মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিবাহ, দাম্পত্য জীবন ও যৌতুক

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫
  • এমএ রশীদ

জৈবিক ও সাংসারিক প্রয়োজনে, সামাজিক মূল্যবোধের অনুসরণে এবং সর্বোপরি বংশানুক্রমিক প্রজন্মধারা রক্ষার্থে প্রাচীনকাল থেকে সমাজে বিবাহ প্রথা প্রচলিত। সাধারণত তিনটি পন্থা অবলম্বনে বর-কনের মধ্যে বিবাহবন্ধন সম্পন্ন হয়। প্রথমত বর বা কনে পক্ষ একজন তৃতীয় পক্ষ বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বিপরীত পক্ষের নিকট প্রস্তাব পাঠায়। উভয়পক্ষের নিকট বর-কনে পছন্দনীয় হলে এবং উভয়ের সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা গ্রহণযোগ্য হলেও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সন্তোষজনক সমাধান সাপেক্ষে বর-কনের বিবাহের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত পূর্ব পরিচিতির সূত্র ধরে বর স্বয়ং কোন কনেকে পছন্দ করে নিজের অভিভাবকদের অবহিত করে। অভিভাবকরা কনে দেখে ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে সম্মতি দিলে বিয়ের সিদ্ধান্ত স্থির হয়ে যায়। তৃতীয় পদ্ধতি হলো বর-কনে অভিভাবকদের অবহিত না করেই নিজেদের সিদ্ধান্তে উভয়ে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করে ফেলে। পরে উভয়ে নিজ নিজ অভিভাবকদের সম্মতি আদায় করে নেয়।

প্রথম দুই পদ্ধতি অবলম্বনেই পঁচানব্বই শতাংশ বিয়ে সম্পাদিত হয়। বাবা-মা, ভাই-বোন ও নিকট আত্মীয়স্বজন সবার মতামত নিয়েই বিয়ের আয়োজন করা হয়। অতঃপর উভয়পক্ষেই শুরু হয় সাজ সাজ রব। সানাই বাজে, নৃত্যগীতি হয়- সাড়ম্বরে ভূরিভোজন হয়। বর কনেকে ঘরে তুলে নেয়। সংসার পাতেÑ সুখের সংসার গড়ে। একজন চির জীবনের জন্য অপরজনের জীবনসঙ্গিনী/সঙ্গী হয়। এখানে বর-কনে সমানে সমান। না হলে কি করে একজন আরেকজনের আজীবনের সঙ্গী? তবে থাকতে পারে উভয় পরিবারের মধ্যে সামাজিক অবস্থানের ব্যবধান, আরও থাকতে পারে সম্পদ ও বিত্তের দুস্তর ব্যবধানও। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় বর উচ্চ শিক্ষিত, কনে হয়ত সে তুলনায় ততটা শিক্ষিত নয়। তবে হতে পারে কনেটি অনিন্দ্য সুন্দরী এবং তার সৌন্দর্যের মাধুরী দিয়েই বর ও বরপক্ষের সকলের মন জয় করে উভয়পক্ষের মধ্যে অন্যান্য ক্ষেত্রের অসামঞ্জস্য অতিক্রম করে নেয়।

এভাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা তো শেষ হলো। কপোত-কপোতী এখন স্বামী-স্ত্রীতে রূপান্তরিত। একজনের ছাড়া আরেকজনের চলে না। জসীম উদ্দীনের ভাষায়Ñ স্বামী ভাবে “সারা বাড়ী ভরে এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিলো কারা”। আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুজনে মিলে সংসার পাতে। সময় গড়িয়ে চলে। স্বামী যদি চাকরিজীবী হয় অথবা হয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তার আয়ের পরিমাণ সংসার চালানোর জন্য প্রচুর নয়। ওদিকে গৃহিণীকে ঘরকন্না সামাল দিতে হয়। তার তেমন উচ্চ শিক্ষা না থাকায় সে যে চাকরির মাধ্যমে স্বামীর পাশাপাশি কিছু অর্থ উপার্জন করে সংসারে সচ্ছলতা আনবে তা তো সম্ভব নয়। সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশের কারণে জন্মশাসন প্রক্রিয়া অবলম্বনে নবদম্পতি তেমনটা আগ্রহ দেখাতে পারে না। নবদম্পতির সংসারে আসতে থাকে নতুন অতিথি। সন্তানের লালন-পালন, পরিপোষণ বেশ খানিকটা ব্যয়বহুল। সামাজিকতার খাতিরে সংসারে প্রয়োজন হয় ফ্রিজ, টেলিভিশন, এসি ও অন্যান্য বিনোদনের সরঞ্জাম। সীমিত আয় দিয়ে স্বামী বেচারার পক্ষে এত সব ব্যয় মেটানো বেশ কষ্টকর হয়ে পড়ে। অপরদিকে স্বামীকে তার বাবা-মার সংসারের ব্যয় ভারের কিছুটা বহন করতে হয়। ক্রমান্বয়ে নবাগত সন্তানরা একটু বেড়ে উঠলে তাদের ভাল স্কুলে প্রেরণ করতে হয়। স্বামীর চাকরি বা ক্ষুদ্র ব্যবসার সীমিত আয়ের ওপর চারদিক থেকে বোঝা চেপে বসে। শিশু সন্তানদের খাদ্য, পরিবেশ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও সুস্থতা প্রভৃতি সামাল দিতে স্বামী বেচারাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।

এবার সংসারে আয়-ব্যয়ের প্রশ্ন ক্ষান্ত দিয়ে স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে সংসারের কাজকর্মের বিভাজনের প্রতি দৃষ্টি দেয়া যায়। স্বামী চাকরি বা ব্যবসা করে যাই উপার্জন করে তাই দিয়ে সংসারের যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করে ও সময় সময় প্রয়োজনীয় সাংসারিক সামগ্রী ইত্যাদিও জোগান দেয়। সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন করে তাদের শখ ও আবদার মেটায়। স্ত্রীরও নানা ধরনের সাজপোশাকের আবদার মেটায় ও নানাবিধ আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে। সন্তানদের বেশভূষা, পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করানো, মেহমানদারী করা, এমনকি টেবিলে খাবার পরিবেশন করাÑ সবই যেন নারীর একক দায়। নারীর অবদানের মধ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সন্তান ধারণ, প্রসব, লালন-পালন ও পরিপোষণ। অসুস্থতা দেখা দিলে তাদের চিকিৎসা, পথ্য, সেবা -শুশ্রƒষা সব কিছু যেন মায়ের জগত ও দায়িত্ব। এমনকি স্বামী বেচারার অসুস্থতাকালে সেবা-শুশ্রƒষার দায়িত্বও স্ত্রীর ওপরই বর্তায়; কিন্তু বিপরীতটা কদাচিৎ ঘটে থাকে। স্বামী যদি এসব দায়িত্বের কিছু অংশ স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নেয় তার জন্য তা হয়ে যায় উদার মানসিকতা অথবা মহানুভবতা। একই কাজ মেয়েরা করলে হয় দায়িত্ব পালন অথচ পুরুষ করলে তা হয় তার মহানুভবতাÑ এটাই আমাদের সামাজিক চরিত্র।

বিশ্ব এগিয়ে চলেছে, আমরাও নেই ততটা পেছিয়ে। যদিও বিশ্ব অগ্রযাত্রার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমাদের আরও বেশ সময় লাগবে। আজকাল শহুরে মধ্যবিত্ত সংসারে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে চাকরিজীবী। উভয়ের যৌথ আয় দ্বারা সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা সহজতর হয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখছি আমাদের অগ্রযাত্রায় অবদান শুধু পুরুষের একার নয়। বলা যায় নারী-পুরুষের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেই আমাদের এই অগ্রযাত্রা। কিন্তু আজও সেকেল চিন্তা-চেতনা ও ধর্মীয় এবং সামাজিক মূল্যবোধ নারীর প্রতি অনেকখানি বৈষম্যমূলক। স্বামী বাইরে কাজ করে স্ত্রী ঘরদোর, সন্তান-সংসার সব কিছু সামাল দেয়। মনে হয় যেন সংসারটা চলছে দুই চাকার গাড়ির মতো। এক চাকা না চললে বা শ্লথগতিতে চললে সংসার নামক চাকাটিও অচল হয়ে পড়ে। না হয় শ্লথগতিতে গড়িয়ে গড়িয়ে চলবে। কিন্তু সমাজে অনেক পুরুষ আছে যাদের দৃষ্টি এরূপ সরল গতিসম্পন্ন নয়। সম্প্রতি হেফাজত নামে এক ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে নারী বিদ্বেষ প্রচারে বেশ সক্রিয় দেখা যাচ্ছে এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কিছু আধুনিক শিক্ষিত লোকও তাদের প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। যা হোক, সংসারে কিছু পুরুষ আছে যারা মনে করে সংসারের ব্যয় জোগান দেয় বলে তারা প্রভু আর নারীরা বাকি সব কাজ করা সত্ত্বে¡ও সেবাদাসী। নারীদের থাকবে না কোন ব্যক্তি স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদাবোধ।

আবার ফিরে যাই সংসারের একজনের সীমিত আয় দ্বারা ক্রমবর্ধমান ব্যয় মেটানোর সমস্যা প্রসঙ্গে। সংসারের নানাবিধ প্রয়োজন মেটাতে অসমর্থ স্বামী ভাবে, শ্বশুরকুলের কিছু আর্থিক আনুকূল্য হয়ত তাদের সংসার তরী চালাতে বিশেষ সহায়ক হবে। যতদূর জানা যায় পশ্চিমা বিশ্বেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য, দ্বন্দ¦ ও গরমিল দেখা দেয়। সম্ভব হলে উভয়ে আপোস-মীমাংসা করে নেয়। সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই উভয়েই যার যার কর্মক্ষেত্রে কাজ করে, আবার উভয়েই ঘরের কাজে কমবেশি অংশগ্রহণ করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংসারে ভাঙ্গন ধরে, বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকে না। তবে নিতান্ত সামান্য কিছু ক্ষেত্র ছাড়া তাদের সম্পর্ক শারীরিক নির্যাতন পর্যন্ত গড়ায় না। ঐ সব দেশে দাম্পত্য সম্পর্ক আবর্তিত হয় আর্থিক বিবেচনায় নয়, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চলাফেরা, পারস্পরিক মেলামেশা ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, যা পরিণামে সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটায়। কিন্তু তা কদাচিৎ শারীরিক নির্যাতন ও পাশবিক আচরণ পর্যন্ত পৌঁছায়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা সুশিক্ষিত ও মার্জিত এবং চারপাশে এমন দৈহিক নির্যাতনের ঘটনা তাদের চোখে পড়ে না। এর একটা কারণ সম্ভবত স্বামী ও স্ত্রী স্ব-স্ব কর্মক্ষেত্রে কাজ করে যা উপার্জন করে তা দিয়ে সংসার চালানো ও মডারেট সামাজিক অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব হয়। সেজন্য হয়ত স্বামীর মনে শ্বশুরবাড়ি থেকে আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণ করার প্রশ্ন উদয় হয় না। হয়ত তাদের সমঅবস্থানের/পর্যায়ের পরিবারদেরও এমনিভাবে শ্বশুরালয়ের আর্থিক সহায়তা নিতে অভ্যস্ত দেখে না। যা হোক, সামাজিক, আর্থিক ও মনস্তাত্ত্বি¡ক কারণে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রভাবে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে যৌতুকের প্রশ্নটি সে সব দেশে অদৃশ্যমান।

যৌতুক একটি অতি ভয়ঙ্কর সামাজিক অভিশাপ। ১৩/৭/১৩ তারিখের সংবাদপত্র পাঠে জানা যায়, শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার এক গ্রামে যৌতুকের দাবিতে স্বামীর নির্যাতনে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। এদিকে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলায় যৌতুকলোভী স্বামী যৌতুক না পেয়ে স্ত্রীর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার ৩৩ দিন পর হতাভাগ্য মহিলা মৃত্যুবরণ করে। নির্যাতনকারী স্বামীর মনে একথাটি কি উদয় হয় না যে, সংসারে আপদে-বিপদে জীবনে-মরণে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের একান্ত সাথী? যে বিষয়টি এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা এই যে, জগতে স্বামীর যে বংশধারা প্রবাহিত থাকে তাতে এ স্ত্রীর অবদান সবার উর্ধে। যৌতুকের জন্য স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতনের ফলে মৃত্যুর ঘটনা দেশের আনাচে-কানাচে অহরহ ঘটে থাকে। প্রকৃত দুর্ঘটনার ১০-১৫%-এর অধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। এরূপ অনেক দুর্ঘটনা নিয়ে আদালতে ও পুলিশে মামলা-মোকদ্দমা চলছেও।

এ প্রবন্ধে নিম্নমধ্যবিত্ত, চাকরিজীবী ও ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের জীবনযাত্রার আলোকে যৌতুকের প্রসঙ্গটি আলোচিত হলো। কিন্তু নিম্নবিত্ত অর্থাৎ গ্রামগঞ্জের আধা শিক্ষিত ও অশিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে যৌতুকের কারণে সঙ্ঘটিত নির্যাতনের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। শিক্ষার অভাবে মানসিক পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণার এসব ব্যক্তি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে প্রভু ও দাসীর সম্পর্কের অতিরিক্ত আর কিছু ভাবতে পারে না। ঘরকন্নার সব কাজ সামলানো, সন্তান ধারণ ও লালন-পালন এসব কিছুর জন্যই যেন নারী জাতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা ভাবে। সব কিছুর উর্ধে তাদের অতি লোভাতুর দৃষ্টিভঙ্গি। নিজের বাবা-মা থেকে তেমন কিছু পায়নি, নিজের যোগ্যতা দিয়েও ভাগ্য ফেরাতে পারেনি। অতএব, শেষ অস্ত্র হলো শ্বশুরবাড়ির আর্থিক আনুকূল্য লাভ, যার নামই হচ্ছে যৌতুক। শ্বশুর স্বেচ্ছায় জামাতার যৌতুকের দাবি না মেটালে তার আদরের কন্যাকে নির্যাতন করে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংসার অচল হয়, ভেঙ্গে যায়। পুত্র-কন্যারা হয় মাতৃহারা। অনেক দুর্ভাগা স্ত্রীকে যৌতুকের দাবি পূরণে ব্যর্থতার কারণে নিজের জীবন দিয়ে স্বামীর নির্যাতন থেকে নিষ্কৃতি পেতে হয়।

আমাদের দেশে বর্তমানে যৌতুকবিরোধী কঠোর আইন আছে। যৌতুকের মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচারেরও ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও প্রশাসনিক অবস্থার আড়ালে আইনের কঠোর প্রয়োগ চাপা পড়ে যায়। আইন ক্রমাগত কঠোর হচ্ছে; কিন্তু স্বামীর লোভের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীর প্রতি নিষ্ঠুর নির্যাতনের ঘটনা।

লেখক : সাবেক যুগ্ম সচিব

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

০১/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: