ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২

চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত ২ লাখ মানুষ

রাঙ্গাবালীর অর্ধনির্মিত হাসপাতাল যেন অবহেলার প্রতীক

সাজিদুর রহমান সজিব

প্রকাশিত: ১৯:০২, ১১ মার্চ ২০২৬

রাঙ্গাবালীর অর্ধনির্মিত হাসপাতাল যেন অবহেলার প্রতীক

দক্ষিণ বঙ্গোপসাগর ও আগুনমুখা নদীবেষ্টিত দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালী। তিনদিকে নদী আর একদিকে সাগরঘেরা এই জনপদ। কৃষি ও মৎস্যনির্ভর এ অঞ্চলের মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারগুলোর একটি স্বাস্থ্যসেবা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আধুনিক যুগেও এই উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলার মানুষ এখনো ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত।

উপজেলাটিতে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল। এমনকি নেই একজন সরকারি এমবিবিএস চিকিৎসকও। ফলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হলে এখানকার মানুষকে পাড়ি দিতে হয় ভয়াল আগুনমুখা নদী। একজন চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর সেই যাত্রা অনেক সময় হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর লড়াই।

জটিল রোগের চিকিৎসা তো দূরের কথা, গর্ভবতী নারীদের সিজারিয়ান অপারেশনের মতো কোনো ব্যবস্থাও নেই এই উপজেলায়। ফলে গর্ভবতী নারী, নবজাতক কিংবা মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে নদীপথে যেতে হয় পার্শ্ববর্তী গলাচিপা বা কলাপাড়া উপজেলার সরকারি হাসপাতালে। আর জটিল রোগীদের ক্ষেত্রে যেতে হয় জেলা সদর পটুয়াখালী কিংবা বিভাগীয় শহর বরিশালে।

তবে নৌ-যোগাযোগ দিনের বেলায় সীমিত থাকলেও সন্ধ্যার পর প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বৈরী আবহাওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে দিনেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন লঞ্চঘাট পর্যন্ত পৌঁছানোই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় রোগীদের ঘর থেকে বের করাও দুরূহ হয়ে যায়।

ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে স্থানীয় গ্রাম্য ডাক্তার, হেকিম-কবিরাজ কিংবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু এসব জায়গায় জ্বর, সর্দি-কাশির মতো প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া উন্নত কোনো চিকিৎসা সুবিধা নেই।

২০১২ সালে রাঙ্গাবালী উপজেলা হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও এখন পর্যন্ত এখানে গড়ে ওঠেনি একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল। তবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যার একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে নতুন আশার আলো দেখেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

কিন্তু সেই আশাও এখন অনেকটাই থমকে গেছে। প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাজেট সংকটের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে অর্ধনির্মিত হাসপাতাল ভবনটি যেন রাঙ্গাবালীর মানুষের স্বাস্থ্যবঞ্চনার এক নীরব প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, চারতলা হাসপাতাল ভবনের তিনটি তলার ছাদ ঢালাই ও নিচতলার আংশিক দেয়ালের কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া দুটি কোয়ার্টার ভবন, একটি সাব-স্টেশন, চলাচলের রাস্তা ও বাউন্ডারি ওয়ালের কিছু অংশ নির্মাণ করা হলেও বাকিগুলো অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের বাইরে থাকা লোহার রডগুলোতে ইতোমধ্যে মরিচা ধরতে শুরু করেছে। অনেক জায়গায় ভিম-কলামের ঢালাইকাজে যথাযথ ভাইব্রেশন না হওয়ায় ফাঁকা অংশ পরে প্লাস্টার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যমান ইটের গাঁথুনিতে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া পাইলিং থেকে প্রথম তলার ফ্লোর পর্যন্ত ফাঁকা জায়গায় এখনো বালু ভরাট করা হয়নি।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পাঁচ একর জমির ওপর ৫০ শয্যাবিশিষ্ট রাঙ্গাবালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রকল্পটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের কথা ছিল। প্রথম ধাপের কার্যাদেশের মূল্য ধরা হয় ১২ কোটি ৬৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপের কার্যাদেশের মূল্য ৮ কোটি ১৬ লাখ ৫৪ হাজার টাকা।

প্রথম ধাপে কাজটি যৌথভাবে পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবুল কালাম আজাদ ও প্রাইম কনস্ট্রাকশন। দ্বিতীয় ধাপের কাজ পায় আবুল কালাম আজাদ, প্রাইম কনস্ট্রাকশন ও মেসার্স আয়ান এন্টারপ্রাইজ। ২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল কার্যাদেশ পাওয়া কাজ দুটির মেয়াদ ছিল এক বছর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রথম ধাপের কাজের ৫৩ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপের ৫৭ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়। ওই অনুপাতে অর্থও উত্তোলন করা হয়েছে। তবে গত বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

দ্রুত এই হাসপাতালের নির্মাণকাজ শেষ করে কার্যক্রম চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় দ্রুত প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু হবে এবং দ্বীপবাসী ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা পাবে।

এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী হাই মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহেলা পারভীন বলেন, “২০১২ সালে উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত এখানে একটি সরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি। ২০২৩ সালে হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরু হলেও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি থেকে তা বন্ধ রয়েছে। ফলে এলাকার মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়, এমনকি পথে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।”

বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার হোসেন আহমেদ বলেন, “এ এলাকার মানুষ এখনো আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকে জ্বর, সর্দি-কাশির মতো প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া উন্নত চিকিৎসা নেই। অনেক গর্ভবতী মা সিজারের জন্য যাওয়ার পথে মারা যান। সাপে কামড়ানো রোগীদের জন্য অ্যান্টিভেনম না থাকায় অনেক সময় রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ শেষ করে কার্যক্রম চালু করা জরুরি।”

রাঙ্গাবালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুর রহমান ফরাজি বলেন, “রাঙ্গাবালীবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি হাসপাতাল অত্যন্ত জরুরি। প্রায় দুই বছর ধরে ৫০ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে আমি সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় দ্রুত কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন।”

এ বিষয়ে পটুয়াখালী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, বিগত সরকারের আমলে কাজটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি গত সপ্তাহে নির্মাণাধীন হাসপাতালটি পরিদর্শন করে এসেছি। এখন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। আমরা টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যাচ্ছি। আশা করছি দ্রুত কাজ শুরু হবে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে হাসপাতালটি হস্তান্তর করা সম্ভব হবে।”

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, “স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে জেনেছি যে গত মাসে প্রকল্পটি আবার একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে নতুন করে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। খুব শিগগিরই নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হবে। ঠিকাদার নিয়োগের এক থেকে দুই মাসের মধ্যেই নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু হবে।”

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদ ভূঞা বলেন, “ডিপিপি পাস হয়েছে। হাসপাতালটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ঠিকাদার নিয়োগ হলে কাজ শুরু হবে।”

সজিব

×