মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আহলান সাহলান মাহে রমাদান

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫
  • প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

আরবী চান্দ্র সনের নবম মাস হচ্ছে রমাদান। এই মাসকে আল্লাহ্্ জাল্লা শানুহু সিয়াম পালন করার জন্য নির্ধারণ করে বিধান নাযিল করেন ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্য শা’বানে। এর আগে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দশ তারিখে অর্থাৎ আশুরার দিনে সিয়াম পালন করেছেন। রমাদানের বিধান নাযিল হলে আশুরার সিয়াম নফল সিয়াম হিসেবে বিবেচিত হয়। আশুরার সিয়াম নফল সিয়ামগুলোর মধ্যে উত্তম। রমাদান মাসব্যাপী দৃঢ়প্রত্যয় গ্রহণ করে সুবিহ সাদিকের পূর্বক্ষণ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যাবতীয় পানাহার, কামাচার ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার নামই সওম বা সিয়াম। সওম শব্দের অর্থ বিরত থাকা। রিপুসমূহকে দমন করার এ এক অনন্য উপায়, যা আল্লাহ্্ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সিয়াম মূলত আল্লাহ্্ জাল্লা শানুহু প্রদত্ত এক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা যা গ্রহণ করার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধে বলীয়ান হওয়া যায়। এবং আল্লাহ্র সন্তুষ্টি হাসিল করা যায়। এর দ্বারা আত্মশুদ্ধি লাভ হয়, নিজেকে সংযমী করে তোলা যায়, তাছাড়াও মানুষের প্রতি মানুষের পারস্পরিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত হয়, সহমর্মিতা, সমবেদনা ও সহানুভূতির মহাপ্রশিক্ষিত হওয়া যায়। যারা এই মহা সুযোগকে গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয় তাদের শুধু দুর্ভাগা বললে বোধহয় যথেষ্ট হবে না বরং তাদের মনুষ্য বলা যাবে কিনা সেটাও ভেবে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা এবং সেই অনুযায়ী আমল করা ছেড়ে দিল না তার এই পানাহার ত্যাগ সিয়াম করায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই (বুখারী শরীফ)। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের রমাদানের পূর্ব মাস শা’বানের শেষ দিন বিকাল বেলায় রমাদানের আগমনী বার্তা ঘোষণা করে প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত সকলের সামনে রমাদান ও সিয়ামের গুরুত্ব, মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য তুলে ধরেন। হযরত সালমান র্ফাসী রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু থেকে বর্ণিত আছে যে, শা’বান মাসের শেষদিনে রসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম আমাদের উদ্দেশে এক খুতবায় বললেন : হে মানুষ! তোমাদের ছায়া দিতে আবির্ভূত হচ্ছে মহান মুবারক মাস। এই মাসে রয়েছে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম রজনী।

এ মাসের সিয়ামকে আল্লাহ্্ ফরয করে দিয়েছেন। এ রাতে দ-ায়মান হওয়াতে (তারাবীর সালাত আদায়ে) রয়েছে সওয়াব। যে ব্যক্তি এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করবে, সে অন্য মাসে একটি ফরয আদায় করার সমান সওয়াব পাবে, আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করবে, সে অন্য মাসে সত্তরটি ফরয আদায়ের সমান সওয়াব লাভ করবে। এটা ধৈর্যের মাস আর ধৈর্যের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। এটা সহমর্মিতার মাস। আর এটা হচ্ছে সেই মাস যাতে বৃদ্ধি করা হয় মুমিনের রিয্্ক। যে ব্যক্তি এ মাসে কোন সায়িমকে (রোযাদার) ইফতার করাবে সে ব্যক্তির জন্য তা গোনাহ্ মাফ পাবার এবং দোযখের আগুন থেকে মুক্তি পাবার হেতু হয়ে যাবে। এছাড়া তার সওয়াব হবে সেই সায়িমের সমান কিন্তু সায়িমের সওয়াব একটুও কমে যাবে না। আমরা (সাহাবায়ে কেরাম) জিজ্ঞাসা করলাম : হে আল্লাহুর রাসূল আমাদের মধ্যে অনেকেরই সায়িমকে ইফতার করানোর মতো সামর্থ্য নেই। তখন হযরত রসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেন, পেট ভর্তি করে খাওয়াতে হবে এমনটা নয়, আল্লাহ তা’আলা তাকেই সওয়াব দান করবেন যে সায়িমকে এক চুমুক দুধ অথবা এক টুকরো খেজুর কিংবা এক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করাবে।

আর যে ব্যক্তি কোন সায়িমকে তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়াবে আল্লাহ তা’আলা তাকে আমার হাউদ (হাউযে কওসার) থেকে পানি পান করাবেন, যার ফলে সে জান্নাতে দাখিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তৃষ্ণার্ত হবে না। এ এমন এক মাস যার প্রথমাংশে রহমতের, মধ্যাংশ মাগফিরাতের আর শেষাংশ দোযখের আগুন থেকে মুক্তির। আর যে ব্যক্তি এ মাসে চাকর-বাকরদের (অধীনস্থ) কাজের ভার (বোঝা) লাঘব করে দেবে আল্লাহ্্ তা’আলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন এবং দোযখ থেকে তাকে নাযাত দান করবেন (বায়হাকী, মিশকাত শরীফ)। রমাদান মাসের প্রাক্কালে প্রিয় নবী রসুলুল্লাহ্্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ঐ খুতবায় রমাদান মাসের মাহাত্ম্য যেমন তুলে ধরেছেন তেমনি এই মাসে যেসব বরকত ও প্রাচুর্য রয়েছে তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।

ঐ খুতবায় সহিষ্ণুতা বা ধৈর্যের উল্লেখ করে তিনি বলেছেন : ধৈর্যের (সরব) প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত। অন্য একখান হাদীসে আছে যে, হযরত রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আস্সিয়ামু জুন্নাতুন ফালা ইয়ারফুস্, ওয়ালা ইয়াজহাল্্ ওয়া ইন অমরুউন ফা আতালাহু আও শাতামাহু ফালইয়াকুল ইন্নী সায়িমুন র্ম্রাাতায়নÑ সিয়াম হচ্ছে ঢাল। সুতরাং অশ্লীলতা করবে না এবং মূর্খের মতো কাজ করবে না। যদি কেউ ঝগড়া করতে চায় কিংবা গালি দেয় তাহলে দুইবার বলতে হবে আমি সায়িম (বুখারী শরীফ)। এর দ্বারা এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ঝগড়া বিবাদ, পরনিন্দা, পরচর্চা, সন্ত্রাসী কর্মকা-, অশ্লীল কথাবার্তা ও কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার একটা মহাপ্রশিক্ষণ রমাদান মাসে সিয়াম পালন করার মধ্য দিয়ে লাভ হয়।

যদি কেউ লোক দেখানো সিয়াম রেখে বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের পথ করে নেয়, যদি কেউ পণ্যসামগ্রীতে ভেজাল দিয়ে মোটা অঙ্কের লাভ আদায় করতে চায়, যদি কেউ ওজনে কম দিয়ে লোককে ঠকায় তাহলে সে আদতে মুবারক মাস রমাদানকেই কেবল অবজ্ঞা করে না, সে নিজে নিজেকেই যেন হত্যা করে, তাকে কোন অবস্থাতেই মানুষ বলা যায় না। মনে রাখতে হবে যে, রমাদান মাসকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম শাহ্্রুল মুওয়াসাত অর্থাৎ সহমর্মিতার মাস বলেছেন। এই মাসে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের প্রশিক্ষণ লাভ হয়। মানুষ মানুষের জন্যÑ এই যে কথা প্রায়ই বলা হয় সেটা সঠিকভাবে রপ্ত করে বাস্তবায়নের প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ সিয়াম পালনের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়।

এই মাসেই প্রকৃতপক্ষে আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম, সহিষ্ণুতা, মানবপ্রীতি ইত্যাদি গুণ অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ আসে। এ মাসেই কেবল একটি নফল অর্থাৎ ঐচ্ছিক কোন ইবাদত কিংবা ভাল কাজ করলে তার সেই ঐচ্ছিকটা অন্য মাসের বাধ্যতামূলক কাজের সওয়াব লাভের সমান হয়ে যায়। রমাদানের সিয়াম সম্পর্কে একখানি অতি গুরুত্বপূর্ণ হাদীসে কুদসী রয়েছে। আল্লাহু তা’আলা ইরশাদ করেন : সে (সিয়াম) আমার জন্য তার খাওয়া দাওয়া, পানীয় পান, কামাচার প্রভৃতি পরিত্যাগ করে, সিয়াম আমারই জন্য এবং আমি নিজেই তার প্রতিদান দেব (বুখারী শরীফ)। অন্য একখানি হাদীসে আছে যে, হযরত রসুলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যখন রমাদান মাসের প্রথম রাত আসে তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করেন; ইয়া বাগিইয়াল খায়রি আকবিল (হে কল্যাণকামী এগিয়ে যাও), ইয়া বাগিইয়াল র্শাগি আকসির (হে মন্দান্বেষী স্তব্ধ হও) (তিরমিযী শরীফ)।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা.), সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ

প্রকাশিত : ১৯ জুন ২০১৫

১৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: