তখনও কিন্তু বেশ শক্তই ছিলেন, জ্ঞানহারা হননি অথবা ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হয়নি। হঠাৎ কোকোর হার্টফেলের খবরে বেগম সাহেবা এতটাই ‘ক্যামন’ হলেন যে তাকে ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে ঘুমিয়ে রাখলেন। ঠিকই তো, প্রধানমন্ত্রী হাসিনার আসাতেও তার সে ঘুম ভাঙল না। তো হাসিনা খানিকটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে কী আর করবেন, চলে যেতে বাধ্য হলেন।...এমনতরো পরিকল্পিত অবমাননা হজম করলেন কী করে হাসিনা? অবশ্য ঘুম উবেছিলেন হাসিনা চলে যাবার পর, তখন নাকি খালেদা দুঃখ প্রকাশ করে কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন। সত্যিই কতটা সুজন খালেদা, তার ঘুমিয়ে থাকার সময় কার্যালয়ের বাইরের গেটে দাঁড়িয়ে থেকে দেখা করতে না পারায় প্রধানমন্ত্রী হাসিনা চলে গেছেন বলে সৌজন্যের খাতিরে দুঃখপ্রকাশ করেছেন।

ভাল না মন্দ জানি না। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা পুত্রশোকে নিশ্চয়ই কাতর খালেদাকে সমবেদনা জানাতে আসছেন এটা প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে জানানো হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর আগমনজনিত সকল রকম নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশকিছু আগে থেকেই নেয়া হচ্ছিল। এসএসএফ এবং বিজিবিসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও মোতায়েন ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আসবার কয়েক মিনিট আগে চেয়ারপার্সনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস গেটের সামনে এসে গণমাধ্যমকে কোকোর মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে জনগণের দোয়া চান এবং এ সংবাদে কাহিল খালেদা জিয়া বিহ্বল ও কাতর বলে চিকিৎসক নাকি তাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন বলে জানান এবং তড়িঘড়ি অফিসে ঢুকে যান। অনেকের মতো আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে রওনা হয়েছেন শুনে বিশেষ সহকারী ওই ঘোষণা দেন। এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যখন কিছুক্ষণ পরই প্রধানমন্ত্রী চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে এসে পৌঁছলেন। ...আমরা যাঁরা টেলিভিশন দেখছিলাম অপেক্ষায় রইলাম দেখি এবার কী হয়! ভাবছিলাম, বিএনপি নেত্রী যদি সত্যিই অসুস্থ হয়ে থাকেন তাহলে অন্য নেতা যারা ওখানে আছেন বা ম্যাডামের ব্যক্তিগত স্টাফ তারা অন্তত প্রধানমন্ত্রীকে কার্যালয়ের নিচতলায় নিয়ে বসাবেন সৌজন্য সহকারে; তারপর তাঁকে ম্যাডাম সম্পর্কে জানাবেন। ওই অবস্থাতেই যদি হাসিনা তাকে দেখতে চান তাহলে হয়ত এতদূর এসে তাকেই চোখের দেখা দেখে যেতে পারতেন এবং পরে সুস্থ হলে আবার আসতেন। কিন্তু না কেউ সৌজন্যের দায়বোধ করলেন না। বরঞ্চ বলব দেশের প্রধানমন্ত্রীকে গেটের বাইরে থেকেই চলে আসতে হলো। কী বিচিত্র! চলে যাবার পর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে এ আচরণকে শিষ্টাচারবর্জিত বললেন। বললেন, এটা রাজনীতি নয়, এক মা আরেক মায়ের শোকে সমবেদনা দেখাতে চেয়েছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীও। তথ্য উপদেষ্টা একে অমানবিক বলেও বর্ণনা করেছেন। তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া টেলিভিশনে দেখে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস কোত্থেকে একটা খাতা নিয়ে গেটে এসে দাঁড়ালেন। তারপর ওটা দেখিয়ে বললেন, আমি এই ভিজিটার্স বুক আনতে আনতে এসে দেখি প্রধানমন্ত্রী অপেক্ষা না করেই চলে গেছেন। মনে হলো আমার, উনি বোধহয় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে ভিজিটার্স বুকে বক্তব্য লেখাতে চেয়েছিলেন। কেবল খাতা দেখালেইতো হয় না। প্রধানমন্ত্রীকে তো তাহলে ভেতরে বসানো উচিত ছিল। তা না করে বিশ্বাস সাহেব খাতা আনতে ছুটে গেলেন গেটে দাঁড়িয়েই প্রধানমন্ত্রীকে সমবেদনা লেখানোর জন্য? পক্ষে যুক্তিটা দেখিয়ে বেশ উত্তেজিত কণ্ঠস্বরেই এ নিয়ে ‘রাজনীতি’ না করতে অনুরোধ জানিয়ে ‘নির্দেশ’ দিলেন এবং গণতন্ত্রের আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিলেন। ভাবটা হলো প্রধানমন্ত্রী ‘আন্দোলন না করার’ কথা বলতে এসেছিলেন।

ঘটনাস্থলের দৃশ্যে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মঈন খান, মেজর জেনারেল (অব) ইব্রাহিম, কর্নেল অলি- এরা সবাই ছিলেন। ব্যারিস্টার রফিক আন্দোলন নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলেছেন। খালেদা জিয়ার দুই ভ্রাতৃবধূ কোকোর মৃত্যু সংবাদ নিয়ে খালেদা জিয়ার কাছে যান। তারাও ভেতরে ছিলেন। কাগজে পড়লাম- বেগম সাহেবা ঘুম থেকে জেগেই নাকি দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তবে কেন তাকে ডাকা হলো না, তা বলেননি বোধহয় (ওটাতো বলার কথা নয়)।

যাঁরা টেলিভিশনে এই নাটকীয় দৃশ্য দেখছিলেন, তাঁরা মন্তব্য করছিলেন, আদৌ কি খালেদা জিয়া ঘুমিয়েছিলেন ইনজেকশনের ঘোরে? নাকি প্রধানমন্ত্রী আসছেন শুনেই অসুস্থতার ভান করছিলেন এবং সঙ্গীদের ওই কথা বলে তাঁকে দরজা নয় গেট থেকেই বিদায় করতে চেয়েছিলেন।

আরাফাত রহমান কোকো মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। স্ত্রী ও দুই কন্যাকে রেখে গেছেন। তারা কোকোর সঙ্গে গত সাত বছর ধরে মালয়েশিয়াতে ছিল। কোকো জীবদ্দশায় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না অথবা রাজনীতিতে তাকে আসতে দেয়া হয়নি। ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। ১/১১-এর সময় মায়ের সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিল। অসুস্থতার জন্য প্যারোলে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যায়। প্যারোল শেষ হয়ে গেলেও দেশে ফিরতে পারেনি, কারণ মানিলন্ডারিংয়ের দুর্নীতির মামলা ছিল তার নামেও। তার বিদেশে পাচার করা বেশ বড় অঙ্কের টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না থাকলেও বিএনপি নেত্রীর পুত্র হওয়ায় কোকোর মৃত্যু সংবাদে স্বেচ্ছানির্বাসিত কিংবা আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা যারা আন্দোলন ডেকেও মাঠে থাকে না, সে সব নেতারা বিএনপি চেয়ারপার্সনের শোকে সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য তার গুলশান কার্যালয়ের সামনে জমায়েত হন।

খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী বলেছিলেন, ‘দেশনেত্রী’ সুস্থ হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এপিএসকে তারিখ-সময় ঠিক করে জানিয়ে দেয়া হবে। দেখা যাক, সেই দৃশ্যে কী অভিনীত হয়। প্রতীক্ষায় থাকলাম। অভিজ্ঞ মহলের তো মনে হয় এরপর প্রধানমন্ত্রীর আর গুলশানে যাবার প্রশ্ন আসে না। যদি যান তবে তা হবে তাঁর উদারতা। আওয়ামী লীগ দল হিসেবেও শোক জানিয়েছে। শুনলাম, বেগম খালেদা জিয়া সত্যিই অসুস্থ। তবে কেন তিনি আজও সেখানে অবস্থান করছেন। তাঁকে তো ভাল একটা হাসপাতালে কিংবা সিএমএইচে স্থানান্তর করা উচিত। যেন শোকবিহ্বল মা তার কোন শঙ্কায় না পড়েন, এটা দেখাও রাষ্ট্রের কর্তব্য। সরকার যদি কোন ব্যবস্থা নেয়, তবে তার জন্য আবার রাজনৈতিক কূটক্যাচাল হওয়া ঠিক হবে না। বলবেন না যে, কৌশলে তাকে বন্দী করা হচ্ছে। ...এসব নাটক জনগণ দেখতে চান না।

পুনশ্চ : রবিবার ব্যারিস্টার মওদুদ এক ব্রিফিংয়ে বলেছেন- ‘প্রধানমন্ত্রীকে যথোপযুক্ত সম্মান না দেখানো সঠিক হয়নি।’ তিনি আরও বলেছেন, এ ব্যাপারে খালেদা জিয়া নাকি একেবারেই অজ্ঞাত ছিলেন। তখন তিনি প্রায় অজ্ঞানের মতন ছিলেন। ব্যারিস্টার মওদুদ স্থায়ী কমিটির সদস্য, দলের একজন দায়িত্বশীল নেতা। তিনি বললেন, ‘অজ্ঞানের মতন’। অথচ শিমুল বিশ্বাস বলেছিলেন, ম্যাডাম অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তাকে ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। ...তাহলে কোন্্টা ঠিক বলে আমাদের মানতে হবে? আগে থেকে রিহার্সেল দিয়ে কথা বললে ভাল হয়, কথায় মিল থাকে; তাই না? ...জামায়াতের এক তুখোড় সাংবাদিক (তিনি কখন কোন নেতা বনে যান তা বলা মুশকিল) খালেদা যে সত্যিই ঘুমিয়ে ছিলেন তা বেশ জোর দিয়েই বললেন, উনি নাকি জানেন। মওদুদের চেয়েও বেশি জানেন বলে মনে হচ্ছে।

আত্মগোপনে না কোথায় থাকেন তিনিই জানেন, তার নাম রিজভী আহমদ।

তাঁকে বিএনপির সবচেয়ে ‘বাচাল’ বলব না ‘বাকপটু’ বলব জানি না। তিনি তো গায়েবী আওয়াজ করে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা খালেদা জিয়ার নির্দেশে অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন হররোজ। এবার তিনি প্রধানমন্ত্রীর গুলশানে যাওয়াকে ‘ছলনা’ বলে উল্লেখ করেছেন। কী নিকৃষ্ট মনমানসিকতা! দেশের প্রধানমন্ত্রী শোক জানাতে গেলেন, তাকেও সমালোচনা করতে ছাড়লেন না। ভদ্রতা, শিষ্ঠাচার-সব কিছুরই সীমা আছে। বিএনপি নেতৃবৃন্দের বোঝা উচিত সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে টানতে টানতে তা একদিন ছিঁড়ে যাবে।

প্রকাশিত : ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৫/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: