রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নোয়াখালীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শিবির কর্মী নিহত

প্রকাশিত : ৭ এপ্রিল ২০১৫
  • সারাদেশে বিজিবি মোতায়েন, জামায়াত অধ্যুষিত জেলাগুলোতে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের ফাঁসি বহাল রাখা এবং জামায়াতের তরফ থেকে দু’দিনের টানা হরতাল ডাকার কারণে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি সারাদেশে বিজিবি মোতায়েন থাকছে। প্রস্তুত থাকছে র‌্যাবের হেলিকপ্টার। আদালতের রায়ের পর থেকেই জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত জেলাগুলোতে কর্ডন পদ্ধতিতে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে। অভিযানকালে নোয়াখালীতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে একজন শিবির নেতা নিহত ও পাঁচ পুলিশসহ সাতজন আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় একজনসহ দু’জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

নোয়াখালী সংবাদদাতা জানান, সোমবার বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে জেলা সদরের রওশন বাণী সিনেমা হলের সামনে জামায়াত-শিবির পুলিশের ওপর আচমকা চোরাগোপ্তা হামলা চালায়। হামলাকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও বোমা নিক্ষেপ করতে থাকে। আচমকা হামলায় হতভম্ব হয়ে যায় পুলিশ। হামলায় অন্তত পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। অতর্কিতে হামলার ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের ওপর আরও জোরালো হামলার চেষ্টা করে। এ সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। তাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়ে। এ সময় জামায়াত-শিবির ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি ও সংঘর্ষ হয়। গুলিতে শিবির নেতা ওমর ফারুকের (২৫) মৃত্যু হয়। আহত অবস্থায় রাকিব (২২) ও রাসেল (২০) নামে দুই যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাকিবকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তার বাড়ি জেলা শহরের মাইজদী বাজার এলাকায়। রাসেল বেগমগঞ্জের এখলাসপুরের নুরুল কাদেরের ছেলে।

এদিকে যুদ্ধাপরাধ মামলার সংশ্লিষ্ট বিচারক, আইনজীবী, সাক্ষী, প্রসিকিউটর এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ব্যক্তির নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশের বহু স্থাপনায় বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা।

সোমবার সকালে যুদ্ধাপরাধ মামলায় কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ করে ফাঁসিতে মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রাখে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ। এর প্রতিবাদে জামায়াত আজ (মঙ্গলবার) ও বুধবার সারাদেশে ৪৮ ঘণ্টার হরতালের ডাক দেয়।

স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জনকণ্ঠকে বলেন, সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্ব বিবেচনা করেও অনেক জায়গায় বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা থাকছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতাও। যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী হরতালের ডাক দেয়ার পর থেকেই সারাদেশে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারকে ঘিরে। কারাগারের চারদিকে অন্তত ৫০টি উঁচু ভবনের ছাদে বসানো হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। কারাগারের চারদিকে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আশপাশের রাস্তাগুলোতে যানবাহন চলাচলের ওপর বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। প্রতিটি রাস্তার মোড়ে বাড়তি চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চলছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও বস্তুতে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে দফায় দফায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। অযাচিত ব্যক্তি ও যানবাহন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের আশপাশে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপকমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। পাশাপাশি নানা ধরনের বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধ মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশের পর দেশের জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত জেলাগুলোতে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাতে পুলিশসহ ৭০ জন নিহত হন। আহত হন অন্তত এক হাজার।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপির ডাকা দেশব্যাপী টানা অবরোধ আর বিচ্ছিন্ন হরতালে সবচেয়ে বেশি নাশকতামূলক ঘটনা ঘটেছে জামায়াত-শিবিরের প্রভাব থাকা জেলাগুলোতে। ককটেল আর পেট্রোলবোমা হামলা করে জীবন্ত পুুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে দেড় শতাধিক মানুষকে। আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ। আহতদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক মানুষকে চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে। এখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন অনেকেই। ভাংচুরসহ অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে তিন হাজারেরও বেশি যানবাহনে। এসব যানবাহনের মধ্যে যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এছাড়া অন্তত ৮ দফায় ট্রেনে, ৭ দফায় লঞ্চে, ২৫টি ভূমি অফিসে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের। ভাংচুর, অগ্নিসংযোগসহ লুটপাট করা হয়েছে বহু নেতাকর্মীর বাড়িতে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখার প্রতিবাদে ডাকা হরতালে জামায়াত-শিবির তাদের প্রভাব থাকা জেলাগুলোতে আবারও তা-ব চালাতে পারে। এজন্য রায় বহাল রাখার ঘোষণার পর পরই যশোর, সাতক্ষীরা, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, পঞ্চগড়, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ জামায়াত-শিবিরের প্রভাব থাকা জেলাগুলোতে ব্লক রেড পদ্ধতিতে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে। মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তা-ব চালিয়ে জামায়াত-শিবির সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের কোন্দলের জের ধরে সংঘর্ষের ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে প্রপাগা-া চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।

বিভিন্ন জেলা থেকে আমাদের নিজস্ব সংবাদদাতারা জানান,

নারায়ণগঞ্জ ॥ বিকেল চারটার দিকে শহরের ডন চেম্বার এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোলবোমা মেরে আগুন দেয় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। নবাব সলিমুল্লাহ সড়কে ৩০ থেকে ৩৫ জামায়াত-শিবিরকর্মী ঝটিকা মিছিল করে। মিছিল থেকে আচমকা ঢাকা-পাগলা-নারায়ণগঞ্জ সড়কে যাতায়াতকারী নিউ আনন্দ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে তাতে পেট্রোলবোমা মারে। জনতা ইউসুফ আলী সুমন নামে এক শিবিরকর্মীকে ধরে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। সুমন বন্দরের মেরিন টেকনোলজির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

সাতক্ষীরা ॥ হরতাল ও অবরোধে উস্কানি দেয়ার দায়ে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মিজানুর রহমান মোড়ল (৪২) নামে এক জামায়াতকর্মীকে চার মাসের কারাদ- দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সোমবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ মাহবুবুর রহমান এ আদেশ দেন। সাজাপ্রাপ্ত মিজানুর রহমান উপজেলার চাঁদকাঠি গ্রামের খোদাবক্স মোড়লের ছেলে। তিনি উপজেলা জামায়াতের সক্রিয় কর্মী।

নোয়াখালীতে বৃহস্পতিবার হরতাল ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, নোয়াখালীতে শিবির-পুলিশ সংঘর্ষে ওমর ফারুক নামের এক শিবির নেতা নিহতের ঘটনায় আগামী বৃস্পতিবার সকাল-সন্ধ্যা জেলাতে হরতালের ডাক দিয়েছে শিবির। সোমবার সন্ধ্যায় নোয়াখালী জেলা ছাত্র শিবিরের পক্ষ থেকে হরতালের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা দক্ষিণ সেক্রেটারি জিয়াউল হক জিয়া।

তিনি আরও জানান, পুলিশ বিনা কারণে শান্তিপূর্ণ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে। এতে কাদির হানিফ ইউনিয়নের একটি উপ-শাখার সভাপতি ও নোয়াখালী পৌর শিবিরের সাথী ওমর ফারুক নিহত হয়েছে। মঙ্গলবার ও বুধবার কেন্দ্রীয়ভাবে হরতালের ঘোষণা থাকায় শুধুমাত্র নোয়াখালী জেলাতে আগামী বৃহস্পতিবার সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দেয় জেলা শিবির।

প্রকাশিত : ৭ এপ্রিল ২০১৫

০৭/০৪/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: