ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১

বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা

বরিশালে আটদিনে আটজনের মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল

প্রকাশিত: ১৫:৫১, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

বরিশালে আটদিনে আটজনের মৃত্যু

ম্যাপে বরিশাল

পারিবারিক কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, অভিমান এবং হতাশাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করে বরিশালে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এরমধ্যে চলতি মাসের গত আটদিনে আটজন ব্যক্তি বিষপান ও গলায় রশি বেঁধে আত্মহত্যা করেছেন।

তবে পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশি আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। পাশাপাশি অতীতের ন্যায় এবারও জেলার মধ্যে আগৈলঝাড়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির জন্য সামাজিক অবক্ষয় এবং বিদেশী সংস্কৃতিকে দায়ী করেছেন সচেতন মহল।

বরিশাল জেলার সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, সামাজিক অবক্ষয় এবং বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাবেই আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। তিনি আরও বলেন, বিদেশী টিভি সিরিয়াল নারীদের আত্মহত্যার পথে নিয়ে যাচ্ছে। একজন মানুষ যখন তার জীবনের সাথে পেরে উঠছে না এবং মারাত্মকভাবে হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ছেন তখনই আত্মহত্যার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছেন।

শেবাচিম হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মাহাবুব আলম মীর্জা বলেন, প্রতিটি মানুষই গলায় ফাঁস কিংবা বিষপানের পরে বাঁচার জন্য প্রাণপন শেষ চেষ্টা করেন। তিনি আরও বলেন, যখন কোনো ব্যক্তির জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক ও উপলব্ধি-অনুধাবন শক্তি লোপ পায়, নিজেকে অসহায়-ভরসাহীন মনে করেন, তখনই ধর্ম-কর্ম ভুলে মানুষ আত্মহত্যা করে বসে। এজন্য প্রচন্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপও কাজ করে। আবার জাগতিক দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে আত্মরক্ষায় দুর্বল চিত্তের ব্যক্তিরা ভ্রান্তধারনা থেকে আত্মহননের মধ্যদিয়ে মুক্তি খোঁজে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ গত ৮ ফেব্রুয়ারী সকালে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন মিজানুর রহমান (৫২) নামের এক প্রবাসী। বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া এলাকার সামছুল আলমের ছেলে মিজানুর রহমানকে বাকেরগঞ্জের কামারখালি বাজারের ভাড়াটিয়া বাসার ফ্যানের সাথে ঝুলতে দেখে তার স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী ফাতেমা রহমান ডাকচিৎকার শুরু করেন। খবর পেয়ে থানা পুলিশ তিন সন্তানের জনক মিজানুর রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করেন। বাকেরগঞ্জ থানার ওসি মাকসুদুর রহমান বলেন, আত্মহত্যার সঠিক কারণ জানা যায়নি।

একইদিন (৮ ফেব্রুয়ারী) বিকেলে দাম্পত্য কলহের জেরধরে স্ত্রী ওয়াহিদা আক্তারের সাথে অভিমান করে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন সাইফুল ইসলাম (৩৫) নামের এক যুবক। বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর ইউনিয়নের ওলানকাঠী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করেছেন।

গত ৭ ফেব্রুয়ারী আগৈলঝাড়া উপজেলায় একদিনে তিনজনে আত্মহত্যার জন্য বিষপান করেছে। এদেরমধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করেছেন।

 হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ছোট ভাই মুন্নার সাথে সকালের নাস্তা খাবার নিয়ে ঝগড়ার পর অভিমানে রাজিহার ইউনিয়নের ভাজনা বাহাদুরপুর গ্রামের ইউনুস আলীর মেয়ে হাফিজা আক্তার (১৫) কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেছে। একইদিন পারিবারিক কলহের কারণে উপজেলার মুড়িহার গ্রামের মনির বেপারীর স্ত্রী শাহিনুর বেগম (৪৫) ও সুজনকাঠি গ্রামের বাবুল দে’র মেয়ে অঙ্কিতা দে (১৮) আত্মহত্যার জন্য বিষপান করে। মুমূর্ষ অবস্থায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গত ৬ ফেব্রুয়ারী দুপুরে গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নের দক্ষিণ পশ্চিমপাড়া গ্রামের গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে নুপুর মন্ডল (২৪) নামের এক কলেজ ছাত্রী। ওই গ্রামের সুধীর মন্ডলের মেয়ে বিএম কলেজের মাষ্টার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নুপুর মন্ডলের সাথে পার্শ্ববর্তী হরহর গ্রামের পরিমল দাসের ছেলে পঙ্কজ দাসের দীর্ঘদিন থেকে প্রেমের সম্পর্ক চলে আসছিলো। তারা সুখের সংসার করার জন্য উভয়পরিবারের অজান্তে কোর্ট ম্যারেজও করেছিলো। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর দুই পরিবারের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। এতে অভিমান করে নুপুর মন্ডল ঘরের আড়ার সাথে গলায় রশি দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।

একইদিন সকালে সুদের টাকা আদায়ের জন্য মারধর ও অপমান করার অভিমানে আত্মহত্যার জন্য বিষপান করে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জসিম ঘরামী (৩২) নামের এক মাহেন্দ্রা চালকের মৃত্যু হয়েছে। জসিম গৌরনদী উপজেলার দক্ষিণ কমলাপুর গ্রামের ইসহাক ঘরামীর ছেলে।

গত ৫ ফেব্রুয়ারী ভোরে বিভিন্নরোগে আক্রান্ত হয়ে অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে বাড়ির পাশের একটি গাছের সাথে গলায় রশি বেঁধে আত্মহত্যা করেছে বিধান মজুমদার নামের এক যুবক। মৃত বিধান আগৈলঝাড়া উপজেলার বড়শাইল গ্রামের সতীশ মজুমদারের ছেলে।

৩ ফেব্রুয়ারী রাতে আগৈলঝাড়া উপজেলার রত্নপুর গ্রামের ভ্যানচালক বিপ্লব চৌধুরীর মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী পায়েল চৌধুরী তার মায়ের সাথে অভিমান করে গলায় ওড়না পেচিয়ে ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারী রাতে পড়াশুনার জন্য গালমন্দ করায় বাবা ও মায়ের সাথে অভিমান করে ঘরের ফ্যানের সাথে ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছে নবম শ্রেনীর ছাত্রী খাদিজা আক্তার। সে (খাদিজা) আগৈলঝাড়া উপজেলার আমবৌলা গ্রামের হাবিব মৃধার মেয়ে।

টিএস

×