ঢাকাসহ সারাদেশে মশার উপদ্রব বেড়েছে
ঢাকাসহ সারাদেশে মশার উপদ্রব বেড়েছে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে এটির উপদ্রব আরও বাড়তে থাকে। এক কথায় মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মানুষ। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার উপদ্রব। রাজধানী ও আশপাশ এলাকায় মশার উপদ্রব বেশি। দিন-রাতে কয়েল জ্বালিয়ে, ওষুধ ছিটিয়ে, মশারি টাঙিয়েও নিস্তার নেই।
এর মধ্যে রাজধানীবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহী রোগের আতঙ্ক। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৩ জন। গবেষণা বলছে, গত বছরের তুলনায় এবার মশা বেড়েছে ১২ গুণ।
তবে মশক নিধনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। ইতোমধ্যে যাত্রাবাড়ী, ধানম-ি ও খিলগাঁও এলাকায় মশক নিধনে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করেছে ডিএসসিসি। এসব অভিযানে প্রায় ৫০০-৮০০ পরিচ্ছন্নতাকর্মী অংশ নেয়। আগামী বর্ষার আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলে ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানান।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশন এবং নগরবাসীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে এবং বাসার ভেতরে, ফুলের টব, চৌবাচ্চা ও বারান্দায় জমে থাকা পানি তিন দিনের মধ্যে ফেলে দিতে হবে। বর্ষা মৌসুম মাথায় রেখে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা দুটি স্তরে কার্যক্রম শুরু করেছি, প্রথমটি হলো নিয়মিত মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম।
দ্বিতীয়টি হলো বিশেষ মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম এবং জনগণকে সম্পৃক্তকরণ জনসচেতনতামূলক র?্যালি যা পর্যায়ক্রমে ডিএসসিসির দশটি অঞ্চলে পরিচালনা করা হবে। ইতোমধ্যে যাত্রাবাড়ী ও ধানম-িতে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
এদিকে মৌসুমের আগেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে। মার্চের চেয়ে এপ্রিলে আক্রান্ত ও মৃত্যু দ্বিগুণ হয়েছে। রোগী বাড়তে থাকলেও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। এ কারণে শুধু রাজধানীতে নয়, ডেঙ্গু ছড়িয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মোট রোগীর ৫৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ ঢাকার বাইরের। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, থেমে থেমে বৃষ্টি হয়ে আনাচে-কানাচে পানি জমে থাকায় বাড়ছে মশার বিস্তার।
বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ॥ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৩৩৬ জন। গত এপ্রিল পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে হয় ৭০১। মার্চে ডেঙ্গু আক্রান্তের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। এপ্রিলে এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। গত বছর এপ্রিলের চেয়ে এবার একই সময়ে রোগীর সংখ্যা বেশি। গত বছর এপ্রিলে রোগী ছিল ৫০৪ জন, মারা যান দুজন।
ডেঙ্গু রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে গত শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২ হাজার ৬১১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ২০ জন। রোগীর ১ হাজার ৪৮৮ জন ঢাকার বাইরের। সে হিসাবে রাজধানীর বাইরের রোগী ৫৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। গত বছর আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন। মোট রোগীর ৬২ শতাংশ ছিলেন ঢাকা নগরীর বাইরের।
গত শনিবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ৪৩ জন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শনিবার ৩ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৩১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) একজন, ঢাকা বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) দুজন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে পাঁচজন ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে চারজন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৩ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরের এ যাবৎ দুই হাজার ৪৭৪ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
চলতি বছরের ৩ মে পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ৬৫৪ জন। এর মধ্যে ৬০ দশমিক নয় শতাংশ পুরুষ ও ৩৯ দশমিক এক শতাংশ নারী রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি। চলতি বছরের এ যাবৎ ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২০ জন।
২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মারা যান ৫৭৫ জন। এর আগে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।
মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ মানুষ ॥ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মশার উপদ্রব। এতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে মানুষ। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার উপদ্রব। হঠাৎ করেই মশার এমন দৌরাত্ম্য বাড়লেও নজর নেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের।
নগরবাসীর অভিযোগ, দুই সিটি করপোরেশন লোক দেখানো কর্মসূচি হাতে নিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, এতে কিউলেক্স ও এডিস মশার সংখ্যাও বেড়েছে তীব্রভাবে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান জানান, ‘গত রোজার ঈদের পর থেকে ঢাকায় মশা বেড়েছে। বাসাতেই নয়, রাস্তায় বের হলে সব জায়গায়ই মশার উপদ্রব। বাধ্য হয়ে বাসার জন্য মশা তাড়ানোর স্প্রে এবং গায়ে মাখার লোশন কিনতে হয়েছে। বাসা লেকের কাছাকাছি হওয়ায় সন্ধ্যা হলেই বাসার দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে মশা চলে আসে।
খিলক্ষেত এলাকার বাসিন্দা নূরুল ইসলাম বলেন, গত দুই সপ্তাহে মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে, তার বাসায় মশার কয়েল, স্প্রে, মশা মারার ব্যাট- কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।’ সিটি করপোরেশনের মশক নিধনের কর্মসূচি সম্পর্কে একই কথা বলেন তিনি।
রাজধানীর বাইরে কেরানীগঞ্জের অবস্থা আরও ভয়াবহ। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, ‘এই এলাকায় সারাবছরেই মশার উপদ্রব থাকে। মশার কারণে দিনেরবেলায়ও মশারি টাঙিয়ে থাকতে হয়। এই এলাকায় কখনো মশার ওষুধ দিতে দেখা যায়নি। বিভিন্ন ডোবা ও পুকুরে মশার কারণে পানি দেখা যায় না।
এছাড়া ঢাকার বাইরের অবস্থা আরও খারাপ। ঢাকার বাইরে এডিস মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৮ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ৫ জন রয়েছে। একই অবস্থা কুমিল্লা, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা, রংপুরসহ দেশের প্রায় সব জেলার।
কয়েল জ্বালিয়ে, ওষুধ ছিটিয়ে, মশারি টাঙিয়ে মশার উপদ্রব থেকে নিস্তার পাওয়ার চেষ্টা করছে বাসিন্দারা। তবু বাসাবাড়ি, কর্মস্থল, চলতি পথে কোথাও মশার কামড় থেকে নিস্তার মিলছে না। মশারির ভেতরে বসেই পড়াশোনা করছে শিক্ষার্থীরা। মশারির ভেতরেও শিশুরা শান্তিতে ঘুমাতে পারছে না বলে স্থানীয়রা জানান।
গত বছরের তুলনায় মশা বেড়েছে ১২ গুণ ॥ গবেষণা থেকে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার মশা বেড়েছে ১২ গুণ। তবে রাজধানীবাসীর অভিযোগ, মশা নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। মাঝে মধ্যে মশক নিধনের ওষুধ ছিটালেও তাতে কাজ হচ্ছে না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে পার ম্যান পার আওয়ার উড়ন্ত মশার ঘনত্ব তিনশ’র বেশি। অর্থাৎ একজন মানুষ যদি কোথাও টানা এক ঘণ্টা অবস্থান করেন, তাহলে তাকে গড়ে তিনশ’ মশা আক্রমণ করছে, যা গত বছরে ছিল গড়ে ২৫-এর নিচে।
সে হিসাবে গত বছরের তুলনায় মশা বেড়েছে ১২ গুণ। রাজধানীতে মশার লার্ভার ঘনত্ব প্রতি ডিপে (ঘনত্বের পরিমাপ) ৮৭-এরও বেশি। অথচ গত বছরে এই সময়ে রাজধানীতে মশার লার্ভার ঘনত্ব প্রতি ডিপে ছিল গড়ে ১২ থেকে ১৭টি। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, ঘনত্বটি ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে আরও বেড়েছে। ফলে, দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে তা চরমে পৌঁছাতে পারে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ড. জিএম সাইফুর রহমান জানান, ‘কিউলেক্স মশার ঘনত্ব প্রতি সপ্তাহে দ্বিগুণ হচ্ছে। ফগিং কার্যকরী হচ্ছে না। কারণ, একই পুরানো ইনসেকটিসাইড ব্যবহার করা হচ্ছে। যদি কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ থাকত, তাহলে মশার ঘনত্ব এত বৃদ্ধি পেত না। বর্ষাকালে এডিস মশার উপদ্রব বাড়বে। ডেঙ্গু ইতোমধ্যে ঢাকা ছাড়িয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং দেশজুড়ে জরুরি পদক্ষেপ ছাড়া উপদ্রব আরও ভয়াবহ হতে পারে।








