রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জাতীয় স্মৃতিসৌধের নক্সা প্রণয়নের সেই হাত থেমে গেল চিরতরে

প্রকাশিত : ১১ নভেম্বর ২০১৪
জাতীয় স্মৃতিসৌধের নক্সা প্রণয়নের সেই হাত থেমে গেল চিরতরে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ চিরতরে বিদায় নিলেন জাতীয় স্মৃতিসৌধের নক্সাকার স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দুপুরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬২ বছর। একুশে পদকপ্রাপ্ত এই স্থপতি দুই মেয়ে ও এক বোনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মাইনুল হোসেনের বন্ধু বদরুল হায়দার জানান, মৃত্যুর পর সোমবার মাইনুল হোসেনের মরদেহ রাখা হয় বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে। তাঁর এক মেয়ে ও বোন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। তাঁরা দেশে ফেরার পর মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হবে মাইনুল হোসেনকে।

সৈয়দ মাইনুল হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ বিশিষ্টজনরা। এছাড়া বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকেও শোক জানানো হয়েছে।

শোক বাণীতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক জাতীয় স্মৃতিসৌধের নক্সা তৈরির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির প্রতি যে অবদান রেখেছেন জাতি তা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে স্থপতি মাইনুল হোসেনের অনন্য সাধারণ নক্সায় নির্মিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ বাংলা এবং বাঙালী জাতির সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী শোকবার্তায় মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক আব্দুল্লাহ আল শাফি মজুমদার জানান, রবিবার বেলা ১১টায় মাইনুল হোসেনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তখন তিনি প্রায় অচেতন অবস্থায় ছিলেন। ভর্তির আধা ঘণ্টার মধ্যেই বোর্ড গঠন করে তাঁর চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা হয়। তাঁর ডায়াবেটিস ছিল খুবই অনিয়ন্ত্রিত। সেই সঙ্গে রক্তচাপ ছিল খুবই কম। এরপরও আমরা হতাশ না হয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টার মাধ্যমে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি। অবশেষে সোমবার দুপুর আড়াইটায় তিনি মারা যান।

১৯৫২ সালের ৫ মে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ির দামপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মাইনুল হোসেন। তাঁর বাবা মুজিবুল হক ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই প্রকৌশল বিদ্যায় পড়াশোনার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন মাইনুল। সেই আশার প্রতিফলন ঘটিয়ে ১৯৭০ সালে তিনি ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগে। এরপর ১৯৭৬ সালে মাইনুল প্রথম শ্রেণীতে স্থাপত্যবিদ্যায় ডিগ্রী লাভ করেন। শিক্ষাজীবন শেষে ইএএইচ কনসালটেন্ট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করলেও কয়েক মাসের মধ্যে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ কনসালট্যান্ট লিমিটেডে। মাইনুল হোসেনের আরেক পরিচয় তিনি কবি গোলাম মোস্তফার দৌহিত্র।

বাঙালীর স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রতীক, মহান মুক্তিযুদ্ধের সাতটি গৌরবময় অধ্যায় যার মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে সেই স্মৃতিসৌধের নক্সা এঁকে বাঙালীর মানসপটে চিরস্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছেন মাইনুল হোসেন। ১৯৭৮ সালে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের চূড়ান্ত নক্সা আহ্বান করা হলে মোট ৫৭টি নক্সা জমা পড়ে। এর মধ্যে মাইনুল হোসেনের আঁকা নক্সাটিই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয় এবং সে অনুযায়ী নির্মিত হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এরপর থেকেই দেড় শ’ ফুট উঁচু ওই মিনারটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূর্তপ্রতীক হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৫৪ সালে জন্ম নেয়া মাইনুল হোসেন যখন স্মৃতিসৌধের নক্সাটি জমা দেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। এত অল্প বয়সে এমন অসাধারণ নক্সা আঁকার মাধ্যমে রেখেছেন অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর।

১৯৭৬ সাল থেকে ২২ বছরের কর্মজীবনে মাইনুল হোসেন বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নক্সার কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ সব নক্সার মধ্যে রয়েছে ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (১৯৭৭), বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ভবন (১৯৭৮), চট্টগ্রাম ইপিজেড কার্যালয় (১৯৮০), জাতীয় জাদুঘর (১৯৮২) ও উত্তরা মডেল টাউন (১৯৮৫)। এরপর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই স্থপতি, নক্সা করেছেন বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার। আর এ সব অনন্য কীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৮ সালে সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

প্রসঙ্গত, জীবনের শেষ দিনগুলোতে মানসিকভাবেও পুরোপুরি সুস্থ ছিলেন না মাইনুল। প্রচারের আড়ালে একেবারেই নিভৃতে একাকী জীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। বসবাস করতেন শান্তিনগরের বাসভবনে।

প্রকাশিত : ১১ নভেম্বর ২০১৪

১১/১১/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: