দুর্বৃত্তদের মারধরে প্রাণ গেছে তাঁর। ঘুম থেকে তুলে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সঙ্গে থাকা ৪০ হাজার টাকাও নিয়ে গেছে তারা। সেই টাকা তিনি জমিয়েছিলেন ২৫ বছরে—ভিক্ষা করে, স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম পরিষ্কার করে, একেকটি দিন পার করে।
মৃত্যুর আগে ক্ষতবিক্ষত মুখ নিয়ে বুবি স্টেশনের একটি চেয়ারে বসেছিলেন। নীরবে। নিরুত্তাপ দৃষ্টিতে। যেন এই পৃথিবীর প্রতি তাঁর আর কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ভাষা নেই।
বুবির গল্প অন্যরকম। কারণ সত্তর বছরের জীবনে তিনি কোনোদিনই ভাষা দিয়ে নিজের কথা বলতে পারেননি। একটি পূর্ণাঙ্গ বাক্যও না। বাক্প্রতিবন্ধী এই নারী ২৫ বছর আগে ট্রেনে চড়ে এসে নেমেছিলেন মেথিকান্দা স্টেশনে। তারপর আর কোথাও যাননি। স্টেশনই হয়ে উঠেছিল তাঁর আশ্রয়, তাঁর জীবন, তাঁর নীরব বসতি।
কোথা থেকে এসেছিলেন তিনি? কেন এসেছিলেন? কারো প্রতি অভিমান করে, নাকি জীবনের কোনো অনিবার্য আঘাতে ভেসে এসে ঠেকেছিলেন এই স্টেশনে? মেথিকান্দা স্টেশনে নেমে তিনি আর ফিরে গেলেন না কেন? কার কাছে আর ফেরেননি? তিনি কি এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরে ঘুরে জীবন থেকেই পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন? যদি তা-ই হয়, তবে মেথিকান্দাতেই থেমে গেলেন কেন? কিসের অপেক্ষায় ছিলেন—কোনো প্রিয়জনের, আরেকবার পালিয়ে যাওয়ার সুযোগের, নাকি মৃত্যুর?
২৫ বছরে বুবি জমিয়েছিলেন ৪০ হাজার টাকা। হিসাব করলে, প্রতিদিন গড়ে ৪ টাকা ৩৮ পয়সা। সামান্য এই অঙ্কের মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক জীবনের দীর্ঘ সংযম, কঠোর পরিশ্রম আর অদৃশ্য স্বপ্ন। এই টাকা দিয়ে তিনি কী করতে চেয়েছিলেন—তার উত্তর আর জানা হবে না। হয়তো কোনোদিন একটি ছোট্ট জমি কিনবেন ভেবেছিলেন। হয়তো নিজের জন্য একটি ঘর। হয়তো অন্য কারো জন্য কিছু রেখে যেতে চেয়েছিলেন। হয়তো মৃত্যুর পর নিজের কবরের জায়গাটুকু নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। এসব প্রশ্নের উত্তর আর কেউ জানবে না।
বুবি যেমন নীরবে মেথিকান্দা স্টেশনে এসেছিলেন, তেমনি নীরবেই চলে গেলেন। হয়তো প্রথম দিকে কেউ টেরই পায়নি, নতুন দুটি পা প্রতিদিন এই প্ল্যাটফর্মে হাঁটে। তেমনি অনেকদিন হয়তো কেউ খেয়ালও করবে না, সেই পুরোনো দুটি পা আর এখানে আসে না।
বুবির জন্য কোনো শোকসভা হবে না। তাঁর হত্যার বিচার চেয়ে রাজপথে কোনো মিছিলও নামবে না। হয়তো তাঁর কবরে তাঁর নামটুকুও লেখা থাকবে না। আরও ভয়াবহ হলো, তাঁর না-বলা কথার চেয়েও বেশি নীরবে আমরা ভুলে যাব—এই দেশের স্টেশনগুলোতে বাস করা মানুষদের জীবন কতটা অনিরাপদ, কতটা অবহেলিত। তাঁদের মেরে ফেলা যায়, তাঁদের সামান্য সঞ্চয় লুটে নেওয়া যায়, তাঁদের মৃত্যু কোনো বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে না।
স্টেশনে থাকা মানুষগুলো যেন আমাদের সামাজিক বিবেকের বাইরের মানুষ। তারা থাকে চোখের সামনে, অথচ আমাদের ভাবনায় থাকে না। তাদের মৃত্যুতে আমাদের দায় জাগে না, শোক জাগে না, প্রতিবাদ জাগে না। অথচ এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় ভয়। কারণ বুবির মৃত্যু কেবল একজন বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধার মৃত্যু নয়; এটি আমাদের সমাজের নির্মম উদাসীনতার আরেকটি নাম।








