আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কংক্রিটের শহরে ঘন সবুজ বন, চারা সংগ্রহের সুযোগ

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫
কংক্রিটের শহরে ঘন সবুজ বন, চারা সংগ্রহের সুযোগ
  • জাতীয় বৃক্ষমেলা

মোরসালিন মিজান

যেদিকে চোখ যায়, সবুজ! নানা রঙের ফুল হাসি হয়ে ফুটেছে। এইটুকুন গাছে পাকা রসালো ফল। খুব দরকারী ঔষধি গাছের আলাদা বাগান করা হয়েছে। বিশাল ডালপালার যে বনজ বৃক্ষ, তাও বাদ যায়নি। সব মিলিয়ে জাতীয় বৃক্ষমেলা ২০১৫। আয়োজক, বন অধিদফতর। প্রতিবছরের মতো এবারও ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার নার্সারি মালিকরা মেলায় যোগ দিয়েছেন। নিজেদের উৎপাদিত বৃক্ষের চারা দিয়ে চমৎকার স্টল সাজিয়েছেন তারা। এভাবে বাণিজ্যমেলার মাঠ হিসেবে পরিচিত খোলা জায়গাটি সবুজ উদ্যানে পরিণত হয়েছে। প্রচার কম। তাতে কী? শহরের নিসর্গপ্রেমীরা নিজ উদ্যোগেই এখানে আসছেন। মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। নাম না জানা কত গাছ! কত শত জাত! সেসবের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। কেনাকাটাও জমে উঠেছে। অনেকেই ঝুড়ি ভর্তি করে চারা কিনে বাড়ি ফিরছেন।

মেলার শুরুটা ধরা হচ্ছে গত ৬ জুন থেকে। ধরা হচ্ছে বলার কারণ, এবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সম্ভব হয়নি। প্রতিবার মেলা উদ্বোধন করেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তবে এবার ব্যস্ততার কারণে তার সময় পাওয়া যায়নি। আনুষ্ঠানিক শুরু নিয়ে বিভ্রান্তি থাকায় প্রচারও কম হয়েছে। তবে যারা বৃক্ষ ভালবাসেন তারা নিজেরাই ছুটে আসছেন বৃক্ষের কাছে। বৃক্ষ আর বৃক্ষপ্রেমীদের মিলনে বেশ যাচ্ছে এক একটি দিন।

শুক্রবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রাণহীন শহরের মাঝখানে যেন ঘন সবুজ বন। বেশ বড়সড় জায়গা নিয়ে মেলা। মোট স্টল ৮৭টি। প্রতিটি স্টলই গাছের চারায় পরিপূর্ণ। বর্ষার যত ফুল টবে ফুটে আছে। দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। এখন বেলি ফোটার সময়। দারুণ সুন্দর ফুটে আছে ফুলটি। কাছে গেলেই মিষ্টি ঘ্রাণ। এ্যারোমেটিক জুঁই থেকেও ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। জবা ফুলের জাত দেখা গেল তিনটির বেশি। লাল ছাড়াও আছে সাদা ও গোলাপি রঙের জবা ফুল। আর গোলাপের জাত তো গুণে শেষ করা যাবে না। তবে চেনাজানা ফুলের বাইরে কিছু নাম বিশেষভাবে আকৃষ্ট করছে। যেমনÑ নাকাচুয়া, ভ্রুমিলিয়া, প্লামবু, মিসরের মরিয়ম, হাইব্রিড কদম, চালতা, এলিও কার্পাস, জাকারিয়া। কিশোরগঞ্জ নার্সারির স্টলে গিয়ে এমন বেশ কিছু ফুলের চারা দেখা গেল। স্টলের মালিক মোঃ বাদল জানালেন, থাই দোলনচাঁপা, নতুন হাইব্রিড কদম ফুলসহ একটি গাছ বিক্রি হচ্ছে ২০০০ টাকায়। চালতা ফুল বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকায়। নাকচুয়া নামের ফুলের চারাটি দেখে বিশ্বাসই হয় না দাম ৩০০০ টাকা। একই দাম প্লামবু চারাটির। মেলায় আছে দেশী গন্ধরাজের হাইব্রিড জাত। বড় পাতা। ফুল তারও বেশি বড়।

মেলায় আছে দৃষ্টিনন্দন অর্কিড। একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না। প্রমি গার্ডেন নামের একটি স্টলের বড় অংশজুড়ে আছে অর্কিড। স্টলের কর্মী মোক্তার হোসেন জানালেন, অর্কিডের সৌন্দর্য একটু আলাদা হওয়ায় চাহিদা বেশি। সৌখিন মানুষ অর্কিড ফুল দিয়ে ঘর সাজাতে ভালবাসেন।

ক্যাকটাসও বেশ আকর্ষণীয়। বোটানিক্যাল গার্ডেনের ক্যাকটাসগুলো আকারে বেশ বড়। বহু বছর বয়সী ক্যাকটাস কাঁটা গায়ে দিব্যি আছে। কাশবন নার্সারি নামের একটি স্টলে বাহারি ক্যাকটাসের সংগ্রহ। এখানে ছোট ক্যাকটাস। তবে লাল হলুদ কমলা রঙের ক্যাকটাস স্টলের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বনসাইও দেখা গেল প্রচুর। চায়না বট, কামিনী ইত্যাদি গাছের বনসাই অনেকেই করে মেলায় এনেছেন। দ্বীপ গার্ডেন নামের একটি নার্সারিতে গিয়ে দেখা গেল বিদেশী এগেসথেসিয়া গাছের বনসাই। এত সুন্দর যে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। দামও অনেক। দেড় লাখ টাকা।

মেলায় ফলদ বৃক্ষের প্রায় সব চারাই পাওয়া যাচ্ছে। ক্রেতা আকর্ষণ করতে বড় টব বা মাটিভর্তি ড্রামে লাগানো চারা নিয়ে এসেছেন নার্সারি মালিকরা। ছোট ছোট গাছে বড় বড় পাকা আম ধরে আছে। বারো মাস ধরে এমন আমের চারাও দেখা গেল। একইভাবে ধরে আছে পেয়ারা, ডালিম, জামরুল, জাম্বুরা, করমচা। চাইলেই পাওয়া যাচ্ছে এসবের চারা। সিলেট নার্সারি তো আরও এগিয়ে। প্রথমবারের মতো টবে নাশপাতি করে দেখিয়েছেন এই নার্সারির কর্মীরা। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাতকরাও টবের গাছে ধরে আছে। একটি লেবু দেখা গেল, গাছে কোন কাঁটা নেই। নার্সারি মালিক মলয় লাল ধর বয়সে তরুণ। হয়ত তাই নিরীক্ষা করতে ভালবাসেন। বললেন, আমার টবে এমনকি আপেলের ফলন হয়েছে। মেলায় সেটি দেখাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু জায়গার অভাবে সেটি সম্ভব হয়নি।

ঔষধি বৃক্ষের খুঁজেও অনেকে মেলায় আসেন। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান ও বলধা গার্ডেনের স্টলের সামনে তেমন একটি বাগান। এখানে ছোট ছোট চারা। দেখে তেমন চেনা যায় না কিছু। তবে চারার গায়ে নাম লেখা। কত কত নাম! ঘৃতকুমারী, শ্বেত চন্দন, বিশকাঠালী, স্বর্পগন্ধা, বেড়েলা, তিতি বেগুন, চিনিগুড়া, অশ্বগন্ধা, গুলঞ্চ, শতমূলী, অনন্তমূল, পাথরচুনা, তুড়িচ-াল, উদাল, ময়নাকাটা, কর্পূর, ভাট, ইস্টভিয়া; সবই কোন না কোন রোগের পথ্য। এসবের বাইরে মেলায় আছে বনজ বৃক্ষের চারা। যার যা দরকার, নিনে নিচ্ছেন।

বৃষ্টিতে ভিজে বিকেলে মেলায় চারা কিনতে এসেছিলেন আরিফুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী। নানা জাতের চারায় মোটামুটি গাড়ি ভর্তি করে ফেলেছিলেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে বললেন, সারা বছর তো নার্সারি থেকেই কিনি। তবে এই মেলায় সারা দেশের খ্যাতনামা নার্সারিগুলো অংশ নেয়। ভাল জাত পাওয়া যায়। তাই বেশি করে কিনেছি। সবই ফলের গাছ বলে জানান তিনি। তবে নারীরা ফুল ও পাতাবাহারের প্রতি বেশি দুর্বল বলে মনে হলো। অনেকেই গৃহকোন সাজানোর চিন্তা থেকে ফুলের চারা কিনছিলেন। মাকে সঙ্গে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন আফরিন নামের এক তরুণী। এক ঝুড়িভর্তি চারা কিনেছেন তারা। সবই মোটামুটি ফুল। বললেন, ঘর সাজাতেই ফুল কেনা। এসব ফুলগাছ বাঁচিয়ে রাখাও সহজ। ঠিকমতো পানি দিলেই দিব্যি বেঁচে থাকে। এ কারণেই বেছে বেছে শুধু ফুলের চারা কেনা।

আয়োজকদের পক্ষে ফরেস্ট রেঞ্জার মনিরুজ্জামান জানান, গত ১ জুন থেকে দেশব্যাপী শুরু হয়েছে বৃক্ষরোপণ অভিযান। চলবে আগস্টের শেষদিন পর্যন্ত। তিন মাসব্যাপী আয়োজনের অংশ হিসেবে জাতীয় বৃক্ষমেলার আয়োজন। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় এই মেলা চলছে। ঢাকার আয়োজনটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিবছর প্রধানমন্ত্রী মেলার উদ্বোধন করেন। এবার ব্যস্ততার জন্য তার সময় পাওয়া যায়নি। এ জন্য মেলার প্রচার কিছুটা কম হয়েছে। তবে আমরা এখনও আশা করছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। ঈদের আগেই মেলা শেষ হতে পারে বলে জানান তিনি।

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫

২৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: