ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৫ জুলাই ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩

শাহীন রেজা নূর

অর্থনীতি ও দক্ষিণ এশিয়া

প্রকাশিত: ০৩:৩৮, ৫ ডিসেম্বর ২০১৭

অর্থনীতি ও দক্ষিণ এশিয়া

বিশ্বায়নের এই যুগে দেশে দেশে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে অবিরাম গতিতে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উন্নয়নের জোয়ার বইতে দেখা যাচ্ছে এরই ধারাবাহিকতায়। এক সময় যুক্তরাষ্ট্র সব বিচারেই বিশ্বে অগ্রণী ভূমিকা পালন করলেও আজ তাদের সেই অবস্থান অনেকটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চীনের ঘটেছে শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি। ভারতও পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে। বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য আজ আটলান্টিকের অপর প্রান্ত থেকে এশিয়ার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে। চীন-জাপান-ভিয়েতনাম-ভারত-বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড সর্বত্রই লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। চীনের বৈশ্বিক যোগাযোগ বা ‘ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগটি বিশ্বের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধারায় ব্যাপক এবং অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সৃষ্টি করবে এমনটাই বিশেষজ্ঞদের অভিমত। চীনা অর্থনীতি বিগত কয়েক বছরে যে স্তরে উপনীত হয়েছে এবং যে গতিতে তার প্রবৃদ্ধি ঘটছে তাতে অত্যল্পকালের মধ্যেই যে চীন বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে এ বিষয়ে প্রায় সকলেই একমত। চীন রাষ্ট্রটি তার সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে শাসন ব্যবস্থাকে ধরে রেখে পুঁজিবাদী কায়দায় অর্থনীতির সম্প্রসারণ ঘটিয়ে অবিশ্বাস্য সাফল্য লাভ করেছে বটে; কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্যভিত্তিক তাদের এই অর্থনীতি প্রকারান্তরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য নানাবিধ সঙ্কট ও অস্বস্তি ডেকে আনছে কিনা সেটিও বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে বৈকি! সন্দেহ নেই যে, বর্তমান বিশ্ব প্রকৃত প্রস্তাবে বাণিজ্যভিত্তিক বিশ্ব। বিশ্বায়ন এই নতুন পৃথিবীর জন্ম দিয়েছে। কিন্তু এই নতুন পৃথিবীতে মানুষের বৈষম্য-বঞ্চনা যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ও পাচ্ছে তাতে এর সঙ্কটময় চেহারাটাই খোলাসা হয়ে উঠছে। ওয়ালস্ট্রিটকে ঘিরে ‘ওয়ান এ্যান্ড নাইনটিনাইন’ আন্দোলনের কথাটি এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে। কর্পোরেট পুঁজি আজ গোটা বিশ্বে যে ধরনের দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে তাতে সারা বিশ্বে সাধারণ মানুষের ত্রাহি অবস্থা নিশ্চয়ই কারও নজর এড়ায় না। ব্যবসা-বাণিজ্যনির্ভর বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া সব প্রকার নীতি-নৈতিকতা বা মানবিকতার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনপূর্বক এগিয়ে চলেছে রকেট গতিতে। আয় বৈষম্য, জীবন ধারণের মানের ক্ষেত্রে সীমাহীন বৈষম্য আর স্ব-স্ব পণ্য বিক্রির জন্য অসুস্থ, অশালীন ও নির্মম ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিযোগিতা মানুষের জীবনে বয়ে আনছে মর্মন্তুদ সঙ্কট! বাজার অর্থনীতি সিন্দবাদের দৈত্যের মতো জনমানুষের কাঁধে চেপে বসেছে আজ তার সীমাহীন মর্ম যাতনার যাবতীয় উপকরণ সমেত। ফলে দিকে দিকে মানুষের জীবনে আজ সমস্যা-সঙ্কট-অস্থিরতা দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য অগ্রগতি এই সঙ্কটকে অনেক ক্ষেত্রেই আবার ঘনীভূত করেছে। কেননা, প্রযুক্তির নির্ভরতার মন্দ দিকটা অগ্রগতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ মানবসম্পদের প্রতি এক ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। যান্ত্রিক সভ্যতার উন্মেষ লগ্ন থেকেই এই সঙ্কটের উৎপত্তি হলেও ক্রমান্বয়ে প্রযুক্তি বা যন্ত্রের অসামান্য এই উন্নতির মধ্যে মানুষের কর্মোদ্যোগ যেমন হুমকির মুখে পড়েছে, তেমনি আবার বেকারত্ব বাড়ছে, আয়-রুজি হ্রাস পাচ্ছে মানুষের। অন্যদিকে আবার শিল্পায়নের নামে পরিবেশ-প্রতিবেশ মানুষ বা প্রাণীর অস্তিত্বকে ঘোরতর সঙ্কটের আবর্তে নিক্ষেপ করে চলছে তথাকথিত উন্নয়নের অগ্রযাত্রা! এতে করে আজ মানবসভ্যতার অস্তিত্বই পড়েছে হুমকির মুখে। লক্ষণীয় যে, বাজার অর্থনীতি, বিশ্বায়ন ইত্যাকার গালভরা বুলি কপচিয়ে একদিন পুঁজিবাদ বিশ্বে মানবকল্যাণের ও উন্নয়নের যে স্বপ্ন মানুষের মনে সৃষ্টি করেছিল তা যে প্রকৃত প্রস্তাবে গুটিকয় মানুষের হাতে বিশ্ব-সম্পদ পুঞ্জীভূত করার দুরভিসন্ধি থেকে উৎসারিত সেদিন তা বোঝা না গেলেও দিনকে দিন সেটিই কিন্তু প্রমাণ হচ্ছে। এই বিশ্বের যা কিছু সম্পদ তার চল্লিশ ভাগের মালিকানা মাত্র আঙ্গুলের ডগায় গোনা যায় এমন কয়েকজনের হাতের তালুতে বন্দী। এই ধাঁচের উন্নয়ন প্রক্রিয়া আগামীতে অনুরূপ আরও গুটিকয় সম্পদশালী ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটাবে যারা কিনা অবশিষ্ট ষাট ভাগের মালিকানাও নিজেদের মধ্যে বিলি-বণ্টন করে এই বিশ্বের একেকজন নতুন নতুন অর্থনৈতিক স¤্রাট-জার-সিজার-রাজা-বাদশাহ বনে যাবেন। এভাবেই নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মোড়কে বিশ্বকে কর্পোরেট পুঁজির দাসত্বে পরিণত করা হচ্ছে। এ বুঝিবা সেই সামন্ত যুগের দাস প্রথারই নতুন সংস্করণ। এই গুটিকয় ধনাঢ্য ব্যক্তির করতলে আজ যে শুধু সম্পদ-সম্পত্তি আর অর্থবিত্তই বন্দী তা কিন্তু নয়, বরং এই সীমাহীন সম্পদের মালিকানা লাভের দরুন তারাই দেশে দেশে সমাজ ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে ফেরে। নিজ নিজ বাজার সৃষ্টি এবং সেই বাজারকে নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারে এক প্রকার সমঝোতার ভিত্তিতে বিশ্বের অঞ্চলসমূহকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে দেদার নৈতিক-অনৈতিক ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে তারা। এ জন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বা দেশগুলোর রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক-আইনজীবী ও অন্যান্য পেশার মানুষের সমন্বয়ে এক তথাকথিত সুশীল সমাজ সৃষ্টি করে রেখেছে তারা। আর তাদের মাধ্যমেই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের ওপর যাবতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পায় এই ‘ডেভলপমেন্ট পার্টনার’ নামধারীরা। মোদ্দাকথা, শোষকের বা শোষণের এই নতুন ধারার যূপকাষ্ঠে আজ গোটা বিশ্বই বলতে গেলে বলি হচ্ছে। এদের মুখেই গণতন্ত্রের, মানবতার এমন সব কথা শোনা যায় যা হাস্যকরই শুধু নয় রীতিমতো প্রতারণামূলকও বটে! ‘গণতন্ত্র’ ‘ধর্ম’ ‘সমাজতন্ত্র’ ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ এর যে ব্র্যান্ডটি তাদের মতলব হাসিলের উপযোগী বলে বিবেচিত হয় সেটিই তারা পুনর্প্রবর্তন করে বা সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস চালায় অযাচিতভাবে নিছক শক্তির জোরে। আর সেক্ষেত্রে ওইসব কেনা বুদ্ধিজীবী এবং পাইক-পেয়াদা-বরকন্দাজের সমর্থন-সহযোগিতাও জুটে যায় অর্থের বিনিময়ে। এই তো হলো হাল আমলের চিত্র। এর মাঝেই এক দেশ থেকে আরেক দেশে অর্থ লগ্নি করে বা ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার চেষ্টায় রত থাকে ওরা। আগেই বলেছি, চীন এখন সম্প্রসারণশীল অর্থনীতির অন্যতম কুশীলব। চীনা প্রেসিডেন্ট শিন ইতোমধ্যেই মাও সে তুং ও দেং জিয়াও পিংয়ের অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্রিক কাঠামোকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে দল অভ্যন্তরে শুধু যে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ়তম করেছেন তাই নয়; গোটা দেশের চলার গতিকেও একক হাতে নিয়ন্ত্রণের পাকাপোক্ত বন্দোবস্তও করেছেন। এই শক্তিমদমত্ততা পরিণতিতে স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদী কাঠামোরই নামান্তর। তবে তা সত্ত্বেও নিজ দেশের সমৃদ্ধ অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি এবং বর্তমান চীনা নেতৃত্ব দেশে দেশে যেসব অর্থনৈতিক উদ্যোগ-আয়োজন করে যাচ্ছেন তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে নানা শঙ্কা-আশঙ্কা ও বিশ্লেষণ-মূল্যায়ন লক্ষ্য করা যায়, যাতে কিনা চীনের এই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার নানাবিধ ত্রুটি-বিচ্যুতি ও হীনমতলবের বিষয়ও অনেক ক্ষেত্রে ফুটে ওঠে! বিশেষজ্ঞরা চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ উদ্যোগটি (যা কিনা ইউরোপ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার মাধ্যমে সড়ক ও নৌপথে চীনকে সংযুক্ত করবে) শেষ বিচারে খারাপ নজির বয়ে আনতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন। তারা শ্রীলঙ্কায় চীনের অর্থ লগ্নি এবং সেখানকার উন্নয়ন কার্যক্রমে চীনাদের অংশগ্রহণের বিষয়টিকে মূল্যায়নপূর্বকই যে এমন শঙ্কা-আশঙ্কার কথা ভাবছেন তা তো বলাই বাহুল্য! শ্রীলঙ্কায় চীনের বিভিন্ন প্রকল্প প্রকৃত প্রস্তাবে শ্রীলঙ্কাকে এক বিশাল ঋণের ফাঁদে আটকে ফেলেছে। সেখানে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে চীন প্রদত্ত বিপুল ঋণের সুদের হার এতই চড়া যে, তা পরিশোধ করতে আজ শ্রীলঙ্কায় ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছে। অন্যদিকে, আবার চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের ব্যাপারে চীনের লগ্নিকৃত ৫০ বিলিয়ন ডলার নিয়েও অনুরূপ আশঙ্কা বিদ্যমান বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এমনিতেই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থা বড়ই নাজুক; ফলে এই বিনিয়োগ আদৌ সাফল্য বয়ে আনতে পারবে কি-না সেটিই এখন বড় ভাবনা। শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান উভয় দেশেই চীনের ঋণ সাহায্য ইকুইটিতে পরিণত হয়ে প্রকারান্তরে তা এমন ফাঁদের সৃষ্টি করেছে যে, এখন এ কারণে দেশ দুটির এসব উন্নয়ন প্রকল্পের মালিকানাও চীনা কোম্পানির হস্তগত হওয়ার উপক্রম। অন্যদিকে আবার ভারত থেকে অনতিদূরে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনা বিষয়ে চীনাদের সরব উপস্থিতি ভারতের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করছে। চীন বাংলাদেশ ও নেপালেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নির (শত শত কোটি ডলার) যে চুক্তি করেছে তা শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানে চীনা অর্থে নির্মীয়মাণ প্রকল্পসমূহের প্রকৃত চিত্রের আলোকে বিশ্লেষিত, মূল্যায়িত ও ভাবনা-চিন্তার দাবি রাখে বলে ওই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। চীনের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সখ্য সেখানকার (শ্রীলঙ্কার) বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারক মহলে ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। ১৯৭১ থেকে ২০১২ সাল অবধি চীন সেখানে ৫ বিলিয়নের বেশি ডলার বিনিয়োগ করেছে, আর এই অর্থের সিংহভাগই ব্যয় হয়েছে শ্রীলঙ্কার অবকাঠামোগত উন্নয়নে। গভীর সমুদ্রবন্দর হামবানতোতার জন্য এক বিলিয়ন ও বাকিটা মাত্তালা বিমানবন্দর, নয়া রেলপথ সংযোগ ও কলম্ব বন্দরনগরী প্রকল্পে ব্যয় করেছে চীন। এভাবে শ্রীলঙ্কা গৃহযুদ্ধের ক্ষত সারিয়ে তোলার প্রয়াসে তথা অভ্যন্তরীণ কাঠামো পুনর্নির্মাণে চীনের কাছ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে। শ্রীলঙ্কার জাতীয় ঋণ এখন প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার। সুদ অত্যন্ত চড়া। এক হামবানতোতা বন্দরের জন্য গৃহীত ঋণের সুদের হার হচ্ছে শতকরা ৬.৩%। অথচ বিশ্বব্যাংক বা এডিবির এ বিষয়ক ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার মাত্র ০.২৫-৩% ভাগ পর্যন্ত। অপরপক্ষে প্রতিবেশী দেশে ভারত প্রদত্ত লাইন অব ক্রেডিটের সুদের হার কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় শতকরা মাত্র ১ ভাগ। যা হোক, শ্রীলঙ্কার এই ঋণ পরিস্থিতি পর্যালোচনাপূর্বক বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, চীনা ঋণ শ্রীলঙ্কাকে মারাত্মকভাবে ঋণভারে জর্জরিত করে ফেলেছে। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার এখন অনেক কম বিধায় ওই চীনা ঋণ পরিশোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে দেশটিকে। এই অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য শ্রীলঙ্কা ওই ঋণকে ইকুইটিতে রূপান্তরে সম্মত হয়েছে, যা কিনা চূড়ান্ত পর্যায়ে ওইসব প্রকল্পের ওপর চীনা মালিকানাই প্রতিষ্ঠা করবে! শ্রীলঙ্কা এমতাবস্থায় হামবানতোতার ৮০ ভাগ শেয়ার চীনা কোম্পানিগুলোর কাছে হস্তান্তর এবং ৯৯ বছরের জন্য তাদের তা লিজ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। আবার মাত্তালা বিমানবন্দরের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর ন্যস্ত করতে এক প্রকার বাধ্যই হচ্ছে শ্রীলঙ্কা। এই প্রকল্পের ৩-৪ শত মিলিয়ন ডলারের ঋণের আর এক থেকে দু’ শ’ মিলিয়ন ডলারের বার্ষিক পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার ব্যয় মেটাতে শ্রীলঙ্কা এখন অপারগ। সুতরাং চীনের কাছ থেকে বিপুল ঋণ নিয়ে এ জাতীয় উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নির্মাণ আজ শ্রীলঙ্কার জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপরন্তু, হামবানতোতা ও মাত্তালায় চীনা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অর্থ দাঁড়ায় ভারত মহাসাগরে কোন সঙ্কট বাধলে সেক্ষেত্রে বেজিংয়ের কৌশলগত সামরিক অবস্থান সুদৃঢ় থাকা। দক্ষিণ চীন সমুদ্র বিরোধের ক্ষেত্রেও এতে করে চীনের অবস্থানের প্রতি শ্রীলঙ্কাকে সমর্থনদানে বাধ্য করাও বেজিংয়ের জন্য সহজতর হবে বৈকি! অন্যদিকে পাকিস্তানে চীনা সাহায্য ওই দেশটিতে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ চাপানোরই নামান্তর বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। চীন-পাকিস্তান করিডর বিষয়ে যারা গভীরভাবে তত্ত্ব-তালাশ নিচ্ছেন তাদের মতে এটি পাকিস্তানের বর্তমান ও ভবিষ্যত অর্থনৈতিক উন্নতিকে চীনের কাছে বন্ধক রাখার এক অসাধারণ সুনিপুণ চীনা প্রয়াস মাত্র! মোদ্দাকথা, পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে চিরকাল অধীনস্থ রাখার চীনা নীলনক্সার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই অর্থনৈতিক করিডর। যা হোক, বর্তমান বিশ্বে বাণিজ্য রাজনীতিসহ অন্য সব ক্ষেত্রে কি দারুণ প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এসব উদাহরণ তার কিছু চিত্র তুলে ধরে নিশ্চয়ই। লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
×