ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সময় সামনে

প্রকাশিত: ০৬:০১, ২ এপ্রিল ২০১৮

নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার সময় সামনে

জনগণের হাত ধরে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার দিন এসে গেছে। নির্বাচনী বছরের তিন মাস পেরিয়ে গেছে। কোন দলই এখনও জনগণমুখী হয়ে ওঠেনি। জনগণকে চাঙ্গা করার কাজও শুরু হয়নি। ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনার তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে না। এবার তরুণ ভোটারদের সংখ্যা দুই কোটির উপর। তাদের উপরই নির্ভর করবে অনেকটা জয়-পরাজয়ের অবস্থান। কিন্তু এই ভোটারদের প্রতি কোন দলেরই মনোযোগ দৃশ্যমান নয়। তরুণরা কী চায়, কেমন ধরনের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের প্রতি তাদের আগ্রহ, তার বিন্দুবিসর্গ এখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। উঠবেই বা কি করে? রাজনৈতিক দলগুলো এই তরুণদের জন্য তাদের করণীয় সম্পর্কে ন্যূনতম চিন্তা-ভাবনা করছে না, কোন প্রণোদনাও তাদের কাছে পৌঁছায় না। পুরনো ধারার ভাব বাণীতে তাদের মনে রং ধরানো যাবে বলে মনে হয় না। প্রযুক্তির গুণগত উৎকর্ষ, তাদের চেতনাতে নতুনতর ধারাকেই উজ্জীবিত করছে প্রতিনিয়ত। বেকারত্বের অভিশাপে যারা জর্জরিত, তাদের জন্য কর্মসংস্থানের আশু কোন ব্যবস্থা যদি না মেলে, তবে এরা সংক্ষুব্ধ হতেই পারে। সেই সংক্ষুব্ধতার রূপ তো দেখাই যাচ্ছে কোটা বিরোধী ও কোটা সংস্কার আন্দোলনে। নির্বাচনী বছরে শিক্ষক, পল্লী চিকিৎসক, পেশাজীবী বিভিন্ন শ্রেণী গণ অনশন ও আন্দোলন চালিয়েছে দাবি-দাওয়া নিয়ে। এক্ষেত্রে সরকার বা প্রশাসন খুব কার্যকর ভূমিকা দেখাতে পারেনি। যেমন পারেনি রাজনৈতিক দলগুলো। দাবিগুলো তারা বিশ্লেষণ করেও দেখেনি। জনঅসন্তোষ তৈরি হওয়া বা বেড়ে উঠা কোনভাবেই কাক্সিক্ষত হতে পারে না সরকারী দলের জন্য। দল ও সরকার একাকার হয়ে যাবার কারণে দলীয় সিদ্ধান্ত ও কর্মসূচীকে পৃথক করে দেখার সুযোগ আর হয় না। দল যদি তরুণদের কাছে যেতে না পারে, তাদের আকর্ষণ করতে না পারে, তবে ব্যালটে তাদের সমর্থন পাওয়া নিশ্চয় সহজতর হবে না। টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে সরকার বা সরকারী দল তরুণদের জন্য যা যা করণীয় হতে পারে, সেসব উদ্ভাবন করে তাদের সেদিকে ধাবিত করার কাজে সক্রিয় হয়েছে, বলা যাবে না। আগামীতে ক্ষমতায় যাওয়ার পথে এই তরুণদের সঙ্গে নেয়াটা যে কত জরুরী, তা বোধগম্য না হওয়ার কোন কারণই নেই রাজনৈতিক দলের। রুহুল আমিন মজুমদার নামে একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘দল এবং দেশে উইপোকার চাষাবাদ রেখে দলকেও শক্তিশালী করা যাবে না। দেশেরও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।’ বলা যায়, এটা মনগড়া কোন কথা নয়। শুধু উন্নয়ন দিয়ে মন ভরানো যায় না। চাই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জাগরণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ও সংগ্রামের পথে রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অবদান ছিল সর্বাগ্রে। দুটোই কখনও কখনও হেঁটেছে পাশাপাশি। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও বিশ্বাস করতেন, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি এবং রাজনীতি একই জীবনের দুই রকম উৎসারণ। তাই তার রাজনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের একটি যোগসূত্র গড়ে ওঠেছিল। সুতরাং দেখতে পাই, ১৯৫৬ সালে কার্জন হলে পাকিস্তান সংসদের ঢাকায় আগত প্রগতিমনা সদস্যদের তিনি যে সংবর্ধনা প্রদান করেন, সেখানে তারই অনুরোধে সঙ্গীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুন গেয়েছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গানটি। যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে ঢাকায় চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠার কাজটিও করেছিলেন মন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা শেখ মুজিব। তারই হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র গুটি গুটি পায়ে এগিয়েছে। ১৯৬২ সালে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রবীন্দ্রজন্ম শতবার্ষিকী পালনেও বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালে যখন আইয়ুব সরকারের তথ্যমন্ত্রী বেতার ও টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করলেন এবং তার পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাঙালী বংশোদ্ভূত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীরা যখন বিবৃতি প্রদান করতে থাকে, তখন গর্জে ওঠেছিলেন শেখ মুজিব। দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, আমরা রবীন্দ্র কাব্য পাঠ করব, রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইব। দেখি কে বাধা দেয়। না বাধা কেউ দিতে পারেনি। বরং রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচারের পক্ষে জনমত গড়ে উঠতে থাকে। রবীন্দ্রচর্চাও বাড়তে থাকে তখন থেকেই। এই রবীন্দ্রনাথের গানকেই তিনি জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিয়েছেন। শেখ মুজিবের জনসভায় বাধাগায়ক ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী জাহিদুর রহিম। ছিলেন যিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন। তিনি জনসভার শুরুতে রবীন্দ্রনাথ, ডিএল রায়, রজনীকান্তের দেশাত্মবোধক গানগুলো গাইতেন। ঢাকার বাইরে পুঁথি পাঠ করতেন মোহাম্মদ শাহ বাঙালী। শিল্পীদের প্রতি ছিল বঙ্গবন্ধুর মমত্ববোধ। বাঙালীর মুক্তি সংগ্রামের সেনানি হিসেবে তিনি তাদের মধ্যেও জাতীয়তাবাদী চেতনার বিস্তার ঘটাতে পেরেছিলেন। আর সে কারণেই দেখি সুকান্তের কবিতা ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ’ গান হয়ে সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। কিংবা সিকান্দার আবু জাফরের কবিতা ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’ গান হয়ে বেজে ওঠে দেশজুড়ে। ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর একাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে শিল্পী-সাহিত্যিকদের উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে শেখ মুজিব, বাংলা ভাষা, শিক্ষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছিলেন। পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে প্রথমেই ছাত্রসমাজের পাশাপাশি এগিয়ে এসেছিলেন সংস্কৃতিকর্মীসহ কবি-সাহিত্যিকরা। ঘরোয়া রাজনীতির কবলে পড়ে রাজনৈতিকদলগুলো জিয়ার আমলে শুধু ভাঙেনি, এরশাদের কুশাসনকালেও ভেঙেছে। দল ভাঙা-গড়ার খেলা চালিয়ে তথাকথিত ‘বহুদলীয় গণতন্ত্র’ নামক এক হস্তিদর্শন ঘটানো হয়েছিল। দুর্নীতি, অসততা, আদর্শহীনতা এসে গ্রাস করেছিল রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে। রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, এমন কুখ্যাত অপরাধী, অসৎ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, ধর্র্মীয় লেবাসধারী, গ্রাম্য টাউট, বাটপারদের জড়ো করে দুই জান্তাশাসক গড়ে তুলেছিলেন তথাকথিত রাজনৈতিক দল। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এরা হেন অপরাধ ও কুকর্ম নেই, যা সাধন করেননি। জান্তাশাসক জিয়া তো ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেনা অফিসারদের হত্যা করার কাজে লিপ্ত ছিলেন। বাঙালীর সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার কাজেও মত্ত হয়েছিলেন। শিল্পকলা একাডেমিতে ১৯৭৮ সালে নজরুল জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান উদ্বোধন শেষে জিয়া শ্রোতার আসনে উপবিষ্ট হন। নজরুলের গজল গাইছিলেন শিল্পী নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। হারমোনিয়ামের সঙ্গে তবলা সঙ্গত চলছিল। শ্রোতার আসন থেকে মঞ্চে উঠে জিয়া লাথি দিয়ে তবলা ভেঙ্গে ফেলেছিলেন। আর ঘোষণা দিলেন এসব বাজনা বাজানো যাবে না। বাজাতে হবে ব্যান্ড বাদকদের যন্ত্রপাতি। এরপরই ধানম-িতে খোলা হয়েছিলে ব্যান্ড একাডেমি। শিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদকে ৪০ লাখ টাকা অনুদানও দেয়া হয় এই একাডেমি স্থাপনে। ম্যান্ডোলিন, কী বোর্ড ইত্যাকার যন্ত্রপাতি নিয়ে গড়া একাডেমিতে শিক্ষার্থী তেমন ছিল না। জিয়া নিহত হবার পর সেই একাডেমিও লাপাত্তা হয়ে যায়। সেসব ঘটনা সংশ্লিষ্টরা যদি লিপিবদ্ধ করেন, তাবে স্পষ্ট হবে জিয়ার বাঙালী বিদ্বেষ এবং পাকিস্তানী চেতনার। জিয়ার উত্তরসূরি এরশাদও বাঙালী সংস্কৃতির বিপরীতে অবস্থান নিয়ে অদ্ভুত ধর্মীয় সংস্কৃতির বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। এই দুই জান্তার বিরুদ্ধে এদেশের কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিল্পীসমাজসহ পেশাজীবীরা নেমেছিলেন আন্দোলনে। একজন নিজ বাহিনীর হাতে খুন হন। অপরজন গণআন্দোলনে পদত্যাগে বাধ্য হন। জিয়ার উত্তরসূরিরা বিজাতীয় সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেন। এসব অপসংস্কৃতি চর্চার বিপরীতে বাঙালীর নিজস্ব সংস্কৃতির বিস্তার ঘটানোর প্রচেষ্টা প্রায়শই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু থেমে থাকেনি। একুশ শতকে এসে সংস্কৃতির ধারাটি কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। একাত্তর ও তার আগে যেসব গান, কবিতা বাঙালী তরুণ, যুবাসহ নানাবয়সী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে, সেসব গান ও কবিতা এ প্রজন্মের তরুণদের সমাজ ও দেশ গঠন কাজে সেভাবে উদ্বুদ্ধ যে করছে না, তা স্পষ্ট। সময় ও প্রেক্ষাপট অবশ্যই বদলে গেছে। ত্রিশ দশকের স্বদেশী আন্দোলনকাল থেকে নির্মিত গান ও কবিতা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে বাঙালীকে প্রেরণা যুগিয়েছে। যুদ্ধ জয়ের আবাহনে দীক্ষিত করেছে। শাণিত করেছে যোদ্ধার লড়াইয়ের অঙ্গীকারকে। আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের একালে তারুণ্যের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশা যেমন তীব্র হয়েছে, তেমনি যথাযথ কর্মসংস্থানের অভাব তাকে হতাশাগ্রস্ত করেছে। অর্থের বিনিময়ে চাকরি পাবার যে ট্রাডিশন জিয়া-এরশাদ-খালেদা আমলে চালু হয়েছে, তার মুলোৎপাটন ঘটেনি। বরং বিষয়টি যেন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ‘ফেল কড়ি মাখ তেল’ নীতির যথেচ্ছাচারের সীমা-পরিসীমা আর নেই। বিনা অর্থে মেধার ভিত্তিতে চাকরি পাবার স্বপ্ন ফিরিয়ে আনার লক্ষণ কোথাও দেখা যায় না। সামান্য পদে চাকরির জন্য জমি-জমা বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা কম নয়। জমি-জমা, হালের বলদ বিক্রি করেও গ্রামীণ মানুষ কাজের সন্ধানে এক সময় প্রবাসে গিয়েছে। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে যা উপার্জন, তা দেশে পাঠাচ্ছে। তাদের পাঠানো অর্থকড়ির যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কিনা বা তা করা যায় কিনা, সে নিয়ে কারও আগ্রহ নেই। বরং এসব অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হচ্ছে। এই অর্থ দেশের গড় প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়েছে। অথচ এ অর্থে দেশে ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ শিল্প-কারখানা গড়ে তোলা যেত। কর্মসংস্থান হতো বহু যুবকের। উচ্চশিক্ষা নিয়েও যেখানে কর্মসংস্থান দুর্লভ অতি, সেখানে হতাশা এসে বাসা বাঁধে, তরুণ চিত্তে জন্মে ক্ষোভ। কখনও তা হতে পারে বারুদের দ্বিগুণ। জ্বালাতে পারে আগুন। দেশে অপরাধের মাত্রা বাড়াতে পারে। সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে যত পারঙ্গমই প্রদর্শন করুক, তরুণদের মেধা, মনন, শিক্ষা-দীক্ষাকে কাজে লাগানো না গেলে সকলই গরলে পর্যবসিত হয়। অমৃতের স্বাদ আর মেলে না কোথাও। এ সময়ের তরুণরা জানে, বোঝে, এমনকি উপলব্ধি করতেও পারে যে তার জন্য আশার দরজাগুলো খোলা নেই। মেধাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রও সঙ্কুচিত। এসব মেধাবানরা জঙ্গী বা সন্ত্রাসে আত্মনিবেদিত হতেই পারে। বেকার তরুণ ভোটারদের ভোট পাবার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো নিরন্তর কৌশল অবলম্বন করতে পারে। কিন্তু তাতে তরুণ ভোটারদের মন জয় করা যাবে কিনা তা বলা যায় না। দুর্নীতির যে বিষবাষ্প সামরিক দুই শাসক ও তাদের উত্তরসূরি বিএনপি-জামায়াত জোট পুরো দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে, তার থেকে নিস্তার আজও পাওয়া যায়নি। একদা তরুণরা দেখেছে, নব্বই সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকালে তিন জোটের রূপরেখায় দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা রূপরেখাকে দূরে সরিয়ে দুর্নীতির উপাখ্যানকে বক্ষে ধারণ করেছে এবং দিন দিন এর মাত্রা বাড়িয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, এতিমদের জন্য বরাদ্দ টাকা তাদের দেয়া হয়নি। বরং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং তার পুত্র ও সহযোগীরা তা আত্মসাত করেছেন। এটা কি ভাবা যায়? পিতৃমাতৃহীন অনাথ শিশু-কিশোরদের দিকে তাকালে দু’চোখ ভিজে আসতে বাধ্য যে কারোরই। পিতা-মাতার স্নেহবঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠাদের কথা ভাবলে বড় বেশি বেদনার মতো বেজে ওঠে হৃদপি-। তাদের অর্থ মেরে দেবার মানসিকতা যে কত নীচস্তরের, তা ভাবলে বিস্ময় জাগে। অবশ্য ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ সংলাপ মনে এলে সবই জায়েজ হয়ে যায়। এতিমের অর্থ আত্মসাতকারীর মুক্তির দাবিতে আন্দোলন যারা গড়ে তুলতে চায়, তারা এদেশের এতিম দরিদ্র জনগণকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপই করছে না, তাদের হেয় করছে। আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে এসব বিষয় যে প্রাধান্য পাবে তা বলাবাহুল্য। তবে সরকারী দলেরও আশাবাদী হয়ে উঠার ক্ষেত্রটি মসৃণ নয়। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আচার আচরণ, ব্যবহার ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়গুলো ভোটারদের সামনে আসবেই। তারা নিশ্চয় এসব ঘৃণার চোখে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেবে না এমন কথা বলা যায় না। ক’বছর আগে খালেদা-জামায়াতের পেট্রোল বোমায় শতাধিক মানুষ নিহত ও সহস্রাধিক আহত হবার ঘটনা ঘটেছে। তা নির্বাচনেও প্রভাব ফেলবে। হতাহতরা কোন না কোন নির্বাচনী এলাকার অধিবাসী। সে সব এলাকায় নির্বাচিত এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যানরা এসব পরিবারের পাশে দাঁড়ানো দূরে থাক, সামান্য খোঁজ খবর নিয়েছে বলে কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। তারা যদি তাদের পাশে দাঁড়াতেন, অন্তত সান্ত¦না দিতেন, তাহলে মানুষের মন থেকে খালেদা-জামায়াতের মানুষ হত্যার নজির এত দ্রুত মুছে যাবার উপক্রম হতো না। নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক দলগুলো সেই পথে এগুচ্ছে না। তাদের ক্রিয়াকলাপে নির্বাচনী আমেজ তৈরি হচ্ছে না। যা বিপজ্জনক বৈকি।