ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ০৭ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩

যুগোপযোগী পরিবেশ নীতির কার্যকরী বাস্তবায়নে স্বতন্ত্র পরিবেশ ক্যাডার প্রবর্তন জরুরি

মিনহাজুর রহমান শিহাব 

প্রকাশিত: ১৪:২৯, ১৮ আগস্ট ২০২৪; আপডেট: ১৪:৩০, ১৮ আগস্ট ২০২৪

যুগোপযোগী পরিবেশ নীতির কার্যকরী বাস্তবায়নে স্বতন্ত্র পরিবেশ ক্যাডার প্রবর্তন জরুরি

পরিবেশ সংরক্ষণ

১৯৭২ সালে স্টকহোম কনফারেন্স অন হিউম্যান এনভায়রনমেন্ট এর পরপরই বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে প্রথম পরিবেশ সংরক্ষণে উদ্যোগ  গ্রহণ করা হয় এবং ১৯৮৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর  নামে পূর্নগঠন হয়। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতের লক্ষ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশের গুরুত্ব ১৯৯২ সালের রিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সারা বিশ্বের সম্মুখে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে। একইভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারও এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে পরিবেশ বিষয়ক বিভিন্ন কনভেনশন এবং চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। যার ধারাবাহিকতায় শিল্পায়নের সাথে সাথে বাংলাদেশের পরিবেশ যাতে বিপন্ন না হয় সেজন্য সরকার পরিবেশ বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। 

এ জনবল তৈরির নিমিত্তে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়টি চালুর উদ্যোগ নেয়। ফলস্বরূপ, ১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,  ২০০০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ে বিএসসি ও এমএস ডিগ্রী চালু হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এবং কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে এ বিষয়ে কোর্স ও ডিগ্রি চালু করেছে। 

১৯৮৯ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশে বিভিন্ন পরিবেশ বিষয়ক নীতি এবং আইন যেমন- Environmental Policy 1992, Environmental Conservation Act 1995, Environment Conservation Rules 1997 ইত্যাদি কার্যকর হওয়াতে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ রক্ষায় আরো কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পরিবেশ সচেতনতায় বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে সন্তোষজনক নয়, সামগ্রিকভাবে প্রতিজন হিসেবে বর্জ্য উৎপাদন এবং বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে দূষণের মাত্রা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দূষণ রোধকল্পে এবং জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনের নিয়ামক সমূহকে নিয়ন্ত্রণের নিমিত্তে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রমের পরিধি বেড়েছে। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে 'জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (বিসিসিটি) -২০১০' নামে একটি ট্রাস্ট স্থাপন করা হয়েছে। 

মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান-এমসিপিপি ২০২২-২০৪১ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা দূর করে সহিষ্ণুতা এবং সবুজ উন্নয়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রণীত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গৃহীত যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা অভিযোজন, সহিষ্ণুতা, স্বল্প-কার্বন পথ এবং ক্ষয়ক্ষতির জন্য প্রযুক্তিগত এবং আর্থিক সহায়তার এক উচ্চাভিলাষী এজেন্ডা। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ  অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলায় পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক রাজনীতিতে সবুজ জলবায়ু তহবিল (Green Climate Fund) এর অর্থ আদায়ে সচেষ্ট হতে হলে পরিবেশ বিজ্ঞান বিষয়ে দক্ষ স্নাতকধারী অবশ্যম্ভাবী। তাছাড়া নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিভিন্ন যুগোপযোগী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতকধারীদের অগ্রাধিকার প্রদান হতে পারে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের নবযুগের সূচনা। 

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তথা পরিবেশের বিভিন্ন উপাত্তের মান যাচাই, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ, বিভিন্ন দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে পরিবেশ রক্ষার প্রকৃত দায়িত্বে পরিবেশ বিজ্ঞানের স্নাতকধারীরাই কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, Environmental Impact Assessment (EIA), Environmental Management Plan (EMP), Effluent Treatment Plant (ETP) ইত্যাদি স্থাপন সহ এর সক্ষমতা যাচাই ও মনিটরিং টেকসই পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ও শিল্পায়নের পূর্বশর্ত, যা একজন দক্ষ পরিবেশ বিষয়ক পেশাজীবি ছাড়া নির্ভুলভাবে করা অসম্ভব কারণ এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান শুধুমাত্র পরিবেশ বিজ্ঞানের স্নাতকধারীরাই তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ভাবে শিখে থাকে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠক ও নেগোসিয়েশন যেমন, Conference of Parties (COP) এর সম্মেলনসমূহে বাংলাদেশের পক্ষে আরো যৌক্তিকভাবে দাবী তুলে ধরার জন্য পরিবেশ বিজ্ঞানের স্নাতকধারীরাই সবচেয়ে ভাল বিকল্প হতে পারে। 
আর এজন্য চাই দক্ষ পরিবেশ বিষয়ক সরকারি পেশাজীবি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো যুগের চাহিদা অনুযায়ী বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশ বিজ্ঞানের সরকারি পেশাজীবীর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলেও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)-এ কারিগরি বা পেশাগত ক্যাডারসমূহের মধ্যে পরিবেশ ক্যাডার এর কোন পদ অদ্যাবধি সৃষ্টি হয়নি। 

বন অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুইটি সমগুরুত্বসম্পন্ন অধিদপ্তর হওয়া সত্ত্বেও বিসিএস (বন) নামে স্বতন্ত্র ক্যাডারে বন অধিদপ্তরে 'সহকারী বনসংরক্ষক' পদে, বনবিদ্যায় স্নাতকধারীদের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের বিধি থাকলেও, পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে একইভাবে কোন স্বতন্ত্র ক্যাডারে 'সহকারী পরিচালক' পদে পরিবেশ বিজ্ঞানের স্নাতকধারীদের নিয়োগের বিধি অদ্যাবধি হয়নি। অধিকন্তু, বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পদটিতে বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের গ্র্যাজুয়েটধারীদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে এবং সেখানেও পরিবেশ বিজ্ঞানের স্নাতকধারীদের কোনরূপ অগ্রাধিকার নেই। 

আবার অন্যদিকে 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ের স্নাতকশ্রেণীর পাঠ্যক্রম অনুযায়ী মৃত্তিকা, পানি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা বিস্তারিত পড়াশুনা সম্পন্ন করে থাকলেও 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ে স্নাতকধারীরা বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় পরিবেশ বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কারিগরি বা পেশাগত ক্যাডারসমূহে আবেদন করতে পারছেনা। উদাহরণস্বরূপ, বিগত বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, বিসিএস (কৃষি) ক্যাডারের অধীনে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট-এ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান' বিষয়ের স্নাতকধারীরা আবেদন করতে পারলেও 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ের স্নাতকধারীরা এই পদে আবেদন করতে পারেনি। একইভাবে, বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী বিসিএস (বন) ক্যাডারে সহকারী বনসংরক্ষক পদে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পাশাপাশি 'মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশবিজ্ঞান' বিষয়ের স্নাতকধারীরা আবেদন করতে পারলেও 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ের স্নাতকধারীরা এই পদে আবেদন করতে পারেনি। ফলে সরকারি কর্মক্ষেত্রে 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ের স্নাতকধারীরা চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। বর্তমানে দেশের ২৪ টি জেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত থাকলেও সেখানে 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ে স্নাতকধারীদের সংখ্যা খুবই নগণ্য এবং পরিচালক পদে সেগুলোর একটিতেও 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ের স্নাতকধারী নেই। 

এমতাবস্থায় ভবিষ্যতের মান-সম্মত পরিবেশ ও বাসযোগ্য নগরের জন্য তথা টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশের গতি ত্বরান্বিত করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের 'সহকারী পরিচালক' পদটি ক্যাডার সার্ভিসে বিসিএস (পরিবেশ) হিসেবে অন্তর্ভুক্তিপূর্বক শুধুমাত্র 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রীধারীদের জন্য স্বতন্ত্র বিসিএস (পরিবেশ) ক্যাডার সংরক্ষণ করা এবং একইসাথে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় বর্তমানে বিদ্যমান পরিবেশ বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট কারিগরি বা পেশাগত ক্যাডারসমূহে নিয়োগের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র 'পরিবেশ বিজ্ঞান' বিষয়ে চার বৎসর মেয়াদী বি.এসসি. (অনার্স) ডিগ্রীধারীদের জন্য বিসিএস (পরিবেশ) ক্যাডার সংরক্ষণ এবং সেই হিসেবে পরিবেশ বিজ্ঞান এর স্নাতকধারীদের অন্তর্ভুক্তির নিমিত্তে সরকারি নিয়োগ নীতি পরিবর্তন করা অপরিহার্য। 

কেননা পরিবেশ সুরক্ষা ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক যদি একজন পরিবেশ বিজ্ঞানে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানে সক্ষমতা সম্পন্ন না হন, তাহলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পরিবেশ সুরক্ষা ও যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ দাবিতে ভালো ফলাফল আশা করা অনেকটাই অযৌক্তিক। তাই স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে  সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকারি কর্মক্ষেত্রে পরিবেশ বিজ্ঞানে স্নাতকধারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে বিসিএস (পরিবেশ) ক্যাডার প্রর্বতন অপরিহার্য। 

লেখক: শিক্ষার্থী ও গবেষক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রী এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
 

 এসআর

×