মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এই মানুষখেকো ডাইনি বিতাড়নের ওঝারা কোথায়?

প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারী ২০১৫
  • মমতাজ লতিফ

আজ সেই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ও ৩ নবেম্বরের ভয়াল দানব উত্থানের কালটিকে স্মরণে পড়ছে! মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে, দীর্ঘকালের জেল-জুলুম-নির্যাতন, বৈষম্য সহ্য করে, জীবন উৎসর্গে ব্রতী বিপুল মানুষের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানী নীলনক্সার অনুসরণে পিছিয়ে নেবার সূচনা ঘটিয়েছিল যে দানবরা তাদের চেহারা দিনে দিনে জাতির কাছে আজ স্পষ্ট হয়েছে! আজ তাই তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত প্রবীণ প্রজন্মকে প্রশ্ন করছে- কোন মুক্তিযোদ্ধা কি কখনও জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে? কোন মুক্তিযোদ্ধা কি মুক্তিযুদ্ধের সফল পরিচালকদের জেলখানায় বন্দী অবস্থায় ঠা-া মাথায় খুন করতে পারে? মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা, যুদ্ধশিশু না খেয়ে, রোগে ভুগে মারা যাবে আর যুদ্ধাপরাধীরা সমাজে ধনসম্পদ অর্জন করে বলীয়ান হবে, সন্তানদের উচ্চশিক্ষা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করবে, শাসকে পরিণত হবেÑ এ অন্যায়, মানবতার রীতি ভাঙ্গা অন্যায়কে আমরা প্রত্যাখ্যান করি। এই সঙ্গে প্রবীণদের সমঝোতার রাজনীতি আমরা মানি না। মুক্তিযুদ্ধের অসম্পন্ন কাজÑ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে তাদের সর্বোচ্চ দ- কার্যকর করে তবেই আমরা ঘরে ফিরব। যুদ্ধাপরাধী-মিত্রদের বাংলাদেশবিরোধী জনগণের রক্তখেকো, মানুষবেশী ডাইনি ও দানবদের প্রাণভোমরার জান কবজ করে, তাদের নির্মূল করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ করব। বাংলাদেশের অস্তিত্বের বিপক্ষের সব অশুভ শক্তিকে বিতাড়িত করে তবেই আমরা আমাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব সম্পন্ন করতে সক্ষম হব।

পাঠকের মনে পড়বে ১৯৭৬-৯৬ পর্যন্ত জিয়া, এরশাদ, খালেদাÑ এরা তিন স্বৈরশাসক, সেনাশাসক ও গণতন্ত্রের লেবাসধারী যুদ্ধাপরাধী-মিত্র, জঙ্গীমাতা খালেদার শাসনকাল ছিল বাংলাদেশের পেছনে চলার কলঙ্কজনক অধ্যায়। মাঝে ১৯৯৬-২০০১, যখন দীর্ঘ একুশ বছর পর মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে শাসন ক্ষমতায় আসে, তখনই কেবল সফল অর্থমন্ত্রী শাহ কিবরিয়াসহ সফল কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আরও অনেকে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশকে দ্বিতীয়বার মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ও আদর্শে প্রতিষ্ঠিত করার এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে সফল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। এই উন্নয়নকে ধূলিসাত করে ২০০১-এ নির্বাচনী ফল দখলকারী খালেদা-নিজামী-তারেক নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট! শুধু দুর্নীতি নয়, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রিত্ব প্রদান, সবরকম সুযোগ-সুবিধা-ক্ষমতা প্রদান, তাদের উদ্যোগে জেএমবি, হরকত-উল-জিহাদ, হিযবুত তাহরীর, আহলে হাদীস ইত্যাদি মৌলবাদী জঙ্গী দলের উত্থান ঘটিয়ে সারাদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী, হিন্দু ও আদিবাসীদের জানমালের ওপর অব্যাহত হত্যাকা-, হামলা-ধর্ষণ পরিচালনা করে বিশ হাজারের বেশি আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হত্যা করেছে। এর মধ্যে দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহ মাস্টার, শাহ এএমএস কিবরিয়া, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভী রহমানসহ ২৩ নেতাকর্মী, হুমায়ুন কবীর, মমতাজ উদ্দীন, মানিক সাহাসহ প্রায় ত্রিশের বেশি প্রগতিশীল সাংবাদিক নিহত হয়েছেন! শেখ হাসিনা তাঁর দেহরক্ষীর প্রাণের বিনিময়ে অলৌকিকভাবে প্রাণে বাঁচেন! এরা, খালেদা-নিজামী-তারেক বাংলাদেশে ভারতীয় জঙ্গী উলফা ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জঙ্গীদের অবাধে আস্তানা গাড়া ও দুই প্রতিবেশী দেশে হামলা পরিচালনা করে নিরাপদ পার্বত্য অঞ্চলের আস্তানায় ফিরে এসে বসবাসের স্থায়ী আবাসের বন্দোবস্ত করে! এই সময়েই খালেদা-তারেকের রক্তপিপাসু চরিত্র উদ্ঘাটিত হয় এবং জনমনে তারা দুর্নীতিবাজ ছাড়াও ‘জঙ্গীমাতা’ ও ‘জঙ্গীভ্রাতা’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে!

এরপর ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারি সংবিধান অনুসারে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে খালেদা-তারেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে যাবে না বলে দাবি তোলে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, শেখ হাসিনা সংলাপের আহ্বান করেন এবং একটি সংবিধানসম্মত ব্যবস্থা খুঁজে বের করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্রসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় বিএনপিকে প্রদানের ইচ্ছা প্রকাশ করে সরকার। কিন্তু দেশী-বিদেশী কোন ফর্মুলাই খালেদা-তারেক গ্রহণে অসম্মত হন, যদিও বিএনপির অন্য সদস্যবৃন্দ আওয়ামী লীগের সঙ্গে একটি সমঝোতায় প্রায় পৌঁছে গিয়েছিল।

স্মর্তব্য, খালেদা-তারেক নিজেরাই নির্বাচন বর্জন করে সে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাধা দিতে গিয়ে শুরু করে ২০১৩-এর নবেম্বর, ডিসেম্বর, ২০১৪’র জানুয়ারির অদৃষ্টপূর্ব, চরম অমানবিক পেট্রোলবোমা ছুড়ে কার, সিএনজি, বাস, ট্রাক, রেলের চালক-যাত্রীদের জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারার নব্য আলবদরীয় কায়দায় হত্যাকা- সংঘটন, হাজার হাজার বৃক্ষ উৎপাটন, রাজপথ কেটে খাল-পুকুর-তৈরি, রেললাইন উৎপাটন, পুলিশ-বিজিবি নিধন, হিন্দু নারী ধর্ষণ, তাদের বসতঘর, ক্ষেত-খামার জ্বালিয়ে দেয়া, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী হত্যা, তাদের জীবিকা, ব্যবসায় অগ্নিসংযোগ! ’৭১-এ মানুষ পথে-ঘাটে, নদীতে নৌকায় পালাতে পেরেছিল। ২০১৩-তে বাঙালী-পাকিস্তানী নেতা খালেদা ঘরে-বাইরে বাঙালী নিধনে মত্ত ছিল! এর আগে একদিকে খালেদা হেফাজতের ‘তেঁতুল হুজুরের’ দলের হাজার হাজার সদস্য, শিবির-বিএনপি ক্যাডারদের সহযোগিতায় ঢাকায় মতিঝিলে একদিন এক রাত যে তা-ব, অগ্নিকা-, কোরান পোড়ানো, বৃক্ষ, দালান-অফিস-গাড়ি, রাজপথ ধ্বংস করে সরকার পতনের চেষ্টা করেছিল, তা একটি স্থানে কেন্দ্রীভূত বর্বরতার কলঙ্কজনক উদাহরণ!

’৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে ’৭১-এর ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হলে গণআদালত থেকে শুরু করে এর সব সমাবেশ খালেদা ভ-ুল করার নির্দেশ দিয়েছেন, যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে তার বাজেয়াপ্ত করা নাগরিকত্ব ফেরত দিয়েছেন এবং গণআদালতের উদ্যোক্তা-আয়োজক দেশের ২৪ জন বরেণ্য ব্যক্তিকে গ্রেফতারের আদেশ দিয়েছিলেন, যেটি বিচারপতি হাবিবুর রহমানের হস্তক্ষেপে বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু আদেশটি জাহানারা ইমাম মাথায় নিয়ে মারা গেছেন! এই ভূমিকাগুলো কি তাকে যুদ্ধাপরাধী-মিত্র প্রমাণ করে না?

স্মরণ করতে হবেÑ এই খালেদার ’৯৬-২০০১ পর্যন্ত সময়ে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নাশকতা ও ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা সংঘটনের বিষয়ও। এ সময়ে কাজী আরেফসহ অনেককে হত্যা করেছিল সে সময়ে জন্ম নেয়া হরকত-উল-জিহাদ ও অন্য জঙ্গীগোষ্ঠী। এ সময়েই তাদের দ্বারা বাংলাদেশে প্রথম সংঘটিত হয় পহেলা বৈশাখের ছায়ানটের প্রভাতি অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, যাতে হতাহত হয় অনেক বাঙালী! অন্যদিকে পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার দু’বছরের মাথায় গঠিত হয় পার্বত্য শান্তি চুক্তিবিরোধী-ইউপিডিএফ গোষ্ঠী বিরোধীদলের প্রশ্রয়ে, যার সবই বিএনপির উদ্যোগে সংঘটিত হয়। প্রায় প্রতিদিন দেশের নানা জেলায় এ সময় সংঘটিত হয়েছে অসংখ্য নাশকতামূলক জাতির উন্নয়নবিরোধী অপতৎপরতা।

এ প্রসঙ্গে পাঠককে আরেকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দিতে আহ্বান করব। ইউরোপের দেশে দেশে, জার্মানিতে হিটলারের অভ্যুত্থান যে সময়ে ঘটেছিল সে সময়ের জার্মানির ও ইউরোপের সুশীল সমাজ ও রাজনীতিকদের হিটলারের প্রতি নীরব প্রশ্রয়, নিষ্ক্রিয়তাকেই প্রধান কারণ বলে আজ বলা হয়। আজ ভাবলে শিউড়ে উঠি, যদি সে সময় সোভিয়েত রাশিয়ায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হতো, যদি লেনিনের পর স্ট্যালিনের মতো নেতা না থাকত, তাহলে হিটলারের ইউরোপ দখলের কি করুণ অবস্থা হতো! যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য মিত্র বাহিনীতে থাকা সত্ত্বেও ‘ফল অব বার্লিন’ প্রধানত রুশজাতি, সেনা ও স্ট্যালিনেরই অবদান! দ্রুতই ইউরোপকে নাজিমুক্ত করতে সংঘটিত হয়েছে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালে বিচার ও ফাঁসি হয়েছে প্রধান নাজি নেতাদের, নাজি দলের। দ্রুতই ইউরোপজুড়ে সব দেশে নাজিবাদ নিষিদ্ধ হয়েছে। ইউরোপে একজন ব্যক্তিও যদি আজ নাজিবাদকে সমর্থন করে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সে রাষ্ট্রদ্রোহী হবে, দ-িত হবে। বাংলাদেশেও বঙ্গবন্ধু সংবিধান দ্বারা এমনই যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মভিত্তিক জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন। ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছিল, বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসন কাজ পুরোদমে চালু ছিল, দেশী-বিদেশী ব্যক্তি, সংস্থা যুদ্ধশিশুদের দত্তক নিচ্ছিল, দেশ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের বিশাল কর্মযজ্ঞের পাশে বঙ্গবন্ধু, তাঁর সরকার এবং সংবিধান প্রণেতারা জাতির জন্মের শত্রুদের নির্মূল করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ভুল করেননি। তাহলে পাশার দান উল্টে দিল কে? কারা? ’৭৫-এর খুনীরা এবং তাদের মদদদাতা মুশতাক এবং জিয়াউর রহমান। এখন বর্তমানে জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে কে? নিরীহ নিরাপরাধ মানুষকে পেট্রোলবোমা ছুড়ে মারার নির্মম, বর্বর পন্থায় জাতির উন্নয়নে কর্মরত সরকার পতনের ডাক দেয় যে, বলা বাহুল্য, সেই খালেদা জিয়া আর তাঁর হুকুমদাতা তারেকই জাতির প্রধান শত্রু। তিনি যেমন একদিকে নিজের, তারেকের দুর্নীতি, হত্যাকা-ের পরিকল্পক ও হুকুমদাতার অপরাধের মামলা থেকে আত্মরক্ষা করতে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছেন, তেমনি তাঁর আদর্শিক মিত্র-যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতেও আজ উন্মত্ত। আজ যদি একজন বিচ্ছু জালাল থাকত, তাহলে তাঁর যোগ্য পরিণাম ’৭১-এর মোনেম খানের মতোই হতো। তাঁর নির্দেশে ছোড়া পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হয়ে নিহত শতাধিক নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরের হত্যার জন্য খালেদার বিচারই এখন সময়ের একমাত্র দাবি।

জনগণের প্রশ্নÑ এই রক্তখেকো, মানুষখেকো ডাইনির দেশান্তর, জেল অথবা ফাঁসির দ- হবে না কেন, যদি সাধারণ একজন ব্যক্তির হত্যাকারীর ফাঁসির দ-ের বিধান থাকে? অবিলম্বে জাতির শত্রুকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হোক।

সুশীলদের বলব, ধরে নিন দেশে এক মূর্তিমান মহিলা হিটলার মানুষকে ধরে ধরে হত্যা করছে, ডাইনির মতো রক্ত পান করছে তখন কি ‘গণতন্ত্র, গণতন্ত্র’ বা ‘সংলাপ সংলাপ’ বলে মূর্খামির কোন অবকাশ থাকে? তখন যার যা আছে তাই দিয়ে ওই দানবীকে হত্যা করার বিকল্প কিছু আছে কি? ভাল করে জানেন, এটি ব্যালট বাক্সে ভোট দেয়া নয়, এটি পরিষ্কার একটি যুদ্ধক্ষেত্র, হয় বাঁচবেন, নয় মরবেন। জানবেন, দানব-দানবী মানুষকে কোন ছাড় দেয় না। জনগণ অপেক্ষায়- এই মানুষখেকো ডাইনি বিতাড়নের ওঝারা কোথায়?

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক

প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারী ২০১৫

২০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: