ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯

কৃষি অন্ত হোক প্রাণ

প্রকাশিত: ০৩:৫৭, ৪ মার্চ ২০১৮

কৃষি অন্ত হোক প্রাণ

কৃষিতেই রয়েছে বাঙালীর প্রাণপ্রবাহ। গোলাভরা ধানের স্বপ্ন দেখে এদেশের কৃষক আদিকাল থেকেই। আর আবাদি জমিজুড়ে চায় ফসলের সোঁদা গন্ধ এবং রূপালি বাতাস। চাষাভুষা মানুষের দেশ বাংলাদেশ প্রাচীনকাল থেকেই। নিজ হাতে শস্য ফলিয়ে খাদ্য যোগান দিতেই আনন্দ কৃষিজীবী মানুষের। ধানের খেতে রৌদ্র ছায়ায় যে লুকোচুরি খেলা চলে, সেই খেলায় মেতে ওঠা কিষাণ শুধু স্বপ্ন বুনে যায়, অধিক ফসল ফলবে তার আবাদি জমিতে। আর সেই ফসল বিক্রি করে কিনবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। সংসারে তার বয়ে যাবে সুখের নহর। জীবনের গান প্রবাহিত হবে তার ভুবনজুড়ে। অবশ্য এদেশে অধিকাংশ কিষাণ-কিষাণীর স্বপ্ন থেকে যায় অধরা। ফসলের ঘ্রাণ এবং গান তাকে উতলা করে তোলে। কিন্তু খরা, বৃষ্টি, বন্যায় তার সবকিছু ভেসে যায় দুর্ভোগের সমান তালে। বাঙালীর জীবন-জীবিকায় কৃষিই সব। কৃষি কাজে সম্পৃক্ত অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী। সারা বছর বীজ বুনে, ফসল ফলায় আবার কর্তন করে গোলা ভরে কিংবা বেচাকেনায় হয় নিমগ্ন। এক মণ ধান বেচে সংসারের জন্য দরকারি জিনিস কেনা বাঙালী মধ্যবিত্ত কৃষকের পুরনো চর্চা। তবে ভূমিহীন কৃষকের পক্ষে যা দুষ্কর। দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু কৃষি জমি বাড়ছে না। ফলে উৎপাদন চাহিদার যোগান দিতে পারছে না। এমনিতে কৃষি জমি সুরক্ষিত নয়। স্থাপনা-সড়ক ইত্যাদিতে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। এক ফসলি বা তিন ফসলি জমির পরিমাণ বাড়ছে না। কিন্তু চাষাবাদ বন্ধ করে কলখারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন, ইটভাঁটিসহ নানাবিধ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব জমি। ফলে আবাদি জমি হ্রাস পাচ্ছে। ফসলি জমিকে অন্য কাজে ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে ফসল উৎপাদন হ্রাস পাবে। তীব্র হবে খাদ্য সঙ্কট। তা নিরসনে হতে হবে আমদানিনির্ভর। ব্যয় হবে বিদেশী মুদ্রা। যা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির সহায়ক নয়। অনাবাদি জমিতে শিল্পায়ন বা অন্য স্থাপনা প্রতিষ্ঠিত করা গেলেও দেখা গেছে কৃষি জমিগুলোই এখাতে ব্যবহৃত হচ্ছে বেশি। অপরিকল্পিতভাবে এসব জমি ব্যবহার করার কারণে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো জরুরী। স্বল্প পরিমাণ জমিতে অধিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণ সঙ্গত। এ জন্য কৃষি গবেষণার কাজে মনোযোগী হতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর জন্য কৃষিতে ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। শিক্ষিতরা কৃষি কাজকে যাতে অপছন্দ না করে সেজন্য তাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃষকের সন্তান শিক্ষিত হলে আর কৃষি কাজে আন্তরিক হতে চায় না। অথচ কৃষি বিষয়ক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো যায়। শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃষির ব্যবহারিক শিক্ষা থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কৃষি বিষয়ে ব্যবহারিক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, মাটিতে হাত দিয়ে চারা রোপণ করলে বা কাজ করলে লজ্জার কিছু নেই। বরং নিজের হাতে বাগান করলে; সেই বাগানে যখন একটা ফল হয়, সেটা ছিঁড়ে খেতে আরও বেশি গর্ববোধ হয়। বাড়ির ছাদে বাগান চর্চার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে শহর, গঞ্জ, গ্রামেও। কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণ করার কাজ বিস্তৃত হলে ফসল উৎপাদন বাড়বে। অব্যবহৃত জমি সমবায়ের ভিত্তিতে আবাদ করা গেলে খাদ্যাভাব হ্রাস পাবে। জমি চাষ, ফসল কাটা, ফসল আলাদা করা সবই মেশিন দিয়ে করা গেলে উৎপাদন শ্রম হ্রাস পাবে। পাশাপাশি কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা জরুরী। নতুন প্রজন্মকে কৃষি কাজে আগ্রহী করে তোলা গেলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকবে দেশ। অর্থনীতি কৃষিনির্ভর যে দেশ, সে দেশে কৃষিকে গুরুত্বহীন পর্যায়ে রাখা যায় না। গুরুত্বপূর্ণ করা গেলে কৃষি থেকে ধীরে ধীরে শিক্ষায়ও উন্নত হবে দেশ। কৃষিই দেবে কাঁচামালের যোগান। সমাজজীবনের প্রতিটি স্তরে কৃষিকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে, যাতে এ খাত স্বনির্ভর থাকে সবসময়।