কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত দেশ

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫
টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত দেশ
  • গাছ ভেঙ্গে ও পাহাড় ধসে নিহত ১
  • পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত একর ফসলী জমি
  • লাখ লাখ লোক পানিবন্দী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ টানা প্রবল বর্ষণে বিপর্যস্ত সারাদেশ। কক্সবাজারে গাছ ভেঙ্গে ও পাহাড় ধসে আটজনসহ সারাদেশে দশজনের মৃত্যু এবং আহত হয়েছে প্রায় ৭০ জন। নতুন নতুন এলাকা হয়েছে প্লাবিত। লাখ লাখ মানুষ হয়ে পড়েছে পানিবন্দী। শত শত ঘরবাড়ি ও স্থাপনা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রকট আকার ধারণ করেছে নদীভাঙ্গন। পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত একর ফসলী জমি। নৌপথে ট্রলার চলাচল বন্ধ থাকায় সেন্ট মার্টিনে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ভাঙ্গন ঝুঁকির মুখে রয়েছে ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা ও অনেক স্থাপনাসহ জয়নুল উদ্যান এলাকা। ঈশ্বরদীতে মিল চাতালের ৯০ হাজার মণ সিদ্ধ ধানের ক্ষতি হয়েছে। দিনভর বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় শুক্রবারও চরম দুর্ভোগে পড়ে রাজধানীবাসী। পর্যবেক্ষণাধীন ৮৪টি পানি সমতল স্টেশনের মধ্যে শুক্রবার ৪৬টির পানি বৃদ্ধি এবং ৩৪টির পানি হ্রাস পায়। আর ৫টি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। মৌসুমী বায়ু প্রবল থাকায় দেশে ভারি বর্ষণ হচ্ছে। আজ শনিবারও তা অব্যাহত থাকতে পারে। স্টাফ রিপোর্টার, নিজস্ব সংবাদদাতা, আবহাওয়া অধিদফতর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও হাসপাতাল সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

কক্সবাজার টেকনাফের সেন্টমার্টিনে নারিকেল গাছ ভেঙ্গে পড়ে কোনারপাড়ার নুর মোহাম্মদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (২৫) ও তাদের শিশু পুত্র মোঃ জিশানের (৪) মৃত্যু ঘটে। বান্দরবানে পাহাড় ধসে একই পরিবারের দু’শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজারেই দু’ লাখ মানুষ পানিবন্দী, পাহাড় ধসে দশজনের মৃত্যু ঘটে। পটিয়ায় শতাধিক মৎস্য পুকুর তলিয়ে গেছে। পিরোজপুরের ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বরগুনার আমতলী ও তালতলীতে ঝড়ে স্কুলসহ শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত এবং তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দী। বাগেরহাটে নতুন করে ৩০ গ্রাম প্লাবিত।

পাউবো জানায়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদীসমূহের পানি বাড়ছে এবং গঙ্গা-পদ্মা ও সুরমা-কুশিয়ারার পানি হ্রাস পাচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। গঙ্গার পানি স্থিতিশীল এবং পদ্মার পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃদ্ধি পেতে পারে।

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, বাংলাদেশ ও সংলগ্ন এলাকায় লঘুচাপটি অবস্থান করছে। মৌসুমী বায়ুর অক্ষ ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ হয়ে অতঃপর উত্তর-পূর্ব দিকে অসম পর্যন্ত বিস্তৃত। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয়। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অতি প্রবল অবস্থায় রয়েছে। আজ শনিবার রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম এবং সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা/ঝড়ো হাওয়াসহ হাল্কা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি বর্ষণ হতে পারে।

শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত সারাদেশে ৯৯১ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ২৫, ময়মনসিংহে ৫, টাঙ্গাইলে ৫, ফরিদপুরে ২২, মাদারীপুরে ১১, চট্টগ্রামে ৩৭, সন্দ্বীপে ১৫, সীতাকু-ে ১৮, রাঙ্গামাটিতে ২৫, মাইজদীকোর্টে ৫, ফেনীতে ১৩, হাতিয়ায় ৩১, কক্সবাজারে ২০২, কুতুবদিয়ায় ৫৫, টেকনাফে ৮৪, সিলেটে এক, শ্রীমঙ্গলে ৭, রাজশাহীতে ৩১, ঈশ্বরদীতে ৫০, বগুড়ায় ১০, রংপুরে ৫, দিনাজপুরে ১৮, সৈয়দপুরে ২, খুলনায় ২২, মংলায় ৫, সাতক্ষীরায় ২, যশোরে ২১, চুয়াডাঙ্গায় ৯, বরিশালে ৭৫, পটুয়াখালীতে ২২, খেপুপাড়ায় ১০৬ ও ভোলায় ৫১ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়।

নিজস্ব সংবাদদাতা উখিয়া থেকে জানান, কক্সবাজারের সেন্টমার্টিনে সকালে টর্নেডোর আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে নারিকেল গাছ ভেঙ্গে পড়ে কোনারপাড়া নুর মোহাম্মদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম ও তাদের শিশু পুত্র মোঃ জিশানের মৃত্যু ঘটে।

নিজস্ব সংবাদদাতা বান্দরবান থেকে জানান, জেলার বনরূপা এলাকায় একটি ঘরের ওপর পাহাড় ধসে একই পরিবারের দুই শিশুর মারা গেছে। নিহতরা হলো- আলিফ (১২) ও মীম (৭)। বৃহস্পতিবার রাত তিনটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় তাদের বাবা আবদুর রাজ্জাক ও মা আহত হন। পরিবারের সবাই তখন ঘুমিয়ে ছিলেন।

স্টাফ রিপোর্টার কক্সবাজার থেকে জানান, কক্সবাজার জেলার অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। অবিরাম বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসে দশ জনের মৃত্যু ঘটেছে। শুক্রবার সকাল দশটার দিকে পাহাড় ধসে জোয়ারিয়া নালা, কাউয়ারখোপে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুম হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

গত কয়েক দিন ধরে ভারি ও অতি বর্ষণের কারণে পানিবন্দী হয়েছে কক্সবাজার সদরসহ আশপাশের অন্তত দুই লাখ মানুষ। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে জেলার কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঘরবাড়ি ছেড়ে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে নদীর পার্শ্ববতী এলাকার লোকজন। টেকনাফ, কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, পেকুয়া ও রামু উপজেলার বেশ কিছু এলাকার তলিয়ে গেছে সড়ক, কালভার্ট ও বিভিন্ন ঘরবাড়ি। টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে কক্সবাজার শহরে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ উপকূলীয় জনপদ শাহপরীরদ্বীপ ও বাহারছড়া প্লাবিত হয়েছে। শামলাপুর প্রধান সড়কে পানি জমে যান ও জন চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। পানি চলাচলের জন্য কালভার্ট থাকলেও মুখে গাছের আগাছা জমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় এ দুর্দশা হয়েছে। বাহারছড়া ইউনিয়নের বড়ডেইল এলাকার মাদ্রাসা সংলগ্ন কালভার্টে পানি জমে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। উখিয়ায়ও অবিরাম বর্ষণে নিম্নাঞ্চলসমূহ প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার একর কৃষি জমি জলমগ্ন হয়ে পড়ার কারণে আমন চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। আষাঢ় মাসের শুরুতে কৃষকেরা বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নিলেও ভারি বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বীজতলা তৈরি করতে পারেনি কৃষকরা। এমতাবস্থায়, আমন চাষাবাদ পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে একাধিক কৃষক জানিয়েছেন।

স্টাফ রিপোর্টার ময়মনসিংহ থেকে জানান, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও ভারিবর্ষণে ময়মনসিংহ শহররক্ষা বাঁধের ২৯টি পয়েন্টে দেখা দিয়েছে মারাত্মক ধস ও ভাঙ্গন।

নিজস্ব সংবাদদাতা মহেশখালী থেকে জানান, ভারিবর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে মহেশখালী উপজেলার নি¤œাঞ্চল প্লাাবিত হয়ে অধিকাংশ পরিবার ও বসবাসকারী লোকজন পানিবন্দী হয়ে মানবেতর দিনযাপন করছে। দ্বীপ এলাকা মহেশখালীর নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে অধিকাংশ পরিবার ও বসবাসকারী লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো তাদের মালামাল উঁচু স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা পটিয়া থেকে জানান, প্রবল বর্ষণে চট্টগ্রামের পটিয়ায় শতাধিক পুকুরের মাছ পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলার নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পুকুরের পোনা মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ খালে ও ধানি জমিতে ছড়িয়ে পড়েছে।

নিজস্ব সংবাদদাতা পিরোজপুর থেকে জানান, অবিরাম বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে পিরোজপুরের ৭টি উপজেলার হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে বিগত ৩ দিন যাবত। সেই সঙ্গে জেলার তিন উপজেলা মঠবাড়িয়া, জিয়ানগর, ভা-ারিয়া ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ মেরামত না করায় ভেঙ্গে যাওয়া স্থান দিয়ে পানি ঢুকে গত ৩ দিনে অন্তত ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

স্টাফ রিপোর্টার বরিশাল থেকে জানান, ১৯৬৭ সালের পর দীর্ঘ ৪৮ বছরের রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিপাতে বরিশালবাসীর জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে নগরীসহ প্রতিটি উপজেলা ও পৌর এলাকার নিম্নাঞ্চলে। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ড্রেনেজ ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না।

স্টাফ রিপোর্টার যশোর অফিস থেকে জানান, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে যশোর শহরের মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। যশোর পৌরসভার পানি নিষ্কাশনে অব্যবস্থাপনা, অসময়ে ড্রেনসহ অবকাঠামো নির্মাণ আর শহরে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় বৃষ্টির পানিতে পুরো শহরটাই যেন পরিণত হয়েছে ডাস্টবিনে।

নিজস্ব সংবাদদাতা বাউফল থেকে জানান, সপ্তাহব্যাপী বিরামহীন বর্ষণে বাউফলে সর্বত্র ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। তলিয়ে গেছে বাড়িঘর, হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ভেসে গেছে, পুকুর ও ঘেরের মাছ। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমন বীজতলা।

স্টাফ রিপোর্টার বাগেরহাট থেকে জানান, লাগাতার বর্ষণে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলার নি¤œাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকার রাস্তাঘাট, ফসলের মাঠ পানিতে তলিয়ে গেছে। অকেজো স্লুইস গেটের কারণে বৃষ্টির পানি নামতে না পারায় দেখা দিয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। ফলে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। টানা বৃষ্টিতে জেলার শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, রামপাল, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, চিতলমারী, কচুয়া ও সদর উপজেলার অন্তত ৩০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চিংড়াখালী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল কাসেম জানান, সিংজোড় চ-ীপুর থেকে গোপালপুর পর্যন্ত নদীর তীরবর্তী ১ কিমি কাঁচা বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে সিংজোড় বাজারসহ শতাধিক পরিবার।

নিজস্ব সংবাদদাতা সাভার থেকে জানান, বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া প্রায় টানা প্রবল বর্ষণে আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পানিতে তলিয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্তের। প্রায় হাঁটু পরিমাণ পানির কারণে ওই মহাসড়কে শুক্রবার সকাল থেকেই যানবাহন চলাচল বিঘিœত হওয়ায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রকাশিত : ২৭ জুন ২০১৫

২৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: